ফিরে যেতে চান

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও বিদ্যুৎ সরবরাহ

আজ থেকে প্রায় ১৩৫ বছর পূর্বে বাংলাদেশে ভাওয়ালের রাজা সর্ব প্রথম বিলেত থেকে জেনারেটর আমদানির মাধ্যমে তাঁর রাজবাড়ি বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিতে আলোকিত করেছিলেন। এরপর ১৯০১ সালে নবাব আহসান উল্লাহ্র অর্থায়নে অক্টাভিয়াস স্টিল নামের একটি কোম্পানি ঢাকা শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আহসান মঞ্জিলসহ পর্যায়ক্রমে আরো কয়েকটি অভিজাত ভবনকে আলোকিত করে। ১৯০৯ সালে ডেভকো নামের ব্রিটিশ কোম্পানির মাধ্যমে ঢাকায় সীমিত আকারে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ শুরু হয়েছিল। ঐ কোম্পানি ১৯৩৩ সালে ঢাকা শহরের ধানমণ্ডিতে ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ধানমণ্ডি পাওয়ার হাউজ নির্মাণের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ আরম্ভ করে।৬৭২ এর তিন বছর পর রাজশাহী শহরে ১৯৩৬ সালে বিদ্যুৎ বণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। অবশ্য তার পূর্বে রাজশাহী কলেজে স্বল্প পরিসরে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। ১৯১৫ সালে কলেজ চত্বরের পূর্বপাশে ৫৭ হাজার ১৪৫ টাকা ব্যয়ে একটি লাল রঙের দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এ ভবনে স্থাপন করা হয়েছিল ফিজিক্স ল্যাবরেটরী। তার সঙ্গে ছিল একটি ওয়ার্কশপ। ওয়ার্কশপে স্থাপন করা হয়েছিল দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন মেশিন। এ মেশিন থেকে আলো, পাখা, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা ইত্যাদিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। ১৯৩৬ সালে রাজশাহী শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার পর ল্যাবরেটরির বিদ্যুৎ উৎপাদন মেশিনের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়।৬৬০ 

বিদ্যুৎ ভবন, হেতমখাঁ (ছবি ২০১১)

