ফিরে যেতে চান

রামপুর-বোয়ালিয়া নামের উৎপত্তি

রামপুর-বোয়ালিয়া মূলত দুটি ভিন্ন বিষয় ও ভিন্ন সময়ে উদ্ভব হয়েছে। ১৮৩৮ সালে অজ্ঞাত লেখক রচিত হযরত শাহ মখদুম জীবনী তোয়ারিখে বোয়ালিয়া সম্পর্কে উল্লেখ আছে, ‘রামপুর-বোয়ালিয়া ও বর্তমান দরগাপাড়া বহু রকম দেওয়ের প্রতিমূর্তি ও মঠ, মন্দিরে পূর্ণ ছিল। কতক লোক বলে একটি দেওয়ের নামানুসারে এই স্থান রামপুর নামে অভিহিত হয়। প্রকৃতপক্ষে রামপুর শব্দের পূর্বে এ স্থানটি বোয়ালিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে। হয়তো হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এখানে আস্তানা স্থাপনের পর স্থানটি মহাকালগড়ের পরিবর্তে বোয়ালিয়া নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে।  বোয়ালিয়া সম্পর্কে উল্লেখ আছে, বুয়ালিয়া (>ফা)-বু=সুবাস+আউলিয়া/দরবেশদের স্থান। তিনি বুয়ালিয়া শব্দটিকে সুবাস ও আউলিয়া বা দরবেশদের স্থান হিসেবে গণ্য করেছেন।
এবনে গোলাম সামাদ তাঁর ‘রাজশাহীর ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে বোয়ালিয়া শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্পষ্টভাবে। তাঁর মতে, ‘ওয়ালী’ শব্দটা আরবী। এর অর্থ আল্লাহর কাছের মানুষ। ‘আউলিয়া’ হলো ‘ওয়ালী’ শব্দের বহুবচন। তিনি ‘বো’ শব্দটাকে ফারসী উল্লেখ করেছেন। যার অর্থ গন্ধ। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, অনেকের মতে ‘বোয়ালিয়া’ নামটি উদ্ভব হয়েছে ‘বো-আউলিয়া’ থেকে। শব্দগতভাবে এর অর্থ ‘আউলিয়াদের গন্ধ’। অতীতে এখানে অনেক আউলিয়া এসেছিলেন; তাই জায়গাটির নাম হয়েছিল ‘বো-আউলিয়া’। পরে তা হয়ে দাঁড়ায় ‘বোয়ালিয়া’।
অনেকে ধারণা করেন, রামপুর-বোয়ালিয়া নামটা এসেছে হিন্দুদের দেবতা ও মুসলমানদের দরবেশকে ভিত্তি করে। ১০৪৫ হিজরী বা ১৬৩৪৩ খ্রিস্টাব্দে পারস্য রাজার পক্ষে সেনাধ্যক্ষ মির্জা আলী কুলী বেগ শাহ মখদুম (রহ.) এর মাজার জিয়ারতে এসে এখানেই এবাদত বন্দেগী শুরু করেন। তিনি মাজারের উপর গম্বুজ ঘর, মসজিদ, ১টি মুসাফির খানা, ১টি ইমাম বাড়ি ও তাজিয়া, হিন্দুদের জন্য ১টি দোতলা নহবতখানা নির্মাণ করেন। ধারণা করা যেতে পারে, মাজার সংস্কারের পর তিনিই হয়ত আউলিয়ার আস্তানা অনুসারে অত্র এল-াকাকে মহাকালগড় এর পরিবর্তে ‘বুয়ালিয়া’ বা ‘বোয়ালিয়ায়’ নাম দেন। বর্তমানে শব্দটি বোয়ালিয়া নামে পরিচিত। ১৮২৫ সালে জেলা প্রশাসনের সদর দপ্তর নাটোর থেকে বোয়ালিয়ার পশ্চিম পাশের এলাকা শ্রীরামপুরে আসার পর রামপুর শব্দটিও ক্রমশ প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। এক সময়  বোয়ালিয়ার সঙ্গে রামপুর যোগ হয়ে শহরের নাম হয় ‘রামপুর বোয়ালিয়া’। নিম্নে  এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। 
