ফিরে যেতে চান

মো. মিজানুর রহমান মিনু 

মো. মিজানুর রহমান মিনু ১৯৫৮ সালের ৭ জানুয়ারি রাজশাহী মহানগরীর মালোপাড়ায়  জন্ম  গ্রহন করেন। পিতা ফজলার রহমান এমএবিটি (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)। মা লতিফা খাতুন। মিনুর পূর্ব বংশের আদি নিবাস রাজশাহী জেলার বর্তমান গোদাগাড়ী  উপজেলার কুমরপুর গ্রামে। দাদা হাজী ইয়ারত উল্লাহর বাবা হায়বত উল্লাহ সেখান থেকে ১৫/১৬ মাইল দূরে নবগ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। তিনি সে সময় বিচার কার্য সহায়তা করার জন্য জেলা জজের জুরী ছিলেন। রাজশাহী জেলা বোর্ডের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যানও ছিলেন। শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। তাঁর প্রচেষ্টায় গ্রামের অনেক ছেলে শহরে এসে স্কুল-কলেজে লিখাপড়া শিখে প্রতিষ্ঠিত হয়। হায়বত উল্লাহর ৩ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে মেজ ছেলে হাজী ইয়ারত উল্লাহ হলেন মিনুর দাদা। তিনি সেকালে মুন্সি পাস করে গ্রাম পঞ্চায়েত ও বিচারের জুরী নিযুক্ত হয়েছিলেন। সন্তানদেরযোগ্য রূপে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর বাবার আদর্শ ও ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটান। রাজনৈতিক সচেতন ও দেশ দরদী ব্যক্তি হিসেবে তিনি ব্রিটিশ আমলে ফারাজী আন্দোলনের নেতৃত্বও দেন।
ফজলার রহমান রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯২৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯৩১ সালে আইএ ও ১৯৩৩ সালে বিএ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৭ সালে এমএ ও ১৯৪০ সালে বিটি পাস করেন। পেশা জীবনে তিনি ছিলেন উচ্চ পর্যায়ের কর্মচারী এবং অবসর গ্রহণের পর শিল্প ও জোতদারী ব্যবসায় নিয়েজিত হন। উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন দেশ ও সমাজ সচেতন। মিনুর তথ্যানুসারে ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এবং দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গী ছিলেন। মিনুর পিতামহ হাজি  ইয়ারত উল্লাহ শেখও ছিলেন শিক্ষিত মানুষ। এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাঁরও ছিল গভীর সম্পর্ক। ইংরেজদের উপনিবেশিক শাসনকে তিনি কখনও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেননি। তাঁর চেতনায়ও জেগে উঠেছিল মুক্ত মাতৃভূমি। এ চেতনা তাঁকে নিয়ে যায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে। এ আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে।
৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে মিনু সবার ছোট। তাঁর শৈশব, কৈশোর কাটে রাজশাহী মহানগরীতে। লিখা-পড়ার হাতে খড়ি হয় নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার অন্তর্গত জাহানপুর ইউনিয়নের ভাতকুণ্ডু গ্রামে নানার বাড়িতে। সেখানে নানীর নামে প্রতিষ্ঠিত ভাতকুণ্ডু খাতিমুন নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তারপর মহানগরীর সর্ব প্রাচীন আধুনিক একাডেমিক প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৭২ সালে মাধ্যমিক পাঠ শেষে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন ও ১৯৭৫ সালে এএইচসি পাস করেন। রাজশাহী সিটি কলেজ থেকে ১৯৮০ সালে বিকম পাস করেন। 
পারিবারিক প্রভাব কিশোর বয়সেই মিনুকে দেশের কাজে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের ‘ফ্রেন্ডস, নট মাস্টার’ বইটি পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত না করার দাবিতে রাজশাহীতে যে আন্দোলন গড়ে উঠে মিনু তাতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। তিনি তখন কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে তাঁর নিকট থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালে তাঁর ১৩ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে অংশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে বাবা-মাকে ছেড়ে ভারত যান ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখেন । 
ছাত্র জীবনে মিনু একজন ভাল খেলোয়াড় ছিলেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮সাল পর্যন্ত খেলাধুলা করে অনেকের নিকট পরিচিতি হয়ে উঠেন। তিনি সাঁতার, ক্রিকেট, লন টেনিস খুব ভাল খেলতেন। তাঁর পারদর্শিতায় রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল আন্তঃস্কুল সাঁতার প্রতিযোগিতা, আন্তঃ স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় এবং রাজশাহী কলেজ আন্তঃকলেজ সাঁতার প্রতিযোগিতা ও আন্তঃ কলেজ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তিনি একজন দৌড় প্রতিযোগীও ছিলেন। রাজশাহী কলেজে তিনি ৪০০ মিটার ও ৮০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন।
