ফিরে যেতে চান

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ক্রমবকিাশ

নগর ভবন (ছবি- জানুয়ারি ২০১৭)

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আদি নাম তৎকালীন শহরের নাম অনুযায়ী রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটি।৬১২ ইংরেজি  মিউনিসিপ্যালিটির বাংলা প্রতিশব্দ পৌরসভা। মিউনিসিপ্যাল শব্দটি এসেছে ল্যাটিন মিউনিসিপিয়াম থেকে। যার অর্থ পৌর, শহর বা নগর।৪৩ প্রাচীন রোমে স্থানীয় আইন দ্বারা শাসিত বা পরিচালিত কোন স্বাধীন শহরকে মিউনিসিপিয়াম বলা হতো। তবে জনগণের কল্যাণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আনুগত্য ছিল। মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌরসভা শহর এলাকার জন্য স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকার।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন দেশের একটি উল্লেখযোগ্য স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩য় পরিচ্ছেদে স্থানীয় শাসন নামে ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে এ ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন আয়তনে, কার্যক্রমে, সাংগঠনিক কাঠামোই যে অবস্থানে বিরাজ করছে; তা কোন একটি আইন বা নির্দিষ্ট কোন সময়ে প্রকাশ পায়নি। এর পশ্চাতে আছে দীর্ঘ সময়ের শ্রম, সরকার প্রণীত যুগোপযোগী আইন, স্থানীয় জন প্রতিনিধি ও সুবিধাভোগী স্থানীয় জনগণের প্রচেষ্টা। 
এর ঐতিহাসিক পটভূমি হলো ব্রিটিশ সরকার শাসনামলের পূর্বে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সহযোগিতায় ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম ১৬৮৮ সালে মাদ্রাজ পৌর কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭২৬ সালে কোম্পানীর দ্বিতীয় উদ্যোগে কোলকাতা ও বোম্বাই শহরের কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ সব আইনে প্রাধান্য পেয়েছিল বিচার বিভাগীয় সংস্থা। পৌর সংক্রান্ত দায়-দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিলনা। ১৭৯৩ সালের সনদ আইনে গভর্ণর জেনারেলকে  কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠনের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। ব্রিটিশ ‘বরোর’ অনুকরণে কর্পোরেশনগুলোর পরিচালকদের নাম দেয়া হয়েছিল ‘জাস্টিস অব পিস’। ১৮১৩ সালে ‘টাউন চৌকিদারী’ গঠনের উদ্দেশ্যে একটি আইন প্রণয়ন হয়। শহরের শান্তি-শৃংখলা রক্ষা ছিল এ আইন প্রণয়নের লক্ষ্য। যা ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। ১৮৪২ সালে পৌর প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত আরো একটি আইন প্রণীত হয়। এ আইনে বলা হয়েছিল, কোন শহরের অধিবাসী ইচ্ছা করলে পৌরসভা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ভারতে সর্বত্র পৌরসভা স্থাপনের উদ্দেশ্যে ১৮৫০ সালে একটি আইন পাশ হয়। উপরোক্ত দুটি আইনই ছিল অনুমতিসূচক; বাধ্যতামূলক নয়। স্থানীয় অধিবাসীদের আগ্রহের উপর এগুলোর কার্যকারিতা নির্ভরশীল ছিল। আইন দুটি জনগণকে তেমন প্রভাবিত করেনি। ১৮৫০ সালে কলিকাতা (কলকাতা) মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন ছাড়াও বেঙ্গল কাউন্সিলে একটি পৌরসভা আইন প্রণীত হয়েছিল। এ আইন বলেই বাংলাদেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ পৌরসভার যাত্রা শুরু। ১৮৬৪ সালে প্রণীত আইনে ৭ জন স্থায়ী বাসিন্দাকে পৌরসভার কমিশনার নিয়োগের ক্ষমতা পায় সরকার। তখন পৌরসভা গঠন হতো জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার, প্রকৌশলী ও ৭ জন কমিশনারের সমন্বয়ে। এ আইন অনুসারে শুধু বড় শহরগুলোই পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা ও প্রত্যেক পৌরসভাই একটি করে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। শহরের নিরাপত্তার জন্য কমিটি পাহারা দান ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের ব্যবস্থা করতো। ১৮৬৮ সালের ‘জেলা শহর’ আইন দ্বারা অপেক্ষাকৃত ছোট শহরে পৌর কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ কমিটি গঠিত হতো কমপক্ষে ৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে। মোট সদস্যের অনধিক এক তৃতীয়াংশ ছিল সরকারি কর্মচারী। অন্যান্য সদস্যকেও সরকার মনোনয়ন দিতো। সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে পৌর কমিটি চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করতে পারতো। ১৮৭২ সালে পৌরসভার দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত ও এক তৃতীয়াংশ সরকার মনোনয়ন দিতো। চেয়ারম্যান হতো জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। ভাইস চেয়ারম্যান হতো নির্বাচিত। ১৮৭৬ সালে সকল আইনের সমন্বয়ে আইন প্রণয়ন হয়। ১৮৭৮ সালে পৌরসভা আইনে পৌরসভাকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। ১৮৮২ সালে লর্ড রিপন প্রণীত রেগুলেশনে পৌরসভাকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গঠনের সুপারিশ করে। তাঁর উদ্যোগেই  ১৮৮৪ সালে বঙ্গীয় পৌরসভা আইন প্রণীত হয়। এ আইন অনুযায়ী ৯ হতে ৩০ সদস্য বিশিষ্ট পৌর কমিটি গঠিত হয়।