এবনে গোলাম সামাদ তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘রামপুর এবং বোয়ালিয়া ছিল দুটি বর্ধিষ্ণু জনপদ। যার মধ্যে দিয়ে প্রবাহমান ছিল একটা ছোট নদী...।’৪ প্রকৃতপক্ষে এ ধারণা সঠিক নয়। ঘোড়ামারা পোস্ট অফিসের উত্তর-পশ্চিম পাশ সংলগ্ন রামপুর বাজার ও তার পাশে বোয়ালিয়া মহল্লাটি এখনও বিদ্যমান। এ মহল্লা দুটির ভিতর দিয়ে কোন নদী বহমান ছিল বলে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। বর্তমান সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টের নিচে আছে এক নম্বর ড্রেন। যেটা এক সময় বারাহী নদী নামে পরিচিত ছিল। এবনে গোলাম সামাদ এ নদীকে দিয়েই হয়তো উভয় জনপদের মধ্য সীমানা চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। তা ঠিক নয়। হয়তো বার বার নদী ভাঙ্গনে বাজার জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার কারণে বর্তমান ঘোড়ামারা এলাকার রামপুর বাজার ও বোয়ালিয়াপাড়া মহল্লা দুটির প্রাচীন নাম দিয়ে ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। কারণ সেকালের একাডেমিক শিক্ষিত, সচেতন ও জমিদার পরিবারগুলো সাধারণত ঐ এলাকাতেই বাস করতো। 
রামপুর বোয়ালিয়া হিন্দু ও মুসলমান দুটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি থেকে উৎপত্তি ভৌগলিক নামে সংযোজন ঘটেছে। শব্দ দুটির আগে শহরের নামের সঙ্গে সংযোজনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের মতের প্রচলন আছে। এ গ্রন্থের পূর্ব প্রকাশনায়ও উল্লেখ আছে।
শহর রাজশাহীর আদিপর্ব গ্রন্থের লেখক মাহবুব সিদ্দিকী, রাজশাহী শহরের নামকরণের ইতিহাস প্রবন্ধের লেখক ড. কাজী মোস্তাফিজুর রহমান, ড. মুশফিক আহমদ, ড. নূরুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখ গবেষকগণ ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন, রাজশাহী শহরের নাম মহাকালগড় থেকে বুয়ালিয়া (বোয়ালিয়া), তারপর রামপুর বোয়ালিয়া এবং সবশেষে রাজশাহী ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে ১৬৬০ সালে চুঁচুড়ার ডাচ গভর্নর ফন ডেন ব্রুক বাংলার যে মানচিত্র প্রণয়ন করেন সেখানে বর্তমান রাজশাহী মহানগরীর ইঙ্গিত থাকলেও নামের উল্লেখ নেই। এ মানচিত্রে শুধু রাজশাহী নয়, অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নামই উল্লেখ করা হয়নি। ১৭৬৪-১৭৭৬ সালে মেজর জেমস রেনেল বাংলার ভূমি ও নদ-নদী ভিত্তিক মানচিত্র প্রণয়ন করেন। এ মানচিত্রই বুয়ালিয়া/বোয়ালিয়া (Bauleah) নামটি প্রথম দালিলিক প্রমাণ হিসেবে পাওয়া যায়। ১৮১২ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত The Fifth Report. Vol. 1 এবং ১৮৩১ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি মানচিত্রেও শহরের নির্দেশিত স্থান Bauleah  নামে দেখা যায়। ১৮৫৩ সালের বাংলার মানচিত্রে Bauleah এর সঙ্গে  Rampore শব্দ যুক্ত হয়ে শহরের নাম Rampore Bauleah দেখা যায়। ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত বাংলা ও আসামের মানচিত্রে স্থানাটিকে Rampur Boaliya এবং ১৮৯৩ সালে বাংলার মানচিত্রে  Rampur Bauleah  দেখা যায়। আবার ১৮৫৮ সালের দ্য বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি মানচিত্রে শুধু  Rampore শব্দটি পরিলক্ষিত হয়।৪৮৪ এ সব তথ্য প্রমাণাদি থেকে বলা যায়, শহরের নাম মহাকালগড় থেকে বোয়ালিয়া বা বুয়ালিয়ায় পরিবর্তন হয় ১৬৩৪ সালে হয়রত আলী কুলী বেগ কর্তৃক হযরত শাহ মখদুম রুপোশ (রহ.) এর মাজার কমপ্লেক্স সংস্কারের পূর্বে বা পরে। রেশম ও পরবর্তীতে নীল বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে এ বোয়ালিয়াই শহরে পরিণত হয়। তৎকালে শহর এলাকাটি ছিল দরগা শরীফ ও বড়কুঠিকেন্দ্রিক পদ্মার উত্তর তীর। 
