ফিরে যেতে চান

রাজশাহী নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে কয়েক শতাব্দী পূর্বে ফিরে যেতে হয়। এ শহরের প্রাচীন নাম ছিল মহাকালগড়। পর্যায়ক্রমের রূপান্তর বোয়ালিয়া, রামপুর-বোয়ালিয়া, রাজশাহী। রামপুর-বোয়ালিয়া থেকে রাজশাহী নামটির উদ্ভব কিভাবে হলো এর সুস্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা নাই। বিভাগ গাইড রাজশাহী গ্রন্থের ১২-১৩ পৃষ্ঠায় বিবরণ আছে,  ব্রিটিশ আমলের প্রাথমিক যুগের ইতিহাসেও রাজশাহী নামে কোনো জনপদ বা স্থানের উল্লেখ নাই। অনেকে মনে করেন, এ জনপদ একদা বহু হিন্দু, মুসলিম, রাজা, সুলতান আর জমিদার শাসিত ছিল বলে নামকরণ হয়েছে রাজশাহী। ঐতিহাসিক ব্লকম্যান  (Bolch Mann) এর মতে, খ্রি. ১৫শ শতকে গৌড়ের মুসলিম  সালতানাত এ জেলার ভাতুড়িয়ার জমিদার রাজা গণেশ কর্তৃক আত্মসাতের সময় থেকে রাজশাহী নামের উদ্ভব হয়েছে। তিনি দাবি করেন, গৌড়ের সুলতান মাহমুদ শাহ, বারবাক শাহ প্রভৃতির নামানুসারে যেমন রাজশাহীর আশেপাশের মাহমুদ শাহী, বারবাকশাহী পরগনার উদ্ভব হয়েছে; একইভাবে মুসলিম মসনদে আরোহণকারী হিন্দু রাজা শাহ বলে পরিগণিত হওয়ায় এ এলাকার নামকরণ হয়েছে মিশ্রজাত শব্দটির। কিন্তু ব্লকম্যানের অভিমত গ্রহণে আপত্তি করে বেভারিজ  (Beveridge) বলেন, নাম হিসেবে রাজশাহী অপেক্ষা অর্বাচীন এবং এর অবস্থান ছিল রাজা গণেশের জমিদারী ভাতুড়িয়া পরগনা থেকে অনেক দূরে। রাজা গণেশের সময় এ নামটির উদ্ভব হলে তার উল্লেখ টোডরমল প্রণীত খাজনা আদায়ের তালিকায় অথবা আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী নামক গ্রন্থে অবশ্যই পাওয়া যেত। বাংলার নবাবী আমল ১৭০০ হতে ১৭২৫ সালে নবাব মুর্শিদকুলী খান সমগ্র বাংলাদেশকে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য ১৩ (তের)টি চাকলায় বিভক্ত করেন। যার মধ্যে চাকলা রাজশাহী নামে একটি বৃহৎ বিস্তৃতি এলাকা নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে প্রবাহিত পদ্মা বিধৌত রাজশাহী চাকলাকে তিনি উত্তরে বর্তমান রাজশাহী ও দক্ষিণে মুর্শিদাবাদের সঙ্গে অপর অংশ রাজশাহী নিজ চাকলা নামে অভিহিত করেন। তবে ১৮১২ সালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফিফথ রিপোর্টে নীল চাকলা রাজশাহী (Nil Chakla Rajshahi) উল্লেখ আছে।৮০০ প্রথমে সমগ্র চাকলার রাজস্ব আদায় করতেন হিন্দু রাজ-জমিদার উদয় নারায়ণ। তিনি ছিলেন মুর্শিদকুলির একান্ত প্রীতিভাজন ব্যক্তি। সে জন্য নবাব তাকে রাজা উপাধি প্রদান করেন। দক্ষিণ চাকলা রাজশাহী নামে বিস্তৃত এলাকা যা সমগ্র রাজশাহী ও পাবনার অংশ নিয়ে অবস্থিত ছিল, তা ১৭১৪ সালে নবাব মুর্শিদকুলী খান নাটোরের রামজীবনের নিকট বন্দোবস্ত প্রদান করেন। এ জমিদারি পরে নাটোরের রানি ভবানীর  শাসনে আসে ও বহু অঞ্চলে নিয়ে বিস্তৃতি লাভ করে। এ জমিদারি প্রথম নাটোররাজ রামজীবন ১৭৩০ সালে মারা গেলে তার দত্তক পুত্র রামকান্ত রাজা হন। ১৭৫১ সালে রামকান্তের মৃত্যুর পরে তার স্ত্রী ভবানী নামে উত্তরাধীকারী লাভ করেন। অনেকের মতে, প্রথম রাজা উদয় নারায়নের উপর প্রীতিবশত এ চাকলার নাম রাজশাহী করেন নবাব মুর্শিদকুলী খান। কিন্তু ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র মতে, রানী ভবানীর দেয়া নাম রাজশাহী। অবশ্য মি. গ্রান্ট লিখেছেন যে, রানী ভবানীর জমিদারীকেই রাজশাহী বলা হতো এবং এ চাকলার বন্দোবস্তকালে রাজশাহী নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।৩  