৬১৬  দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য করদাতা কর্তৃক নির্বাচিত ও এক তৃতীয়াংশ সরকার মনোনয়ন দিতো। কতকগুলো পৌরসভার চেয়ারম্যান সরকার নিয়োগ দিতো ও অন্যগুলোর সদস্যরা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতো। যেগুলোর চেয়ারম্যান সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হতো। সেগুলোর একজন ভাইস চেয়ারম্যান নিয়োগের ব্যবস্থা থাকতো। এ আইনে একটি পৌরসভাকে কয়েকটি ওয়ার্ডে বিভক্ত করে প্রত্যেক ওয়ার্ডে কমিটি গঠনের ব্যবস্থা ছিল। ১৮৯৪ সালে এ আইনকে সংশোধন করে পৌরসভাগুলোকে অধিকতর ক্ষমতাশালী করা হয়।
এভাবে ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক সূত্রে বাংলাদেশে মিউনিসিপ্যালিটি ব্যবস্থাপনার সূচনা ও ক্রমবিকশিত হয়। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রাথমিক পর্যায়ের স্থাপন কাল ও সূচনার নাম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। W.W Hunter, BA, LLD A Statistical Account of Bengal, Vol. VIII, Districts of Rajshahi and Bogra, 1876 গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, The town has been constituted a municipality. In the year 1869, the total municipal receipts amounted to 1472 pound, and the disbursements to1094 pound 19 s. In 1871, the gross municipal income was 1418 pound 4 s., and the expenditure, 998 pound 16 s.; average rate of taxation, 10 annas 2 pie.115 
Bengal District Gazeetteers Rajshahi (Calcutta 1916) By L.S.S.O' Malley(Indian Civil Service)গ্রন্থে উল্লেখ আছে, Rampur Boalia was made a municipality in 1876 and is administrated by 21 Commissioners of whom fourteen are elected, five are nominated and two hold their seats ex-officio. The Chairman is elected.612রাজশাহীর ইতিহাস (১ম খণ্ড, প্রকাশ-১৯৬৫) গ্রন্থে কাজী মোহাম্মদ মিছের তথ্য দিয়েছেন, ‘ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষের গভর্ণর জেনারেল লর্ড লিটন (১৮৭৪-১৮৭৬) ও বাংলার গভর্ণর লেফটেন্যান্ট স্যার রিচার্ড টেম্পলের আমলে ১৮৭৬ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটী গঠিত হয়। ১৮৮৪ সালে বেঙ্গল মিউনিসিপ্যালিটী আইনের তিন ধারা অনুসারে এই মিউনিসিপ্যালিটীতে ২১জন কমিশনার নির্দ্ধারিত হয়। তন্মধ্যে ৭জন মনোনীত, ১৪জন নির্বাচিত কমিশনার।’ আবার তিনি উল্লেখ করেন, ‘১৮৬৯ সালে রামপুর বোয়ালিয়া টাউন কমিটির আয় ছিল ১৪৭২ পাউন্ড এবং ব্যয় হইয়াছিল ১০৯৪ পাউন্ড ১৯ শিলিং’। 
মুহম্মদ আব্দুস সামাদ (১৯১৩- ২০০৫) তাঁর সুর্বণ দিনের বিবর্ণ স্মৃতি (৫ নভেম্বর ১৯৮৭ ) গ্রন্থের পৌরসভার পৌরাণিক কাহিনী প্রবন্ধে ৬৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, ‘এই মিউনিসিপ্যালিটির আত্মপ্রকাশ টাউন কমিটি রূপে যা’ বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত বহাল ছিল।’ ৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, ‘১৮৭৪-৭৬ ভারতের গভর্ণর জেনারেল লর্ড লিটন ও বাংলার গভর্ণর  স্যার রিচার্ড টেম্পল। এঁদের শাসনামলে ১৮৭৬ সালে ১ এপ্রিল রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটি প্রথম গঠিত হয়। এরপরে ১৮৮৪ সালে বেঙ্গল মিউনিসিপ্যালিটি এ্যাক্টের তিন ধারা মতে ২১ জন কমিশনার সমন্বয়ে কমিটি গঠিত হয়। যার মধ্যে ১৪জন নির্বাচিত কমিশনার বাকি ৭ জন মনোনীত সদস্য হিসেবে কমিটি গঠিত হয়।’