 খেলাধুলার সাফল্য তার রাজনীতির সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করে। তিনি তার সহপাঠী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিকট বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এর ফলে ১৯৭৪ সালে রাজশাহী কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র ছাত্র- ছাত্রীর সংগঠন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্যানেলে ক্রীড়া সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় লাভ করেন। তিনি রাজশাহী কলেজের স্বতন্ত্র ছাত্রদের সংগঠন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়কও হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রাথমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক ছাত্রদল (জাগ ছাত্রদল) গঠন হলে তিনি রাজশাহী জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক হন। ১৯৮২ সালে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এর রাজশাহী জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের রাজশাহী জেলা শাখার আহবায়ক ও পরে সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে যুব দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী  কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, ১৯৯১ সালে সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১৯৯৬ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী, রাজশাহী মহানগরীর সভাপতি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন।
তিনি ছাত্র জীবনেই রাজনীতি শুরু করেন। বিশ শতাব্দীর আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিক রেখে তিনি রাজশাহী মহানগরীর অন্যতম তরুণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভুত হন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি তুখোড় সাহসী ছাত্র ও যুব নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। স্বৈরাচারের রোষানলে তিনি ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৬ সালে তিনবার কারারুদ্ধ হন। এ আন্দোলনে বলিষ্ঠতার কারণে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনোনীত করেন। মনোনীত মেয়র হিসেবে তিনি ১৯৯১ সালের ২১ মে হতে ১৯৯৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করে তিনি ১৯৯৪ সালের ৩০ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৫৮ হাজার ৫শ ৩২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এবং প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিকট ১৯৯৪ সালের ১০ মার্চ রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সর্ব প্রথম নির্বাচিত মেয়রের শপথ বাক্য পাঠ করেন। পরের দিন ১১ মার্চ তিনি পুনরায় মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বয়সের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠতার জন্য ১৯৯৪ সালে মেক্সিকো সিটিতে জাতিসংঘের ইউনিসেফ আয়োজিত শিশু অধিকার রক্ষা কাউন্সিলে ১৮৫ টি দেশের মেয়রের মধ্যে তিনি সর্ব প্রথম কাউন্সিলের বহিতে স্বাক্ষরতার সুযোগ লাভ করেন। উন্নয়ন ও সাংগঠনিক কর্মে মূল্যায়নের ভিত্তিতে জিয়া সাংস্কৃতিক সংঘ ১৯৯৬ সালে তাঁকে দলের শ্রেষ্ঠ সংগঠক ঘোষণা করে। গত শতাব্দীর নব্বই দশকের শেষের দিকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম জননিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করা হয়। ২০০১ সালে ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনে তিনি রাজশাহী- ২ (পবা-বোয়ালিয়া) আসনে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪০২ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল তিনি পুনরায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন এবং ৫ মে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিকট শপথ বাক্য পাঠ করেন। ২০০২ সালের ২৯ মে বিশেষ সাধারণ সভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর এ পরিষদের যাত্রা শুরু হয়। 
মিনু ২০০১ সালের ৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও ২০০৩ সালের ১৬ জুলাই গঠিত জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন। ২০০৩ সালের আগস্টে সরকার তাঁকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার উন্নয়ন কর্মসূচি, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পসমূহ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং সরকারের জনকল্যাণমুখী কর্মসূচিসমূহের বাস্তবায়ন, অগ্রগতি, চলমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব প্রদান করে।  
মিনু ১৯৯১ সালের ১২ আগষ্ট খুলনার খালিশপুর নিবাসী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (অব.) মরহুম শেখ শাহাদাত আলি ও মমতাজ আরা’র কন্যা শালমা শাহাদাতকে বিয়ে করেন। শালমা শাহাদাত রাজশাহীর মাদার বখ্শ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের অধ্যক্ষ। এ দম্পত্তি এক মেয়ে ও দুই ছেলের জনক-জননী। কন্যা মালিহা রহমান ১৯৯৩ সালের ১ নভেম্বর, ছেলে সাইফ রহমান ১৯৯৭ সালের ২৮ জানুয়ারি ও ২০০৭ সালের ২৫ মার্চ  দ্বিতীয় ছেলে জন্ম গ্রহণ করে।