ফিরে যেতে চান

পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমে ব্যবহৃত ভ্যান

বাংলা কাউন্সিলের ১৮৭৬ সালের ৬নং আইনের ৩১৩ ধারা অনুযায়ী তৎকালীন রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির জন্য বাইলজ প্রণয়ন করা হয়। মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনারগণ এটি প্রণয়ন করেন। বাইলজটির নাম The MUNICIPAL BYE – LAWS for The TOWN OF RAMPORE BAULEAH. ১৮৭৭ সালের ১৭ জুন বাই লজ বাংলার লেফটেনেন্ট গভর্নর কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে ও ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এ বাইলজে মোট ৩৪টি অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত হয়েছিল। যার মধ্যে ২১ টিতে তৎকালীন শহরের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়। বাইলজের ধারাগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়, প্রধানত স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যেই মিউনিসিপ্যালিটির যাত্রা শুরু। এ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য বিভিন্ন সময় উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয়ে আসছে।
পৌরসভা আমলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে একটি শাখা ছিল। ১৯৯৫ সালে সাংগঠনিক কাঠামোই পৃথক পরিচ্ছন্ন বিভাগ গঠন করা হয়। বিভাগের প্রধান হলেন প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা।৫১ ২০১২ সালের সংশোধনী সাংগঠনিক কাঠামোই পরিচ্ছন্ন বিভাগের সঙ্গে মশক নিধন/ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ শাখা যোগ হয়।
মহানগরীর ড্রেন, রাস্তা, সেফটি ট্যাংক, কুকুর নিয়ন্ত্রণ, মৃত জীব-জানোয়ার অপসারণ প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচ্ছন্ন বিভাগের মাধ্যমে হয়ে থাকে। অলি-গলির বর্জ্য, আবর্জনা, ড্রেনের ময়লা মাটি অপসারণের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে রিক্সাভ্যান নিযুক্ত আছে। ভ্যানগুলো অলি-গলির বর্জ্য সংগ্রহ করে রাস্তার পাশের ডাস্টবিন বা সেকেন্ডারি জমা করে। জমাকৃত বর্জ্য প্রতিদিন ট্রাকে করে ভাগাড়ে ফেলা হয়।
ভাগাড়: কারো কারো মুখে শোনা যায়, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রথম ভাগাড় ছিল বর্তমান নিউ মার্কেটের জায়গায়। প্রকৃতপক্ষে সেখানে ভাগাড় ছিল না। ২৬ জুলাই ২০১৬ তারিখে নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নুরুননবী (৭২ বছর) ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত কর আদায়কারী দড়িখরবোনা নিবাসী (উপহার সিনেমা হল লি. এর পিছনে) শামসুদ্দিন (৮০ বছর) এর নিকট থেকে জানা যায়, প্রথম ভাগাড় ছিল মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়ামের (পূর্ব নাম জেলা স্টেডিয়াম) জায়গায়। তবে বর্তমান উপহার সিনেমা হলের জায়গায় পুকুর ছিল। সেখানে পৌরসভা আবর্জনা ফেলতো। নগর ভবনের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণায় নির্মাণাধীন স্বপ্নচূড়া প্লাজার কাছে ড্রেনের মধ্যে পৌরসভা ময়লা ফেলতো। অবশ্য এক সময় বারাহী নদী সাহেব বাজার হয়ে এ পাশ দিয়েই বহমান ছিল বলে জানা যায়। পকিস্তান আমল ও ১৯৭৪ সালের রাজশাহী পৌরসভার কমিশনার (বর্তমানে দলিল লেখক) কাজীহাটা নিবাসী এলাহী বক্স মণ্ডলের মতে, নিউ মার্কেটের জায়গায় ভাগাড় ছিল না। তবে ময়লা ফেলা গাড়িগুলো সেখানে থাকতো। মাহবুব সিদ্দিকীর শহর রাজশাহীর আদিপর্ব (২০১৩) গ্রন্থের ৩৬৬-৩৮৫ পৃষ্ঠায় কবি ফজর আলি খাঁন ‘রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ শিরোনামে একটি পাণ্ডুলিপিতে লিখেছেন, ‘মিউনিসিপ্যাল বা পৌরসভার নিউমার্কেট যেখানে পতিতা পল্লী, তাড়ির আস্তানা ও পশুর খোয়াড় ছিল সেখানে স্থাপিত হইয়াছে।’৬৮২ জেলা স্টেডিয়াম থেকে ভাগাড়টি বড় বনগ্রামে স্থানান্তর হয়। বর্তমানে বাইপাস সড়কের পাশে নওদাপাড়ায় একটি নতুন ভাগাড় নির্মিত হয়েছে। বড় বনগ্রামের ভাগাড়েই নির্মিত হয়েছে শহীদ জিয়া শিশু পার্ক।