সোনাদিঘির পুরাতন সিটি ভবন (বর্তমানে বিলুপ্ত ও নির্মাণাধীন রাজশাহী সিটি সেন্টার বাণিজ্যিক ভবন) চত্বরে স্থাপিত স্তম্ভের নিচের অংশে সংযুক্ত ৩টি ইংরেজি অক্ষরে ও ১টি বাংলা অক্ষরে প্রস্তর ফলক সংযুক্ত ছিল। ইংরেজি অক্ষরের ফলকে মিউনিসিপ্যালিটির সূচনাকাল ১৮৭৬ সালের এপ্রিল উল্লেখ আছে। প্রস্তর ফলক স্থাপনের নির্দিষ্ট তারিখ নাই। তবে ঐ সময়ের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানের নামসহ তাঁদের মেয়াদকাল ১৯৩৪-১৯৩৯ উল্লেখ আছে। চেয়ারম্যান রায় ডি.এন. দাস গুপ্ত বাহাদুর ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এম.এ. আলম। ফলকে আরো উল্লেখ আছে, রাজশাহী মহানগরীতে বিদ্যুতায়ন শুরু হয় ১৯৩৬ সালের জানুয়ারিতে এবং ওয়াটার ওয়ার্কস শুরু হয়েছিল ১৯৩৭ সালের আগস্টে। ফলকের তথ্যানুসারে সে সময় ওভারসিয়ার ছিলেন বি. কে. চক্রবর্ত্তী ও ঠিকাদার ছিলেন কে. সি. ব্যানার্জী। প্রস্তর ফলকে ওভারসিয়ার ও ঠিকাদারের নাম থাকার কারণে অনুমান করা হয় তাঁরাই ইংরেজি শিলালিপিটি তিনটির স্থপতি এবং শিলালিপি তিনটি স্থাপিত হয় ১৯৩৭ সালে আগস্টে ওয়াটার ওয়ার্কস শুরুকালে বা তার পরে।


সোনাদিঘির বিলুপ্ত পুরাতন সিটি ভবন চত্বরের স্তম্ভের বেদির চারপাশের শিলালিপি

বাংলা অক্ষরের শিলালিপিতে লিখা আছে ১৯৬৮ সালের রাজশাহী পৌরসভা। তার নিচে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ১৪ জন মেম্বারের নাম। চেয়ারম্যান মৌ.মো.আকবর হোসেন ও ভাইস চেয়ারম্যান মৌ.মো. আব্দুস শহীদ। রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটির একটি পুরনো অনারবোর্ড তথ্য দিচ্ছে মো.আকবর হোসেন ইপিসিএস সরকারি কর্মচারি। তিনি পদাধিকার বলে চেয়ারম্যান ছিলেন। সুতরাং সে সময় মিউনিপ্যিালিটির বাংলা নাম ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পূর্বেই শুরু হয়েছিল ও পরিষদে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান ব্যতীত অন্যদের পদবি ছিল মেম্বার। ১৪ জন মেম্বারের মধ্যে একজন মহিলাও ছিলেন। যার নাম মিসেস আর. এ. জাহানারা বেগম। তাঁর পূর্বে কোন মহিলা কমিশনার/মেম্বারের নাম পাওয়া যায় না।
বর্তমান গ্রেটার রোডস্থ নগর ভবন কমপ্লেক্স চত্বরে স্থাপিত শিলালিপিতে ইংরেজি অক্ষরে রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটির স্থাপন কাল ১৮৭৬ সাল ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে উন্নীতের সময় ১৯৮৭ সাল উল্লেখ আছে।

বর্তমান নগর ভবন চত্বরের শিলালিপি (ছবি-জানুয়ারি ২০১৭)

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ভাষা সৈনিক ড. এম. শমশের আলী ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন প্রকাশিত বরেন্দ্রের বাতিঘর অগ্রযাত্রার ৫ বছর গ্রন্থে ‘ভুবন মোহন পার্ক ইতিহাসের সাক্ষী’  প্রবন্ধে ২০১১ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন প্রকাশিত বরেন্দ্রের বাতিঘর অগ্রযাত্রার ৩ বছর গ্রন্থে আনারুল হক আনার প্রবন্ধ ‘রাজশাহী মহানগরীর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধে উল্লিখিত রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির স্থাপনকাল ১৮৬৯ সালকে অসঙ্গতিপূর্ণ উল্লেখ করে ১৮৭৬ সালের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন,“সিটি কর্পোরেশনের সহকারী জনসংযোগ কর্মকর্তা আনারুল হক আনার ভাষ্য অনুযায়ী সব পুরোন কাগজপত্র গত শতকের প্রথম দিকে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায়। যাহোক জনাব আনা বরেন্দ্রের বাতিঘর-এ তাঁর প্রবন্ধে উইলিয়াম হান্টারের স্ট্যাটিস্টিক্যাল এ্যাকাউন্টস অব বেঙ্গল-এর বরাত দিয়ে বলেছেন রামপুর-বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটি ‘টাউন কমিটি’ নামে ১৮৬৯ সালে স্থাপিত হয়। এখানেই তথ্য প্রয়োগে সামান্য অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়, যা আগেই উল্লেখ করেছি। হান্টার দু’টি আদমশুমারির কথা বলেছেনÑ১৮৬৯ সালের পরীক্ষামূলক এবং ১৮৭২ সালের সাধারণ। এই আদমশুমারি দুটিতে রামপুর-বোয়ালিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ টাউন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। হান্টার শুধু বলেছেন রামপুর-বোয়ালিয়াতে মিউনিসিপ্যালিটি স্থাপিত হয়েছে, তিনি কোন নির্দিষ্ট সাল উল্লেখ করেন নি। যদি আদমশুমারির বছরকেই ধরতে হয় তাহলে ১৮৭২ সালই যুক্তিযুক্ত হবে। ওম্যালির গেজেটিয়ারে উল্লেখ আছে রামপুর-বোয়ালিয়া টাউনকে ১৮৭৬ সালে মিউনিসিপ্যালিটি করা হয়। সম্ভবত ১৮৭২ সালের সাধারণ আদমশুমারির বিবেচনায় টাউনটিকে অস্থায়ী ভিত্তিতে মিউনিসিপ্যাল এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ১৮৭৬ সালে বাংলার গভর্ণর রিচার্ড টেম্পলের সময় তা স্থায়ী রূপ লাভ করে। আর অন্তর্বর্তীকালে একটি টাউন কমিটির ওপর এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমিটি ভুবন মোহন বাবুর বাগানে টিনশেডের দু’টি কক্ষে কার্যক্রম শুরু করে যা কাজী মিছের এবং আনার গ্রন্থে উল্লেখ আছে। হান্টার অবশ্য টাউন কমিটির কথা বলেননি।” 