অনেকে এসব ব্যাখ্যাকে যথার্থ ইতিহাস মনে করেন না। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের মতে, নাটোরের রাজা রামজীবনের জমিদারি রাজশাহী নামে পরিচিত ছিল এবং সেই নামই ইংরেজরা গ্রহণ করেন এ জেলার জন্য। ডা. কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ড. মুশফিক আহমদ ও ড. নূরুল হোসেন চৌধুরী রাজশাহী শহরের নামকরণের ইতিহাস প্রবন্ধে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য মুর্শিদকুলী খানের বিভক্ত ১৩টি চাকলার মধ্যে একটির নামও রাজশাহী ছিল না বলে মত প্রকাশ করেন। তাঁরা যুক্তি উপস্থাপন করেন, গোলাম হুসেন সালীম রচিত ফারসি গ্রন্থ রিয়াজ-উস-সালাতিন গ্রন্থে রাজশাহী চাকলা নামকরণ সম্পর্কে যথেষ্ট ভ্রান্তি আছে। ১৭২২ সালে সুবাদার মুর্শিদকুলী খানের রাজস্ব বন্দোবস্ত ‘জমা কামিল তুমারি’ নামে পরিচিত। এ বন্দোবস্তে বাংলা সুবাকে (প্রদেশকে) ১৩টি চাকলা ও ১৬৬০টি পরগণায় বিভক্ত করা হয়েছিল। পরগণাগুলোর ১২৫৬ টিকে ২৫টি জমিদারিতে এবং ৪০৪ টি পরগণাকে জায়গিরে (সৈন্য) বিভাগাদিসহ বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছিল। এ গ্রন্থে ১৩টি চাকলার মধ্যে ১২ টির নাম উল্লেখ আছে ১. আকবরনগর (রাজমহল), ২. বর্ধমান, ৩. হুগলী, ৪. হিজলী, ৫. যশোর, ৬. ভূষণা, ৭. জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা), ৮. ইসলামাবাদ (চট্টগ্রাম), ৯. সিলেট, ১০. ঘোড়াঘাট, ১১. রংপুর ও ১২. কুচবিহার। প্রবন্ধকারেরা নাম না থাকা চাকলটিকে রাজধানী মুর্শিদাবাদ চাকলা অনুমান করেন। আবার বাংলার ইতিহাস বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আবদুল করিম মুর্শিদকুলী খানের সময়কালের গবেষণা গ্রন্থে এ ১৩টি চাকলার যে নাম উল্লেখ করেছেন সেখানেও রাজশাহীর নাম নেই। নামগুলোর সঙ্গেও আছে বিভান্তি। তাঁর উল্লেখিত নামগুলো-১. বন্দর বালাসোর, ২. হিজলী, ৩. মুর্শিদাবাদ, ৪. বর্ধমান, ৫. হুগলী বা সাতগাঁও, ৬. ভূষণা, ৭. যশোর, ৮. আকবরনগর (রাজমহল), ৯. ঘোড়াঘাট, ১০. কুরিবরি বা কড়িবাড়ি (কড়ইবাড়ি), ১১. জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা), ১২. সিলেট ও ১৩. ইসলামাবাদ (চট্টগ্রাম)। এ সময় সমস্ত বরেন্দ্র অঞ্চল আকবরনগর ও ঘোড়াঘাট চাকলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রবন্ধকারদের মতে, এ সময় রাজশাহী এ দুটি চাকলা অথবা মুর্শিদাবাদ চাকলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই চাকলার নামানুসারে উদয়নারায়ণের জমিদারির নাম রাজশাহী হয়েছে এ কথা যুক্তিসঙ্গত নয়। তবে বাংলায় মুর্শিদকুলী খানের আগমনকালে বর্তমান রাজশাহী অঞ্চলে (পদ্মা নদীর উত্তর ও দক্ষিণপারের ব্যাপক অঞ্চল) উদয়নারায়ণের বিশাল জমিদারি ছিল। তার কর্মদক্ষতার কারণে ১৭১৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত তাঁকেই এ জমিদারিতে বহাল রাখা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে মুর্শিদিকুলী খানের পূর্বে রাজশাহী শব্দটি ব্যবহার হয়নি। ১৬৬০ সালে প্রণীত ফন ডেন ব্রুকের মানচিত্রে রাজশাহী শব্দটি নেই। ১৭৭৬ সালে রেনেলের মানচিত্রে সর্ব প্রথম RAUJESHY শব্দটি পদ্মার উত্তর তীর ও দক্ষিণ তীরের ব্যাপক অংশের পরিচয়ে ব্যবহার হয়েছে। এ এলাকা এ সময় উদয়নারায়ণের জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল। ধারণা করা হয়, মুর্শিদকুলী খান সংস্কৃত ‘রাজ’, ফারসি ‘শাহ বা শাহী’ শব্দ যোগে এ বিশাল জমিদারির নামকরণ করেছিলেন রাজশাহী। যেমন তিনি জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা) থেকে বাংলার রাজধানী মকসুদাবাদে স্থানান্তরের পর নিজের নামে মকসুদাবাদের নাম দিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদ। সুতরাং প্রবন্ধকারদের মতানুসারে চাকলা নয়; জমিদার উদয়নারায়ণের জমিদারির নামকরণ করা হয়েছিল রাজশাহী। মুর্শিদকুলী খানের আমলেই এ জমিদারি নাটোর জমিদারির আওতাধীনে এসে উভয় জমিদারি একীভূত হয়ে রাজশাহী নামে পরিচিতি পায়। যা ছিল বাংলার সর্ব বৃহৎ জমিদারি।৪৮৪
নবাবী আমল থেকেই বৃহত্তর রাজশাহীর প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা হতো নাটোর থেকে। নাটোররাজ বৃহত্তর রাজশাহীর প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব পালন করতেন। ব্রিটিশ শাসনের পত্তন হলেও সে সূত্র ধরে নাটোরই প্রশাসনিক সদর ছিল। তখন রাজশাহী মহানগরী (তৎকালীন বোয়ালিয়া) ছিল বিখ্যাত বাণিজ্য বন্দর। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে নাটোর ক্রমশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। নারদ নদীর মুখ বালি দ্বারা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বন্যার দূষিত পানি নাটোর শহরে আটকে পড়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শহরবাসী বিভিন্ন পীড়ায় আক্রান্ত হতে আরম্ভ করে।
একদিকে নারদ নদের মুখ বন্ধ, অন্য দিকে চলনবিল, হালতীর বিল ও তেলীর বিলের বন্ধ পানি নিষ্কাশন না হওয়ার কারণে নাটোর শহরের পরিবেশ আরো অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। তাই তৎকালীন রাজশাহীর কালেক্টর জে এ প্রিংগলকে জেলার প্রশাসনিক সদর দপ্তর স্থানান্তরের জন্য উপযোগী জায়গা অনুসন্ধান করতে বলা হয়। জে এ প্রিংগল অনুসন্ধানে বোয়ালিয়াকে সমর্থন জানিয়ে ১৮২২ সালের ২৩ এপ্রিল রিপোর্ট প্রদান করেন।৪৮৫ ফলে ১৮২৫ সালের জানুয়ারিতে জেলার সদর দপ্তর নাটোর শহর থেকে রামপুর বোয়ালিয়ার শ্রীরামপুরে একটি গুদাম ঘরে স্থানান্তর করা হয়।৪৮৬ কিন্তু ১৮৫০ সালের প্রবল বন্যা হয় এবং শ্যামপুর নদী গর্ভে ভেঙ্গে পড়ে। ফলে পার্শ্ববর্তী বুলনপুরে সরকারি দপ্তর স্থানান্তর করা হয় ও সেখানেই বিদ্যমান আছে।