আবর্জনা ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ব্যবহৃত সরঞ্জাম: ৬ এপ্রিল ২০০৩ তারিখের প্রাপ্ত তথ্যানুসারে ট্রাক ১৩টি, ট্রাক্টর ৪টি, রিক্সাভ্যান ১৫০টি, হুইল ব্যারো ৪৫টি, শ্যালো পাম্প ৮টি। ১৩ ডিসেম্বর ২০০৫ তারিখের প্রাপ্ত তথ্যানুসারে পরিচ্ছন্ন কাজে ১০টি ট্রাক, ৪টি ট্রাক্টর, ১৫০টি রিক্সাভ্যান, ১৫০টি হুইল ব্যারো, ৮টি শ্যালো পাম্প ও ১২টি এন এস ট্রলি ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে হাইড্রোলিক ট্রাক ৭টি, ট্রাক্টর ৬টি, রিক্সা ভ্যান ২৫০টি, ট্রেলার ১২টি, শ্যালো ডিপ পাম্প ৪টি।৬২৬ 
রাত্রীকালীন আবর্জনা অপসারণ ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার: ১ জুলাই ২০০৯ তারিখ থেকে  রাত্রীকালীন আবর্জনা অপসারণ কার্যক্রম শুরু হয়।৬২৫ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম আরো সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য ২০০৮ সালের নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদে আধুনিক প্রযুক্তির কিছু যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়।  মাঝারী শহর সমন্বিত বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্প (২য় পর্যায়) এর আওতায় রোড সুইপিং ভেকেল, মাল্টিপারপাস জেটি, পুরুষ-নারী পৃথক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট ১০ কামরার ভ্রাম্যমান টয়লেট ও সেফটি ট্যাংক পরিষ্কারকরণের জন্য ভ্যাকাম ট্যাংকার নিয়ে আসা হয়। স্থানীয় পদ্ধতিতেও পুরুষ-নারী পৃথক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট ৬ কামরার ১টি ভ্রাম্যমান টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। রোড সুইপিং ভেকেলের কাজ যান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাস্তার ধুলা-বালি, আবর্জনা পরিষ্কারকরণ। মাল্টিপারপাস জেটির কাজ সড়ক ধোয়া । ভ্যাকাম ট্যাংকারটি ১ হাজার ফিট দৈর্ঘ্য পাইপ বিশিষ্ট হওয়ায়  অনেক দূর হতে সরু গলির ভিতরে অবস্থিত আবাসিকের সেফটি ট্যাংকের ময়লা অপসারণে সক্ষম। তবে এসব অত্যাধুনিক যন্ত্রগুলো সবই চালু করা হয়নি। বড় কোন সমাবেশ হলে মোবাইল পাবলিক টয়লেট ব্যবহার হয়।
উৎপাদিত আবর্জনা: ৬ এপ্রিল ২০০৩ তারিখের প্রাপ্ত তথ্যানুসারে মহানগরীতে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মেট্রিক টন আবর্জনা তৈরি হয়। ১৩ ডিসেম্বর ২০০৫ তারিখের প্রাপ্ত তথ্যানুসারে মহানগরীতে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ মেট্রিক টন আবর্জনা তৈরি হয়। এর ৬০ শতাংশ সিটি কর্পোরেশন সংগ্রহ করে ভাগাড়ে ফেলে এবং ৪০ শতাংশ ব্যক্তিগতভাবে সার তৈরি ও অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়। ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে মহানগরীতে প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ মেট্রিক টন আবর্জনা তৈরি হয়। এর ৮০ শতাংশ সংগ্রহ করে সিটি কর্পোরেশন।৬২৬
জৈব সার উৎপাদন প্রক্রিয়া: মহানগরীর প্রতিদিনে উৎপাদিত আবর্জনা বা ভাগাড়ে আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত মানের জৈব সার উৎপাদনের জন্য ভাগাড়ে একটি কম্পস্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়েছিল। সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতায় লেডিস অর্গানাইজেশন ফর সোস্যল ওয়েল ফেয়ার (লফস) কম্পস্ট প্ল্যান্টটি নির্মাণ করেছিল এবং ৩১ জুলাই ২০০৩ তারিখে মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনু এমপি উদ্বোধন করেন।৫২ বর্তমানে এর কার্যক্রম নেই। 
ডাস্টবিন: ৭ মে ২০০৩ তারিখে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে মহানগরীর বিভিন্ন বিভিন্ন স্থানে মোট ৭০৭ টি ডাস্টবিন ছিল। যা ১৯৯২ সাল হতে ২০০৩ সালে নির্মিত হয়েছিল। ডাস্টবিনগুলোর ৫৫৭টি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নিজস্ব অর্থে ১৫০টি মিউনিসিপ্যাল প্রজেক্ট (এমএসপি) তৈরি করে।