প্রকৃতপক্ষে অধ্যাপক ড. এম. শমশের আলী উইলিয়াম হান্টারের অ ঝঃধঃরংঃরপধষ অপপড়ঁহঃ ড়ভ ইবহমধষ, ঠড়ষ. ঠওওও গ্রন্থটিতে প্রদত্ত তথ্য যথাযথভাবে লক্ষ্য করেননি। গ্রন্থটির ৫৪ পৃষ্ঠায় ১৮৭২ সালের আদমশুমারী রিপোর্ট ও  রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির ১৮৬৯ ও ১৮৭১ সালের আয়-ব্যয়ের উল্লেখ আছে একই অনুচ্ছেদে। আদমশুমারী তথ্য শেষে পরের লাইনেই উপস্থাপন করা হয়েছে রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির ১৮৬৯ ও ১৮৭১ সালের আয়-ব্যয়ের হিসেব। ১৮৭২ সালের আদমশুমারী সম্পর্কে বলা হয়েছে, The General Census of 1872:- Muhammadans,- males, 5905; females, 5666; total, 11,569. Hinduss,- males, 6047; females, 4524; total, 10,571. Buddhists,- males, 5; females, 5; total, 10. Christians,- males, 44; females, 39; total, 83. Others,- males, 28; females, 30; total, 58. Population of all denominations,- males, 12,027; females, 10,264; grand total, 22,291. রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির ১৮৬৯ ও ১৮৭১ সালের আয়-ব্যয়ের তথ্য পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে । তবে হান্টার মিউনিসিপ্যালিটির নাম টাউন কমিটি বলেননি। টাউন কমিটি শব্দটি কাজী মোহাম্মদ মিছেরের রাজশাহীর ইতিহাসে উল্লেখ আছে। বিভিন্ন সূত্রের অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য থেকে লেখক আনা ১৮৬৯ সালে টাউন কমিটি নামে মিউনিসিপ্যালিটির সূচনা, যা ১৮৭৬ সালে মিউনিসিপ্যালিটি নামকরণ হয়েছে বলে নিজস্ব মত প্রকাশ করেন।
ও’ম্যালি প্রদত্ত তথ্যই রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটি স্থাপনের তারিখ সম্পর্কে বিভ্রান্তির মূল কারণ হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে ১৮৬৮ সালের ‘জেলা শহর’ আইন দ্বারা তৎকালীন শহরের নাম অনুযায়ী রামপুর বোয়ালিয়া, নাটোর, রংপুর শহরে মিউনিসিপ্যালিটি স্থাপন করা হয়েছিল।  অন্যান্য শহরেও হতে পারে। নাটোর পৌরসভা স্থাপনের বিষয়ে W.W Hunter, BA, LLD A Statistical Account of Bengal, Vol. VIII গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,  Nattor also has been constituted a municipality.115হান্টারের তথ্য অনুসারে নাটোর পৌরসভার পূর্বে বা সমসাময়িক কালে রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটি স্থাপিত হয়। হয়তো ১৮৬৯ সালে রামপুর বোয়ালিয়া টাউন কমিটি নামে মিউনিসিপ্যালিটির সূত্রপাত হয়েছিল। ১৮৭৬ সালে এসে রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটি নাম ধারণ করে। কাজী মোহাম্মদ মিছের, মুহম্মদ আব্দুস সামাদ এর লেখনিতে টাউন কমিটি শব্দ দুটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কোন কোন গ্রন্থে দেখা যায়, টাউন কমিটি বা  মিউনিসিপ্যালিটির আফিস হিসেবে বর্তমান ভুবন মোহন পার্কের ভিতরে দুটি টিনের চালা ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে এ তথ্যেও কোন সূত্র পাওয়া যায় না। 
শুরুতে মিউনিসিপ্যালিটি কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৭জন। তাঁরা সবাই সরকার কর্তৃক মনোনীত হয়েছিলেন। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, সাব ডিভিশনাল অফিসার (মহকুমা প্রশাসক) ও মেডিক্যাল অফিসার ছিলেন পদাধিকার বলে সদস্য।৪৩ মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম চেয়ারম্যান কে হয়েছিলেন তাঁর নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না। তবে ১৮৭৭ সালে কলকাতার ‘দি বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট’ থেকে প্রকাশিত THE MUNICIPAL BYE-LAWS FOR THE TOWN OF RAMPORE BAULEAH UNDER THE PROVISIONS OF ACT V(B.C) OF 1876  এ চেয়ারম্যানের নাম  W.H. D'OYLY উল্লেখ আছে। কাজী মোহাম্মদ মিছের তাঁর গ্রন্থে বাবু হরগোবিন্দ সেনকে প্রথম বেসরকারি চেয়ারম্যান উল্লেখ করেছেন। মুহাম্মদ লুৎফুল হকের প্রবন্ধে পাওয়া যায়, ১৮৮৪ সালে প্রথম বারের মত রাজশাহী পৌরসভার কমিশনার নির্বাচন হয়। এ সময় রাজশাহী পৌরসভা ৭টি ওয়ার্ডে বিভক্ত ছিলো। প্রতিটি ওয়ার্ডে এক থেকে তিন জন কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। কমিশনারগণ তিন বছরের জন্য নির্বাচিত বা মনোনীত হন।৬১৭