১৯৩৬ সালে রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটির আহবানে চট্টগ্রাম থেকে চিটাগাং ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি রাজশাহী শহরে এসে হেতমখাঁ মহল্লায় পাওয়ার হাউজ নির্মাণ করে। পাওয়ার হাউজ নির্মাণের জায়গাটি ছিল খান বাহাদুর এমাদউদ্দিনের। পাওয়ার হাউজটিতে ডিজেল চালিত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ডিসিতে (ডাইরেক্ট কানেকশন) রূপান্তর করে প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত এলাকায় সরবরাহ হতো। এলাকাগুলো ছিল হেতমখাঁ, মিউনিসিপ্যালিটি কার্যালয়, কলাবাগান, ঘোষপাড়া, ফায়ার ব্রিগেড, সাহেব বাজার। প্রাথমিক অবস্থায় ৬৩ জন বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় এসেছিল। তাঁদের কয়েক জন হলেন হেতমখাঁর খান বাহাদুর এমাদউদ্দিন, অ্যাডভোকেট মহসীন খানের পিতা খান সাহেব আব্দুর রহমান খান, ডা. জহির উদ্দিন আহম্মদ, ওসমান সরকার, নগেন বাবু উকিল, ঘোষপাড়ার মো. হায়দার আলী (ক্যাপ্টেন শামসুল হকের শ্বশুর), কলাবাগানের আফসার পীর সাহেব, সাহেব বাজারের আব্দুল করিম বক্স প্রমুখ। হেতমখাঁয় বর্তমান বিদ্যুৎ ভবনের পশ্চিম পাশ সংলগ্ন অ্যাডভোকেট মহসীন খানের বাড়িতে সে সময়ের হাউজ ওয়ারিং এখনও সক্রিয় আছে।
সে সময় ১৫ টাকা জমা দিয়ে একজন গ্রাহক বিদ্যুৎ কোম্পানির নিকট থেকে মিটার, সার্ভিস তারসহ হাউজওয়ারিংয়ের সুবিধা পেত। একজন গ্রাহকের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ বিল আসতো তিন থেকে চার টাকা। প্রাথমিক অবস্থায় জনবল ছিল একজন প্রকৌশলীসহ মোট ২৫ জন। বিদ্যুৎকর্মীরা বেতন, নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসবে বোনাস পেত। এছাড়াও ছিল বছরে একটি ইনসেনটিভ বোনাস।৬৭২
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, রাজশাহীর কর্মচারি শহীদুল ইসলাম ‘রাজশাহীতে বিদ্যুৎ বর্তমান প্রেক্ষিত’ প্রবন্ধে তথ্য প্রদান করেছেন, ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত হেতমখাঁতেই চিটাগাং ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির কার্যক্রম বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (ওয়াপদা) এর অধীনে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চলে গেলে হেতখাঁ থেকে পাওয়ার হাউজ কাটাখালিতে স্থানান্তর হয়। সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো ৫ মেগাওয়াট। উৎপাদিত বিদ্যুৎ হেতমখাঁ বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা হতো। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের ৫৯ নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে পৃথক করে ১৯৭২ সালের ১ মে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সৃষ্টি হয়।৬৭২  
তবে বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর রাজশাহী-১৯৯১ এর তথ্যানুসারে, ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ ১টি প্রাইভেট কোম্পানি কর্তৃক সম্পাদিত হতো। ১৯৫৫ সালে তৎকালীন বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিদপ্তর ও ১৯৬০ সালে তৎকালীন ওয়াপদা বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব গ্রহণ করে।২ একই সালে বর্তমান পানি উন্নয়ন বোর্ডও ওয়াপদার অন্তর্ভুক্ত হয়।২ ১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে ওয়াপদার নর্থ সার্কেলের জন্য ১জন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর অফিস স্থাপন করা হয়। ১৯৭২ সালে ওয়াপদা বিভক্ত হয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড গঠিন হয়।২ ১৯৭৫ সালে রাজশাহী মহানগরীর হেতমখাঁয়ে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর স্থাপিত হয়।  
বর্তমানে রাজশাহী মহানগরীর হেতমখাঁয় অবস্থিত বিদ্যুৎ ভবন থেকে রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ আটটি জেলার বিদ্যুৎ কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে। বিভাগীয় অফিসের প্রধান হলেন প্রধান প্রকৌশলী। তার অধীনে রাজশাহী-১, রাজশাহী-২, বগুড়া ও পাবনা পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল আছে। প্রতিটি সার্কেলের প্রধান হলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। চারটি সার্কেলের অধীনে ২৫ টি বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে ৮টি জেলার ৬ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সেবা প্রদান করা হয়। এছাড়া ৮টি জেলার ১০টি শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য দশ শহর বিদ্যুৎ বিতরণ প্রকল্প ও আরবান প্রকল্প নামে দুটি প্রকল্প কাজ করে। প্রকল্প দুটির কার্যক্রম ২০১৫ সালের জুনে শেষ হয়।
রাজশাহী বিভাগ কৃষি প্রধান অঞ্চল। বৃহৎ শিল্প কারখানা নেই। ফলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের সংখ্যা বেশি। বোরো সৌসুমে সেচের জন্য বিদ্যুৎ চাহিদা বেশি থাকে। পিক সময়ে এ জোনে ৮০০ মেগাওয়াট ও অন্যান্য সময়ে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। শুধু মাত্র রাজশাহী মহানগরীতে গ্রহক সংখ্যা ১ লাখ ৩৩ হাজার। তাঁদের ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগে। সেচ মৌসুমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদার কারণে মহানগরীতে লোডশেডিং দেখা যায়।৩০৯