ফিরে যেতে চান

প্রাচীনত্ব: রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের উৎস প্রতিষ্ঠানের নাম রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটি। এ মিউনিসিপ্যালিটির সূচনা কাল ১৮৬৯ সাল।১১৫ ১৮৬৯ সালে এর অফিসিয়াল কার্যক্রম কোথায় শুরু হয়েছিল তার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। কোন সূত্র ছাড়াই মুহম্মদ আবদুস সামাদ সুবর্ণ দিনের বিবর্ণ স্মৃতি গ্রন্থে (১৯৮৭) এর বাষট্টি পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘এই মিউনিসিপ্যালিটি প্রথম আত্ম প্রকাশ করেছিল টাউন কমিটিরূপে, যা বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত বহাল ছিল। ১৯২০ সালের পূর্বে এর নির্দিষ্ট অফিস ঘর ছিল একটি টিনের চালায় বর্তমানের  ভুবন মোহন পার্কের অভ্যন্তরে মাত্র দুইটি কক্ষ নিয়ে। তারপর কমিটি দায়িত্ব পালনে আরও সুযোগ সৃষ্টির অবকাশে রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে একটি বড় কক্ষে অফিস স্থানান্তরিত হয়।’৬১৮ কোন সূত্র ছাড়াই বিভাগ গাইড- রাজশাহী (১৯৯৫) গ্রন্থের ৩২ পৃষ্ঠায় একই কথার উল্লেখ করা হয়।৩ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীও তাঁর শহর রাজশাহীর আদিপর্ব (২০১৩) গ্রন্থে এ তথ্য প্রদান করেন। তবে গ্রন্থের ৩৬৬-৩৮৫ পৃষ্ঠায় কবি ফজর আলি খাঁনের ‘রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ শিরোনামে একটি পাণ্ডুলিপি দেখা যায়। ফজর আলি খাঁনের জন্ম ১৮৯৫ সালে ও মৃত্যু ১৯৮০ সালে। মাহবুব সিদ্দিকী তাঁর বিএ পাসের সাল উল্লেখ করেছেন ১৯১৪। পাণ্ডুলিপি পড়ে মনে হয় জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে অনেক কিছুই তিনি তাঁর স্মৃতি থেকে তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘.....অনুমান ৭০ বৎসর হইল চলনের জমিদার ভুবন মোহন মৈত্রেয় মালোপাড়ায় যেখানে একটি ডোবা ও গুলির আড্ডা ছিল সেখানে ভুবন মোহন পার্ক স্থাপন করেন। শহরের চাহিদা হিসাবে ইহা অত্যন্ত ছোট হইলেও বর্তমানে ইহাই একমাত্র পার্ক।’
শ্রীকালীনাথ চৌধুরী ১৯০১ সালে প্রকাশিত তাঁর রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস গ্রন্থ উল্লেখ করেছেন, বর্ত্তমানে জজ আদালতের একজন প্রসিদ্ধ উকিল বাবু ভুবন মোহন মৈত্র ১৯০০ খৃষ্টাব্দের ১২ মে হইতে চেয়ারম্যান কার্য্যরে ভার গ্রহণ করিয়াছেন। ভুবন মোহন সহরের এবং জনসাধারণের উপকারের জন্য অনেক অর্থ ব্যয় করিয়াছেন। তিনি রেশম স্কুলে ৩০০০্ মালোপাড়া জুবলী বাগান প্রস্তুতের জন্য ৩০০০্ দান করিয়াছেন।
রাজশাহী এসোসিয়েশন সাহিত্য পত্রিকা তৃতীয় সংখ্যায় সাইদ উদ্দিন আহমেদ রাজশাহীর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ভুবন মোহন পার্কটি সুরেন্দ্র মোহন মৈত্রের পিতা ভুবন মোহন মৈত্রের অনুদানে স্থাপিত।
সুবর্ণ দিনের বিবর্ণ স্মৃতি (১৯৮৭)  ও বিভাগ গাইড- রাজশাহী (১৯৯৫) গ্রন্থ ব্যতীত অন্য কোন প্রাচীন গ্রন্থে ভুবন মোহন পার্কে রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির অফিস স্থাপনের তথ্য পাওয়া যায় না। তাই এর সত্যতা যাচায়ের জন্য আরো গবেষণা প্রয়োজন। ভুবন মোহন পার্ক মহানগরীর মালোপাড়ায় অবস্থিত ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি। ভুবন মোহন পার্কের পূর্ব নাম জুবিলী গার্ডন। যদি এখানে একটি টিনশেডের দুটি কক্ষে ১৮৬৯ সালের তৎকালীন রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির কার্যক্রম আরম্ভ হয়, তাহলে মিউনিসিপ্যালিটি স্থাপনের সময় জায়গাটির মালিক ও কি অবস্থায় ছিল? এসব তথ্য অনুসন্ধানের জন্য আরো গবেষণার প্রয়োজন। 
যদি মিউনিসিপ্যালিটি এখানে যখন কার্যক্রম শুরু করে তখন জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। অতপর ১৮৯৭ সালে অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও জমিদারদের প্রচেষ্টায় যে সময় ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় সে সময় হয়তো জুবিলী গার্ডেন নামে পার্ক বানানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং ভুবন মোহন মৈত্র পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবার পর বাস্তবায়ন করেন। জুবিলা গার্ডেন নামের পরিবর্তন হয়ে কখন ও কিভাবে ভুবন মোহন পার্ক হলো সে তথ্যও পাওয়া যায় না। ভুবন মোহন মৈত্রের মৃত্যুর পর তাঁর কৃতিত্বের স্মৃতিস্বরূপ জুবিলী গার্ডেনের পরিবর্তে ভুবন মোহন পার্ক রাখা হয়।
বিলুপ্ত নগর ভবন: ১৯২১ সালে সোনাদিঘির পশ্চিম পাড়ে পৌরভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯২৩ সালে উদ্বোধন করেন বাংলার গভর্নর লর্ড লিটন।৬১৮ মুহম্মদ আবদুস সামাদ তাঁর সুবর্ণ দিনের বিবর্ণ স্মৃতি গ্রন্থের ৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, “........১৯২১ সালে কমিটি কলেজ কক্ষ হতে নূতন নির্মিত ভবনে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমান ভবনটি ও ইমারত ১৯২১ সালে প্রথম নির্মিত কমিটির নিজস্ব ভবন।” আবার ৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, “.....মিউনিসিপ্যালিটির অধীনে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে ও এই কমিটির দায় দায়িত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হতে থাকে। এই দায়িত্বের পাশাপাশি কমিটির নিজস্ব ভবন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে যা গভর্ণর জেনারেল লর্ড লিটন ১৯২৩ সালে শুভ উদ্বোধন করেন এবং একই সালে লর্ড লিটন নওগাঁর শান্তাহার নওগাঁ সংযোগকারী নূতন নির্মিত ব্রীজের উদ্বোধন করেন যা’ আজও তার নামানুসারে লিটন ব্রীজ নামে পরিচিত।”