১ অক্টোবর ১৮৮৭ তারিখের হিন্দু রঞ্জিকা থেকে জানা যায়, ৬ ডিসেম্বর ১৮৮৭ তারিখ দ্বিতীয় দফায় কমিশনার নির্বাচন হয়। এ পত্রিকাটিতে রাজশাহী পৌরসভার ৭টি ওয়ার্ডে ১৪ জন  কমিশনার  পদে নির্বাচন হবার কথা বলা হয়।                                                        
এ নির্বাচনে শেখ বেঙ্গা ও জঙ্গলা নামের দুজন কসাই ৫ নং ওয়ার্ডের কমিশনার প্রার্থী হয়েছিলেন। এর মধ্যে জঙ্গলা কসাই এর পদপ্রার্থীতা বাতিল হয়ে যায় এবং শেখ বেঙ্গা নির্বাচিত হন। শেখ বেঙ্গার প্রার্থীতা নিয়ে হিন্দু সমাজের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তিনি অশিক্ষিত,নিম্নবিত্ত ও হিন্দু সমাজের কাছে অস্পৃশ্য ছিলেন। নির্বাচিত হলে কসাইয়ের সঙ্গে বসতে হবে এ ভেবে অনেকে এ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ থেকে বিরত হন। এ পরিস্থিতিতে হিন্দু রঞ্জিকা পত্রিকা ৫নং ওয়ার্ডের ভোটারদের শেখ বেঙ্গাকে নির্বাচিত না করার অনুরোধ জানান। তারপরও তিনি প্রার্থী হন ও বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এ নির্বাচন বলে দেয় সে সময় বর্ণবাদী চেতনা কতটা প্রকট ছিল। যা হোক সব আশংকা দূর করে নির্বাচিত ১৪ জন কমিশনার এবং সরকার মনোনীত ৭জন কমিশনার ২৬ জানুয়ারি ১৮৮৮ তারিখ বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যাল  অফিস ঘরে একত্রে বসেন এবং তাঁদের মধ্য থেকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ডা. কেদারেশ্বর আচার্য্য (৩নং ওয়ার্ড) এবং ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ওভারসিয়ার ভগবতীচরণ গাঙ্গুলী (৬ নং ওয়ার্ড)। এরপর অশিক্ষিত ও নিম্নবিত্ত কসাই কমিশনার বিষয়ে হিন্দু রঞ্জিকা পত্রিকায় কোন সংবাদ দেখা  যায়নি এবং কমিশনারগণ সফলতার সাথে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন।  ৫নং ওয়ার্ডের এলাকা আনুমানিক পূর্বে কলেজিয়েট স্কুল থেকে পশ্চিমে জেলখানা পর্যন্ত এবং দক্ষিণে পদ্মা নদী  থেকে উত্তরে সিপাইপাড়া-হোসেনীগঞ্জ হয়ে সোনাদিঘির উত্তর পূর্ব কোণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। এ এলাকার বেশীরভাগ বাসিন্দা মুসলমান ছিলেন।৬১৭ 
L.S.S.O' Malley (Indian Civil Service) ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে উল্লেখ করেছেন, রামপুর বোয়ালিয়া  মিউনিসিপ্যালিটির ২১ জন কমিশনার নির্ধারিত হয়। ২১ জন কমিশনারের মধ্যে ১৪জন হতেন নির্বাচিত প্রতিনিধি, ৫জন মনোনীত ও ২জন হতেন পদাধিকার বলে।৬১২ চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান কমিশনারবৃন্দের ভোটে নির্বাচিত হতেন। আর কমিশনারবৃন্দ কর দাতাদের ভোটে নির্বাচিত হতেন।৪৩ ১৯১৬ সালে প্রকাশিত ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে করদাতাদের সংখ্যা ৪৫৮১জন উল্লেখ আছে। যা মোট শহরবাসীর বিশ শতাংশ। ১৩ অক্টোবর ১৯৫৮ তারিখে রাজশাহী পৌরসভার যাবতীয় দায়িত্বভার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের উপর আসে। একজন প্রশাসক জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতিনিধি হিসেবে পৌরসভা পরিচালনা করতেন।১ ১৯৬৯ সালের ২৭ অক্টোবর মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ বলে জেলার স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন সংস্থাগুলোতেও পরির্বতন আসে। ১৯৬০ সালের ১১ এপ্রিল পৌরসভা প্রশাসন অর্ডিন্যান্সের ভিত্তিতে পৌরসভাগুলোও পুনর্গঠন করা হয়।২ এ অর্ডিন্যান্সের পর মিউনিসিপ্যালিটির বদলে মিউনিসিপ্যাল কমিটি ও ওয়ার্ডের বদলে ইউনিয়ন কমিটি নামকরণ করা হয়। মিউনিসিপ্যাল কমিটিকে ৮টি ইউনিয়ন কমিটিতে বিভক্ত করা হয় এবং প্রত্যেকটি ইউনিয়ন কমিটি থেকে একজন করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন। এছাড়া সরকার মনোনীত আরো ৭ জন সদস্য নিয়ে মিউনিসিপ্যাল কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি (সরকারি কর্মকর্তা) মিউনিসিপ্যাল কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হতেন। মিউনিসিপ্যাল কমিটির চেয়ারম্যান ও ১৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত ১৬ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচক মণ্ডলী  ইউনিয়ন কমিটির একজন চেয়ারম্যানকে মিউনিসিপ্যাল কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করতেন।