বোয়ালিয়ার পূর্বে রামপুর শব্দটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনামলের সংযোজন। বোয়লিয়ার পশ্চিম এলাকার নাম শ্রীরামপুর। নাটোর থেকে শ্রীরামপুর এলাকাই জেলা সদর দপ্তর স্থাপন হওয়ার পর শ্রীরামপুর শব্দটি ক্রমশ প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে এবং বেশ কয়েক বছর পর বোয়ালিয়ার পূর্বে শ্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রামপুর শব্দটির সংযোগ ঘটে শহরের নাম হয়ে যায় রামপুর বোয়ালিয়া। ১৮২৮ সালে বর্তমান কলেজিয়েট স্কুল ইংলিশ স্কুল নামে বোয়ালিয়াতে স্থাপিত হয়েছিল; সেখানে রামপুর শব্দটি ব্যবহার হয়নি। অ্যাডামসের রিপোর্টে স্কুলের নাম ইংলিশ স্কুল, স্থানের নাম বোয়ালিয়া ও স্থাপন কাল ১৮৩৩ সাল উল্লেখ আছে। তবে অন্য সূত্র মতে স্থাপন কাল ১৮২৮ সাল। ১৮২৫ সালে শ্রীরামপুরে জেলার প্রশাসনিক দপ্তর স্থাপন হওয়ার ফলে শ্রীরামপুর শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং বোয়ালিয়ার পূর্বে শ্রী বিশেষণটি ব্যতীত রামপুর শব্দের সংযোজন ঘটে রামপুর বোয়ালিয়া নামে প্রচলন হয়ে ওঠে। ১৮৫৮ সালে দ্য বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি মানচিত্রে প্রশাসনিক দপ্তরের গুরুত্ব দিয়ে বা শহরের প্রথম শব্দটি চিহ্নিত করে Rampore উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃত নাম রামপুর বোয়ালিয়া। ১৮৭৬ সালের প্রাদেশিক অ্যাক্ট এর অধীনে প্রণীত দ্য মিউনিসিপ্যাল বাই লজেও শহরের নাম উল্লেখ করা হয় Town of Rampore Bauleah. তবে যে মৌজা,  গ্রাম বা মহল্লাকে কেন্দ্র করে রামপুর বোয়ালিয়া নামের উৎপত্তি, সেই মহল্লার একটির নাম এখনও শ্রীরামপুর নামেই পরিচিত। তার সিংহভাগ নদী গর্ভে বিলীন। বর্তমানে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা, খ্রিস্টিয়ান মিশন হাসপাতাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান শ্রীরামপুরে অবস্থিত। প্রাচীন বোয়ালিয়া বর্তমানে দরগাপাড়া, বড়কুঠি ও তৎসংলগ্ন এলাকা। তবে জায়গাটি এখন বোয়ালিয়া নামে পরিচিত নয়। বর্তমানে বোয়ালিয়াপাড়া ও রামপুর বাজার নামে ঘোড়ামারার পাশে দুটি মহল্লার নাম। ঘোড়ামারা পোস্ট অফিসের উত্তর পাশ এলাকা রামপুর বাজার এবং রামপুর বাজারের রাস্তার পশ্চিমের বড় একটি মহল্লা বোয়ালিয়া। রেশমপট্টি (তাঁতীপাড়া), মুন্সিডাঙ্গা, রানী বাজার বালিকা বিদ্যালয় প্রভৃতি বোয়ালিয়াপাড়ায় অবস্থিত।৪৮৭ বোয়ালিয়াপাড়া বর্তমানে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ২০নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী এ মহল্লার মোট জনসংখ্যা ৩৪৩৯ জন ও হাউজ হোল্ড (খানা) ৭৩৪টি। রামপুর বাজারের অবস্থান ২২নং ওয়ার্ডে। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী এ মহল্লার মোট জনসংখ্যা  ৭২৮ জন ও হাউজ হোল্ড (খানা) ১৬৮টি।