সোনাদিঘির বিলুপ্ত নগর ভবন

২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এখান থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম  নতুন ভবনে স্থানান্তর হলে নিচতলা পরিচ্ছন্ন বিভাগ ও উপর তলা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের অফিস, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সংগঠনের অফিস হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে। মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের উদ্যোগে ১ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে সেখানে বিজনেস পয়েন্ট-২ নামে গার্মেন্টস প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হয় এবং অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে এক মাস এক সপ্তাহ চালুর পর বন্ধ হয়ে যায়।৬২২ ১৪ অক্টোবর ২০০৯ তারিখে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও এনা প্রপার্টিজ লি. এর সঙ্গে সিটি সেন্টার নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে ভবনটি ভেঙ্গে রাজশাহী সিটি সেন্টার নামে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। 
বর্তমান নগর ভবন: বর্তমান দশতলা বিশিষ্ট নগর ভবন গ্রেটার রোডের কাদিরগঞ্জে অবস্থিত। ভবনটি দুটি পর্যায়ে এবং দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত হয়। প্রথম পর্যায়ে ৫ তলা পর্যন্ত ও দ্বিতীয় পর্যায়ে দুটি লিফ্টসহ ঊর্ধ্বমুখী ৫ তলার সঙ্গে দক্ষিণ পাশে ৪ তলা বিশিষ্ট অ্যানেক্স ভবন নির্মিত হয়।

নগর ভবনের সমুখস্থ সিঁড়ির সামনের দেয়ালে স্থাপিত ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ও দ্বার উন্মোচনের প্লেট