১ ১৯৯১ সালের জেলা গেজেটিয়ারের তথ্যানুসারে, ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ স্থানীয় পরিষদ ও পৌর কমিটি আদেশ বলে রাজশাহী পৌর কমিটির বদলে রাজশাহী পৌরসভা গঠিত হয়। এর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার একটি কমিটি নিয়োগ করবেন বলে আইনে উল্লেখ ছিল। কমিটি গঠনের পূর্ব পর্যন্ত সরকার নিয়মিত একজন প্রশাসক পৌরসভার ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করেন।২ তবে বিলুপ্ত পুরনো নগরভবনের একটি শিলালিপিতে লিখাছিল ১৯৬৮ সালের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের তালিকা। যার শিরোনাম ছিল রাজশাহী পৌরসভা ১৯৬৮। এ শিলালিপি অনুসারে বলা যায় রাজশাহী পৌরসভা শব্দের ব্যবহার পাকিস্তান আমলেই শুরু হয়েছে। উল্লিখিত গেজেটীয়ারে তথ্য বিভ্রাট হতে পারে। বা ১৯৭২ সালের আদেশের পর শিলালিপিটি স্থাপন হতে পারে। সে সময় নির্বাচন না হওয়ার কারণে পূর্ব পরিষদের তালিকা স্থাপন হতে পারে। স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান পৌরসভার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ব পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাগণই প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। 
রাজশাহী পৌরসভাকে রাজশাহী পৌর কর্পোরেশনে উন্নীতকরণের জন্য ১৯৮৭ সালে ৩৮ নং আইনে ‘রাজশাহী পৌর কর্পোরেশন আইন -১৯৮৭’ প্রণয়ন করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১ আগস্ট সরকার এ আইনের গেজেট প্রকাশ করে।২৫৪ ১৯৮৭ সালের ১৩ আগস্ট অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদী তৎকালীন পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমানের নিকট থেকে পৌর কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তখন থেকেই পৌর কর্পোরেশনের যাত্রা শুরু হয়। হাদী ১৯৮৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রশাসক থেকে মেয়র হিসাবে শপথ বাক্য পাঠ করেন। কর্পোরেশনের প্রশাসক মনোনয়নের পর একজন ডেপুটি প্রশাসকও মনোনীত হয়েছিলেন। জনাব হাদীর নিকট থেকে জানা যায়, তিনি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর পূর্বের নির্বাচিত কমিশনারগণকে বাতিল করে সরকার নতুনভাবে কমিশনার মনোনয়ন দিয়েছিলেন। মনোনীত কমিশনারদের মধ্যে পূর্বের নির্বাচিত কমিশনার ও অন্যান্য ব্যক্তিরাও ছিলেন। ১৯৮৭ সালের ৩৮ নং আইনে প্রাপ্ত ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত কমিশনার , মহিলা কমিশনার ও সরকারের ৫ জন কমকর্তা কমিশনারের সমন্বয়ে পৌর কর্পোরেশন গঠনের কথা বলা হয়। তবে পদাধিকার বলে মেয়র কমিশনারও ছিলেন। নগরীতে বসবাসকারী মহিলাদের মধ্য হতে মহিলা কমিশনার সরকার কর্তৃক মনোনীত হতেন। মনোনীত মেয়র ও কর্পোরেশনের মেয়াদ ছিল ৩ বছর। আইনানুযায়ী নির্বাচিত কমিশনারদের মধ্য হতে তাদের ভোটের ভিত্তিতেই দুজন ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ আইন অনুযায়ী ১৯৮৮ সালে পৌর কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্বাচনের পূর্বে নগরীকে ৩০ টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়েছিল এবং প্রত্যেক ওয়ার্ড থেকে একজন করে কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। মেয়র ছিলেন সরকার মনোনীত। 

১৯৮৭ সালের ১৩ আগস্ট অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদী (মাঝে বসে) তৎকালীন পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমানের (ডানে বসে) নিকট থেকে পৌর কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করছেন

১৯৯০ সনের ৫৬ নং আইনে The Local Government Laws (Amendment) প্রণয়ন করে ১৯৮৭ সনের ৩৮ নং আইনের সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইন অনুযায়ী “পৌর” বা “মিউনিসিপ্যাল” শব্দের পরিবর্তে “সিটি ” শব্দ প্রতিস্থাপন করা হয়। ফলে রাজশাহী পৌর কর্পোরেশন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নাম ধারণ করে। ১৯৯০ সালের ৩১ জুলাই সরকার এ সংশোধিত আইনের গেজেট প্রকাশ  করে।