ফিরে যেতে চান

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র/প্রশাসকগণের সংক্ষিপ্ত জীবনী

মো. আব্দুল হাদী ১৯৯

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র মো. আব্দুল হাদী। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ,  ক্রীড়া সংগঠক ও সমাজসেবক। তার নামানুসারে তার বাসভবন  এলাকার নাম হয়েছে হাদীর মোড়।  তিনি রাজশাহী  মহানগরীর  রাণীনগর মহল্লায় ১৯৩৩ সালে  জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আব্দুল গফুর ও মা ফাতেমা খাতুন। বাবা-মার তিন সন্তানের মধ্যে হাদী সবার ছোট। বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবী। হাদীর লেখাপড়া রাজশাহী মহানগরীতেই। রাজশাহী লোকনাথ হাই স্কুল থেকে তিনি ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক (এসএসসি) পাস করেন। রাজশাহী কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৫২ সালে ইন্টারমিডিয়েট (এইচএসসি) ও ১৯৫৪ সালে বিএ এবং ১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করে ১৯৫৮ সালে রাজশাহী জজকোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন।
৩০ সেপ্টেম্বর ২০০৫ তারিখের এক আত্মজীবনীমূলক প্রতিবেদনে তার প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন ও সমাজসেবার ভূমিকা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করলেও ১৯৫৬ সালে আইনের ছাত্রাবস্থায় রাজশাহী পৌর সভায় কমিশনার ও একই বছরে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অল্প বয়সে একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া থেকে ধারণা করা যায়, তরুণ বয়সেই তিনি সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন চালু হলে সামরিক সরকার তৎকালীন নির্বাচিত পরিষদকে বাতিল করে পৌরসভা পরিচালনার জন্য স্থানীয় সামরিক প্রশাসক কর্তৃক উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। হাদী ঐ পরিষদের অন্যতম সদস্য মনোনীত হন। ১৯৬১ সালে রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে প্রায় দশ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়া সংস্থার নির্বাহী সদস্য হন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ রেফারিজ বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহী ক্রীড়াঙ্গন উন্নয়নে এ সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গেমের আয়োজন করে তিনি এখানে ক্রীড়ার বিকাশ ও স্থানীয় খেলোয়াড়দের দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেন।
১৯৬৮ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন এবং উক্ত সালেই আওয়ামী লীগের রাজশাহী সদর মহকুমার সাধারণ সম্পাদক হন। পরবর্তীতে রাজশাহী সদর মহানগরীতে রূপান্তরিত হলে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজশাহী মহানগরী শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে অংশগ্রহণ করে ২০০২ সাল পর্যন্ত মহানগরীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।
স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে হাদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন। সদর আসনের এমপিএ ও আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে তনি পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনগণকে অসহযোগ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণে ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য স্থানীয়ভাবে তিনি সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ শরণার্থীদের মুর্শিদাবাদ জেলায় পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ প্রবাসী সরকার তাকে মুক্তিযোদ্ধা তৈরি ও প্রশিক্ষণের জন্য পানিপিয়া ক্যাম্পে দায়িত্ব দেন। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্ত অগ্রবর্তী ক্যাম্পগুলো তদারকেরও দায়িত্ব পান।
স্বাধীনতা উত্তর বিধ্বস্ত দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও জনগণকে পুনর্বাসনের জন্য জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির তিনি ছিলেন অন্যতম সদস্য। সে সময় তিনি বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটি, রাজশাহী জেলা ইউনিটের (বর্তমান বৃহত্তর রাজশাহী) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করে তিনি ১৩ আগস্ট ১৯৮৭ তারিখে রাজশাহী মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের প্রথম প্রশাসক মনোনিত হন এবং ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ তারিখে তিনি প্রথম মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৫ এপ্রিল ১৯৯০ তারিখ পর্যন্ত ঐ দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহীতে সোডিয়াম বাতি স্থাপন, পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে কাঠামোগত পরিবর্তনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী জজকোর্টের পিপি, দৈনিক বার্তা পত্রিকার অছি বোর্ডের সদস্য, সাপ্তাহিক রাজশাহী বার্তার সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি বেশ কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং এখনও আছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, সৌদী আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। পত্নী কাজী মনোয়ার সুলতানাসহ তিনি ২০০১ সালে হজ পালন করেন। কাজী মনোয়ার সুলতানা রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষিকা ছিলেন। হাদী ৩৬ বছর সক্রিয় রাজনীতিতে থেকে বর্তমানে অবসর জীবনে সমাজ সেবায় নিয়োজিত আছেন।