১ম পর্যায়ে ১০ ফ্লোরের ভিত্তির উপর ৫ ফ্লোরের ভবন নির্মিত হয়। এতে ব্যয় হয় ৯ কোটি ৫৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ভবন চত্বরের মোট জমির পরিমাণ ৪.৬৪ একর। মূল ভবনটি নির্মাণ হয়েছে ১২০০ বর্গ মিটার ভূমির উপর। ৫টি ফ্লোরের মোট স্পেস ৫৬২২.৪৫ বর্গ মিটার। সাধারণ অফিস কক্ষ ছাড়াও ৩য় তলায় মেয়রের দপ্তরের সঙ্গে ১টি ও ৪র্থ তলায় ১টি সেমিনার কক্ষ, ৫ম তলায় ১টি নামাজের কক্ষ রাখা হয়। ১০ তলা নির্মাণের পর নামাজের কক্ষটিকে ষষ্ঠ তলায় স্থানান্তর করা হয়েছে। প্লাজার অংশ হিসেবে মেইনগেট প্রবেশ অংশের পূর্ব পাশে একটি ছোট ও ভবনের সম্মুখ ভাগের উত্তর-পশ্চিম অংশে নয়নাভিরাম একটি বড় বাগান আছে। নির্মাণ কাঠামো পাইল ফাউন্ডেশনের উপর ফ্রেম স্ট্রাকচার। স্থাপত্য নকশাটি তৈরি করেন ডেক্সটোরাস কনসালটেন্ট লিমিটেড, ঢাকার পক্ষে মাসুম কবির। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মীর আক্তর হোসেন লিমিটেড, ঢাকা।
১৯৯৫ সালের ১৩ নভেম্বর সরকারি অনুমোদনের প্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ভবনটির প্রথম পর্যায়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনু। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মেয়র মিনু কর্তৃক এর দ্বার উন্মোচন হয়ে মেয়রের একটি দপ্তর এবং বিভিন্ন সভা/ সেমিনারের কাজ সক্রিয় থাকলেও ভবনের আনুসঙ্গিক কাজ সম্পন্ন হয় ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। সোনাদিঘি মোড়ের পুরানা সিটি ভবন ও অন্যান্য ভাড়া ভবন থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয়ে এ ভবনে আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক কাজ শুরু হয় ২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি।
২৩ মে ২০১২ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যানেক্স ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ও ২য় পর্যায়ের উর্দ্ধমুখী সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয়। মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এর ভিত্তি প্রস্তরফলক উন্মোচন করেন। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবন কমপ্লেক্সের (২য় পর্যায়) নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। আনুষ্ঠিানিকভাবে উদ্বোধন না হলেও ২০১৫ সালের ৬ নভেম্বর বিকেলে ৬ তলায়  জিআইজেড নামের একটি প্রকল্পের অফিসিয়াল কার্যক্রম শুরু হয়। মেয়র(দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. নিযাম উল আযীম এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে অ্যানেক্স ভবনের ২য় তলায় উপ যাবাহন শাখার অফিস হেতমখাঁ থেকে স্থানান্তর হয়ে এসেছে। সিটি ভবন কমপ্লেক্স (২য় পর্যায়) অনুমোদিত প্রকল্প অনুযায়ী বর্তমান সিটি ভবন ১০ তলা পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ও ২তলা অ্যানেক্স ভবন নিমার্ণের জন্য ১৬ কোটি ৭১ লক্ষ টাকার প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। অ্যানেক্স ভবনকে ৪র্থ তলায় উন্নীতকরণ, সাধারণ সভার জন্য পৃথক কক্ষ নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২৩ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা হয়েছে। পরিষদের সকল কার্যক্রম এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অ্যানেক্স ভবনের ৩য় তলায় ৩৬৫২ বর্গফুটের সিটি হল নির্মাণ করা হয়েছে। এ সিটি হলে ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটির মেয়র মি. হ্যারাল্ড ফুরে (Mr. Harald Furre) ও ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহীসিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটির সদস্যদের সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন মেয়র (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. নিযাম উল আযীম।৬১৯

নগর ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ও এনেক্স ভবন নির্মাণ কাজ উদ্বোধনের ফলক (ছবি-জানুয়ারি ২০১৭)