২৪৫ ১৯৯৩ সনের ৯ নং আইনে ‘রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন আইন ১৯৯৩’ প্রণয়ন করে ১৯৮৭ সনের ৩৮ নং আইনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইন অনুযায়ী কর্পোরেশনের মেয়াদ ৫ বছর করা হয়। তবে  পুনর্গঠিত কর্পোরেশনের প্রথম সভা না হওয়া পর্যন্ত মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে যাবার কথা উল্লেখ করা হয়। ডেপুটি মেয়রের পদ বিলুপ্তি করা হয়। এ আইনে একজন মেয়র ও সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সংখ্যক কমিশনারের সমন্বয়ে কর্পোরেশন গঠনের কথা বলা হয়। মেয়র ও কমিশনারবৃন্দ প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটার কর্তৃক নির্বাচিত হবেন। মহিলা কমিশনারদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা হয়। তাঁরা নির্বাচিত মেয়র ও কমিশনারদের ভোটে নির্বাচিত হবেন। এ আইন অনুযায়ী ১৯৯৪ সালের ৩০ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রথম নির্বাচিত মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনু ১৯৯৪ সালের ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর নিকট শপথ বাক্য পাঠ করেন ও ১১ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৩০টি ওয়ার্ড থেকে ৩০ জন কমিশনার নির্বাচিত হন। ৩০টি ওয়ার্ডকে ৬ টি জোনে বিভক্ত করে মহিলা কমিশনারদের জন্য সংরক্ষিত আসন নির্ধারণ করা হয় এবং তাঁরা মেয়র ও কমিশনারবৃন্দের ভোটে নির্বাচিত হন। ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল কর্পোরেশনের পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের পূর্বে মহিলাদের জন্য ১০টি আসন সংরক্ষণ করা হয়। ১জন মেয়র ও ৩০ জন সাধারণ কমিশনারের সঙ্গে সংরক্ষিত আসনের কমিশনারবৃন্দও প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। মো. মিজানুর রহমান মিনু পুনরায় মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ নির্বাচনের প্রথম বারের মত ২৮ নং ওয়ার্ড হতে মনোয়ারা বেগম  নামে একজন মহিলা সাধারণ আসনে কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে ১১ জুন মেয়র মো. মিজানুর রহমান মিনু একটি মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে ৯নং ওয়ার্ডের কমিশনার মো. রেজাউন নবী দুদুকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র নিয়োগ করেন। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের সকল সিটি কর্পোরেশনকে এক আইনের অন্তর্ভুক্তকরণের জন্য অধ্যাদেশ- ১৬, ২০০৮ জারি করে। এ অধ্যাদেশ ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) অধ্যাদেশ ২০০৮’ নামে অভিহিত। অধ্যাদেশটি ২০০৮ সালের ১৪ মে বুধবার সরকার গেজেট আকারে প্রকাশ করে। প্রকাশের সঙ্গে দেশে বিদ্যমান ঢাকা, চট্রগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ,বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন এ অধ্যাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর পূর্বে প্রতিটি সিটি কর্পোরেশনের জন্যই পৃথক পৃথক আইন ছিল। এ অধ্যাদেশে কমিশনার এর  পরিবর্তে কাউন্সিলর শব্দটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কর্পোরেশনের মেয়াদ ৫ বছর রেখেই নির্বাচিত মেয়র , প্রত্যেক ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত কাউন্সিলর ও মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে কর্পোরেশন গঠনের কথা বলা হয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে কর্পোরেশন এলাকা থেকে একজন মেয়র, প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড হতে মহিলা কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন। এ অধ্যাদেশে মেয়রের প্যানেল ব্যবস্থা রাখা হয়। বলা হয়, কর্পোরেশন গঠন হবার পর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হবার এক মাসের মধ্যে কাউন্সিলরগণ নিজেদের মধ্যে থেকে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি মেয়রের প্যানেল নির্বাচিত করবেন। মেয়রের অনুপস্থিতিতে বা কোন কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে প্যানেলের ক্রমানুসারে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্যানেলের সদস্য দায়িত্ব পালন করবে। প্যানেলের ৩ সদস্যের একজন সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর থাকাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। এ আইনে মেয়রের সঙ্গে কাউন্সিলরদেরও মাসিক সম্মানী ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়। নাগরিক সনদের মাধ্যমে নাগরিক সেবা প্রদানের বিবরণ সেবা প্রদানের শর্তসমূহ এবং সেবা প্রদানের নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিতকরণের বিবরণ প্রকাশের কথা উল্লেখ করা হয়। এ আইনে ভোটাধিকার ছাড়াই কর্পোরেশনের আমন্ত্রণে সরকারের ১৩টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কর্পোরেশনের সভায় যোগদান করার কথা বলা হয়েছে। তাঁরা সভায় উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখতে পারবেন। তবে ভোট প্রদান করতে পারবেন না। ২০০৯ সালের আইনে এ সংখ্যাকে ১৬ জনে উন্নীত করা হয়। তাঁরা হলেন- ক.