পরিবেশ দূষণের কারণে অনেক ডাস্টবিন ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। ডাস্টবিনের পরিবর্তে স্থাপন করা হচ্ছে সেকেন্ডারী পয়েন্ট।  
সেকেন্ডারী পয়েন্ট ও অবকাঠামো নির্মাণ: ২০০৮ সালের নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদে মাঝারী শহর সমন্বিত বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্প (২য় পর্যায়) এর স্থানীয় কর্মসূচির আওতায় সেকেন্ডারী পয়েন্ট স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ২০১৫ সাল মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে মোট ২৩টি সেকেন্ডারী পয়েন্ট স্থাপন করা হয়। প্রাচীন ডাস্টবিনের পরিবর্তে এ ধরনের সেকেন্ডারী পয়েন্ট নির্মাণের ভাবনা সর্ব তৎকালীন ১২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-১ সরিফুল ইসলাম বাবুর মাথায় এসেছিল।

জাতীয় পরিবেশ পদক ২০১২: পরিবেশ উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১২ সালে জাতীয় পরিবেশ পদক প্রবর্তন করা হয়। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন প্রথম স্থান অধিকার করে জাতীয় পরিবেশ পদক ২০১২ লাভ করে। ২০১২ সালের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বৃক্ষমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট থেকে মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এ পদক গ্রহণ করেন।৫৬৫ (বিস্তারিত প্রকৃতি ও আবাসন অধ্যায়)
সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন: স্বাস্থ্যসম্মত আধুনিক পদ্ধতিতে বর্জ্য অপসারণের উদ্দেশ্যে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন মহানগরীর রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রোকেয়া হলের পশ্চিম পাশে, কাজলায়, তেরখাদিয়া সিটি হাট বাইপাস সড়ক মোড়ে ও কলাবাগানে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ চত্বরের পূর্ব অংশে মোট ৪ টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ করছে।৮০৩  এগুলোর মধ্যে ৭ আগস্ট ২০১৭ তারিখে মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও তেরখাদিয়া স্টেশন দুটির উদ্বোধন করেছেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে সরকারের ইউপিইএইচএসডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে স্টেশনগুলো নির্মাণ হচ্ছে।৮০৪
শ্লটার হাউস: শ্লটার হাউস হচ্ছে আধুনিক মানের কসাইখানা। মহানগরীর তালাইমারীতে ১টি শ্লটার হাউস নির্মাণ শুরু হয়েছে৮০৫ ও সাহেব বাজারে ১টি শ্লটার হাউস কাম বায়োগ্যাস নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।৮০৬
দূষণ কমানোই বিশ্বসেরা রাজশাহী: গত দু’বছরে বিশে^র যে দশটি শহরে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা কমেছে, এর মধ্যে রাজশাহীতে কমার হার সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্তের ভিত্তিতে ১৭ জুন ২০১৬ তারিখের যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার তথ্যানুসারে, রাজশাহীর প্রতি ঘন মিটার বাতাসে ভাসমান ১০ মাইক্রোমিটার আকারের ক্ষুদ্র ধূলিকণা ছিল ১৯৫ মাইক্রোগ্রাম। এটা প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কমে ২০১৬ সালে হয়েছে ৬৩.৯ মাইক্রোগ্রাম। দু’বছর আগে আরো ক্ষুদ্র ২.৫ মাইক্রোমিটার আকারের ধূলিকণা ছিল ৭০ মাইক্রোগ্রাম। দু’বছর পর এটা হয়েছে ৩৭ মাইক্রোগ্রাম। ইটভাটার চিমনির উচ্চতা বাড়িয়ে দেয়া, বনায়ন, রাস্তারপাশের ফুটপাত কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেয়া, ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার ব্যাপক ব্যবহার, ডিজেলচালিত যানবাহন চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ ইত্যাদি রাজশাহীর বায়ু দূষণ কমে যাওয়ার সাফল্য।৬৮০