ফিরে যেতে চান

মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচিত চেয়ারম্যান বানারশি

মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচিত চেয়ারম্যান বানারশি 

১৬ জানুয়ারি ২০১২ তারিখের রাতে বুলনপুর সুইপার কলোনির প্রবীণ বাসিন্দা কমল সরকার জমাদারের (জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৫৬) নিকট থেকে জানা যায়, শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়খানার বিপরীত পাশে পার্কের গেট সুইপার কলোনি বা চণ্ডিপুর বেতিয়াপাড়ার প্রথম বাসিন্দা বানারশি জমাদার রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাহবুব সিদ্দিকীর শহর রাজশাহীর আদিপর্ব গ্রন্থে ফজর আলি খাঁনের (১৮৯৫-১৯৮০) রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রবন্ধে এর সত্যতা পাওয়া যায়। এ প্রবন্ধের তথ্য মোতাবেক দেশ বিভাগের পূর্বে রাজশাহীতে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী রাজশাহী ভোলানাথ একাডেমী প্রাঙ্গণে হিন্দু মহাসভার মিটিং করেন এবং  হিন্দু মহাসভা দল গঠন করেন। সে সময় সুরেন্দ্র মোহন মৈত্র, তাঁর ভাই সত্যেন্দ্র মোহন মৈত্র ও অন্যান্যরা মিলে কংগ্রেস দল গঠন করেছিলন। তার কিছু দিন পর যদুনাথ সরকার, সুরেন্দ্র মোহন মৈত্রের মেয়ে ও আরো কয়েক জন নারী-পুরুষ মিলে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন ও রানীবাজারে তাঁদের একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেছিলেন। এ তিনটি পার্টির মধ্যে কংগ্রেস ছিল সবচেয়ে জোরালো। তাঁদের প্রবল প্রতাপে বেনারসি ডোমকে পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে জয়যুক্ত করা হয়েছিল।৬৮২ 
প্রকৃতপক্ষে বানারশি বা বেনারশি ডোম জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন হেলা জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁদের সে সময়ের পেশা এক হলেও বংশগত পার্থক্য আছে। কমল সরকার জমাদারের তথ্য মোতাবেক তাঁর দাদা আনন্দি জমাদার (মৃত্য ১৯৭১) ও তাঁর নানার পিতা বানারশি জমাদার ১৯২৭ সালের পূর্বে সপরিবারে এলাহাবাদ থেকে রাজশাহী আসেন। আনন্দি সপরিবারে এলাহাবাদ থেকে এসে  এখানে বসবাস শুরু করেন। সরকারই তাঁদের নিয়ে এসেছিল। পূর্বে এ জায়গাটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের মাঠ ছিল ও দুটি পরিত্যক্ত ঘর ছিল। পরিত্যক্ত ঘর দুটিতেই বসবাস শুরু করেছিলেন আনন্দি। পরে বাড়ি তৈরি করেছিলেন। তাঁর ছেলের নাম ঝুড়ে লাল জমাদার (মৃত্যু ১৯৫৬)। ঝুড়ে লাল জমাদারের ছেলেই কমল সরকার জমাদার। তাঁর মতে, বানারশি জমাদার বাড়ি তৈরি করেন পার্কের গেট সুইপার কলোনি বা চণ্ডিপুর বেতিয়াপাড়ায়। বানারশির ছেলের নাম ছিল মঙ্গল জমাদার। মঙ্গল জমাদারের ছেলে ঠাকুর দিন চৌধুরী ও মেয়ের নাম চিন্তামনি জমাদার। চিন্তামনি জামাদারের ছেলেই বুলনপুরের কমল সরকার জমাদার। 
১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে বিকেল ৬ টায় কথা হয় বেতিয়াপাড়ায় বানারশির বর্তমান বংশধরদের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মণ্ডল শ্রী অরুন কুমার দিলিপ (জন্ম ১৯৫৭) ও শ্রীমতি জোসনা (জন্ম আনুমানিক ১৯৫৫)। তাঁরা চাচাতো ভাই-বোন ও বানারসির নাতি-নাতনির সন্তান। তাঁরাসহ উপস্থিত সবাই জানালেন, বানারশি পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। এ কথা তাঁদের দাদি বা নানীর কাছ থেকে শুনেছেন। অন্যরাও বংশীয় পরম্পরাই শুনে আসছেন। দিলিপ বানারশির একটি ঋণ গ্রহণের চুক্তিপত্র দেখান। এ চুক্তির মাধ্যমে বানারশি সরকারের কাছে কিছু ঋণ নিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, এ টাকা দিয়ে বানারশি এ জমি কিনেছিলেন। ঋণপত্রের তারিখ ২৯/১/২৭। অর্থাৎ ২৯ জানুয়ারি ১৯২৭। ইংরেজি অক্ষরে বানারশির নাম আছে Banarashi Methar. তাঁর পিতার নাম আছে Late Ramani Jamadar. বাংলা অক্ষরে আসে রানারশি মেথর ও পিতা মৃত রমাই জমাদার। ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে বিকেলে নগর ভবনের রাজশাহী সিটি মিউজিয়াম ২১১ নং কক্ষে আবারো কথা হয় শ্রী অরুন কুমার দিলিপ এর সাথে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন উপ শহর ২ নং সেক্টর নিবাসী সার্ভেয়ার মো. এমরান আলী (জন্ম ১৯৬৯)। এমরান তাঁদের সম্পত্তি ও মামলার বিষয় দেখাশোনা করেন। এমরান জানান, বানারশির নামে বেতিয়াপাড়ার জমি ১৯২২ সালের খতিয়ানে রের্কডভুক্ত হয়েছে। তার পূর্বে বানারশি কোন এক জমিদারের নিকট এ জমিন পত্তন পায়। বেতিয়াপাড়ার বর্তমান প্রজন্মের মতে, বানারশি জজ কোর্টে চাকরির পাশাপাশি কবিরাজি করতেন। কবিরাজি করার ফলে শহরে তাঁর বেশ প্রভাব ছিল। সে সুবাদে তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। 
এরপূর্বে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখের রাতে অরুন কুমার দিলিপ হেলার সঙ্গে কথা হয়েছিল পার্কের গেট সুইপার কলোনিতেই। সেদিন তাঁর সঙ্গে ছিলেন শ্রী আজাদ হেলা (বয়স ৫০), শ্রী অরুণ কুমার হেলা (বয়স ৪৫), শ্রী গোপাল হেলা (বয়স ৩৫)। তাঁদের মতে, আমাদের পূর্ব পুরুষ বানারশি এখানে আগমন করেন ১৯২২ সালের পূর্বে এলাহাবাদ থেকে। তখন তাঁর সঙ্গে ১৮ জন লোক ছিল। তিনি জজ কোর্টে চাকরি নিয়েছিলেন। আমরা পূর্বে কুলা, ঝুড়ি ইত্যাদি বানাতাম। বানারশি কবিরাজিও করতেন। বানারশির পরিবারই বংশীয় পরম্পরায় এখানে বসবাস করছেন। তাঁদের মতে, এ জায়গাটির মালিকানা এখনো বানারশির নামেই আছে। বানারশির বংশীয় উপাধি জমাদার। তাঁর প্রকৃত নামের আগে-পরে যাই থাক না কেন, বর্তমান প্রজন্ম তাঁকে বানারশি জমাদার বলে থাকেন।  
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে সংরক্ষিত পুরনো অনার বোর্ডে ১৯২১ সাল থেকে চেয়ারম্যানগণের নাম লিখা আছে। সেখানে বানারশির নাম নাই। বানারশির নামে বেতিয়াপাড়ার জমি ১৯২২ সালের খতিয়ানে রের্কডভুক্ত থাকলেও তার পূর্বে জমিদারের নিকট পত্তন পেলে তিনি এসেছিলেন ১৯২১ সালের অনেক পূর্বে। ১৯২১ সালের পূর্বেই তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারেন। সে কারণে উল্লেখিত পুরনো অনার বোর্ডটিতে তাঁর নাম নাই। তবে বিলুপ্ত পুরনো নগর ভবনের শিলালিপিতে মিউনিসিপ্যালিটি ১৯৩৪-১৯৩৯ পরিষদে কমিশনারদের তালিকায় কবিরাজ বি. সেন গুপ্ত উল্লেখ আছে। এ বানারশিকেই কবিরাজ বি. সেন গুপ্ততে রূপান্তর করা হয়েছিল কি না কে জানে? তৎকালীন প্রকট বর্ণবাদী সামাজিক কাঠামোই তথাকথিত উচ্চ বর্ণের প্রবল আপত্তির মুখেও কবিরাজ বেনারশি মেথরকে কমিশনার নির্বাচিত করা হয়েছিল। জাত রক্ষার তাগিদে নামের পরিবর্তন ঘটিয়ে কবিরাজ বি. সেন গুপ্ত বানানো হতে পারে। পরিষদের ঐ মেয়াদে কোন এক সময়ে তাঁকে হয়তো চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। তা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও হতে পারে। তৎকালীন বর্ণবাদীদের কুটকৌশলে হয়তো কবিরাজ বেনারশি মেথর বা পরিবর্তিত নামেও চেয়ারম্যান হিসেবে লিপি হতে পারেনি। তবে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য আরো গবেষণা প্রয়োজন।