বিভাগীয় কমিশনার, খ.মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, গ.জেলা প্রশাসক, ঘ.মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানী লিমিটেড, ঙ.তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত অধিদপ্তর, চ.তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ছ.তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, জ. তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, ঝ. তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঞ.পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ট. চেয়ারম্যান, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঠ.নির্বাহী প্রকৌশলী, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, ড.প্রতিনিধি, ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স, ঢ.প্রতিনিধি, বিআরটিএ, ণ.প্রতিনিধি, বাংলাদেশ রেলওয়ে, ত.প্রতিনিধি, র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।
২০০৮ সালের ৪ আগষ্ট নির্বাচনে ১জন মেয়র, ৩০জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ১০জন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। ৩টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে একটি সংরক্ষিত আসন নির্ধারণ করা হয়। নির্বাচিত মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন প্রধান উপদেষ্টা ড. ফকরুদ্দীন আহমদ ও কাউন্সিলরবৃন্দ উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবালের নিকট ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর শপথ বাক্য পাঠ করেন। ২০০৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জনাব লিটন ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. রেজাউন নবী দুদুর নিকট থেকে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০০৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ সভার মাধ্যমে এ পরিষদের মেয়াদ ভিত্তিক কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৩ সালের ১৫ জুন নির্বাচনে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মেয়র, ৩০ জন কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনে ১০ জন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর (মহিলা) নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের ১৫ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর প্যানেল মেয়র সরিফুল ইসলাম বাবু  ২ জুলাই ২০১৩ হতে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত  রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের ২১ জুলাই মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কাউন্সিলরগণ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নিকট শপথ গ্রহণ করেন। মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ২০১৩ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র সরিফুল ইসলাম বাবুর নিকট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ নির্বাচিত পরিষদের প্রথম সাধারণ সভার আয়োজন হয় ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর। বুলবুল মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে মামলার  আসামী হওয়ার কারণে সরকার ৭ মে ২০১৫ তারিখে তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ এর ধারা ১০৫ এ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে সরকার ৩১ মে ২০১৫ তারিখে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ২১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. নিযাম উল আযীমকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সকল প্রকার আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা অর্পণ করে। ২০১৫ সালের ২ জুন থেকে ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি সরকার প্রদত্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। বুলবুল আদালতের রায়ের ভিত্তিতে ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণের কিছুক্ষণ পর আবারো মন্ত্রণালয়ের আদেশে ২য় বার সাময়িক বরখাস্ত হন এবং পরবর্তী রায়ে ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন।