ফিরে যেতে চান

হাজার বছরের প্রাচীন জনপদ রাজশাহী মহানগরী

 

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকার মানচিত্র

প্রাচীন বরেন্দ্রভূমির তুলনায় রাজশাহী মহানগরীর মাটির বয়স খুব অল্প। জলামগ্ন এ অঞ্চলে ক্রমশ পলির ভরাট পড়ে চর হয়। তাতে গজিয়েছে বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদ। নিবিড় জঙ্গল না হয়ে কোথাও কোথাও ফাঁকাও ছিল। এসব ফাঁকা জমিগুলো উর্বর ছিল বলে সহজে ফসল ফলানো যেত। পদ্মা ও তার শাখা নদীগুলোর মাছ ছিল জীবিকার সহজ উপকরণ। ভিন্ন পল্লীর মানুষ জীবিকার সন্ধানে এসে প্রাচীন পল্লীর সূচনা করে। তবে কত দিন তার কোন তথ্য নেই। জানাকে নির্ভুল করার জন্য নৃতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন। রাজশাহী মহানগরীকে নিয়ে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। ১৯৬৪ সালে অধ্যাপক আবু তালিব দরগাপাড়া নিবাসী ফায়ার ব্রিগেডের কর্মচারী খোন্দকার আখতার আলির কাছে থেকে লেখকের নামবিহীন ‘শাহ্ মখদুম জীবনী তোয়ারিখ’ নামে হাতে লিখা একটা পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। পাণ্ডুলিপিতে উল্লিখিত রচনাকাল ১২৪৫ বঙ্গাব্দ/১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দ। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪১৬/২৫ শ্রাবণ ১৪০২/৯ আগস্ট ১৯৯৫ তারিখে হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) দরগাহ পাবলিক ওয়াকফ এস্টেট প্রকাশিত ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ নামের গ্রন্থে পাণ্ডুলিপিটি পাঠকদের জন্য উন্মোচিত হয়েছে। পাণ্ডুলিপির বিবরণ অনুযায়ী বর্তমান দরগা শরিফের স্থানে ছিল ৩০/৪০ বিঘা আয়তন বিশিষ্ট দেওআলয়। সেখানে ছিল বিশাল আকৃতির মন্দির। যার নাম ছিল মহাকাল দেও। দেও এর নামানুসারেই বর্তমান রাজশাহী কলেজের খেলার মাঠটি ছিল মহাকালদিঘি। দেওআলয়ের সেবায় ছিল অংশুদেও চান্দভণ্ডি বর্ম্মাভোজ ও অংশুদেও খেজ্জুর চান্দ খড়গ বর্ম্মা গুজ্জভোজ নামের দুই ভাই। দেও এর নামানুসারেই অঞ্চলের নাম ছিল মহাকালগড়। উপরোক্ত দুই ভাই ছিলেন মূলত মহাকালগড়ের রাজা। তারা প্রতি বছর দেও এর উদ্দেশ্যে মানুষ বলি দিত। হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) দরগাহ পাবলিক ওয়াকফ এস্টেট প্রকাশিত ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ নামের গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) বাঘায় আসেন এবং সেখান থেকে মহাকালগড়ে আগমন করে দেওরাজদ্বয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। দেওরাজদ্বয়ের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বলি প্রথার অবসান ঘটে। মঠ-মন্দিরও ভেঙে ফেলা হয়।৮ পাণ্ডুলিপির তথ্যানুসারে বিজয়ের নিদর্শন স্বরূপ বাঘা বা মখদুম নগরে বিশাল গেট নির্মাণ করে এর প্রস্তর ফলকে এ সব ঘটনার বৃত্তান্ত লেখা হয়। এ প্রস্তর ফলকে লিখা ছিল ৭২৬ হিজরী। তাঁর নোয়াখালিতে আগমন ঘটে ৬৮৫ হিজরি মোতাবেক ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দ, রাজশাহী জেলার বাঘায় (মখদুম নগর) আগমন ৬৮ হিজরি মোতাবেক ১২৮৯ খ্রিস্টাব্দ ও মহাকাল গড় বিজয় কাল ৭২৬ হিজরি অনুযায়ী ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দ।৭৪৩

পাণ্ডুলিপির তথ্য সঠিক হলে রাজশাহী মহানগরীতে মানব জনপদের সূচনা হয় এক হাজার বছরেরও পূর্বে। তখন এখানে যারা বসতি গড়েছিল তারা হয়ত মাছ শিকার ও পরে জমি চাষ শুরু করে। তারা জ্ঞানে ও অর্থে ছিল দুর্বল। কোন তান্ত্রিক নদীপথে আগমন করে এসব মানুষের উপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় এবং তন্ত্রমন্ত্র দেখিয়ে বশীভূত করে ফেলে। উক্ত গ্রন্থে হযরত শাহ্ মখদুম (রহ.) এর বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি বাগদাদ থেকে আগমন করেছিলেন। তাঁর বাঘা আগমনের ১০ বছর পূর্বে তুরকান শাহ (রহ.) এর আগমন সেখান থেকে। মহাকালগড়ের তান্ত্রিকবাদের সংবাদ দিল্লীতে পৌঁছানোর পূর্বে গৌড় সুলতানের কাছে পৌঁছানোর কথা। এ বর্বর প্রথা বন্ধের জন্য গৌড় সুলতান কর্তৃক কোন ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য পাওয়া যায় না। সে সময় হয়তো এ অঞ্চল গৌড় সুলতানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। কিংবা ঘটনা কালের হেরফের হতে পারে। আবার প্রকৃত ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন আসে। অতীতকে ইতিহাসের লিপিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রমাণ ও যথাযথ যুক্তির প্রয়োজন। যেগুলো ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমেই আসতে পারে।

যাহোক শাহ্ মখদুম (রহ.) নরবলি প্রথার অবসান ঘটান। তাঁর হাত ধরে অনেকে মুসলমান হন। তবে তিনি মুসলমান ও সনাতন উভয় ধর্মাবলম্বীদের কাছে আধ্যাত্মিক মহামানব রূপে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। তাঁর সান্নিধ্য লাভ ও শান্তিময় পরিবেশে বসবাসের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষের আগমন ঘটে। ফলে এ জনপদে প্রাচীন খোলসের বদলে নতুন আবরণ পড়তে শুরু করে। সুতরাং প্রসিদ্ধ হিসেবে রাজশাহীর সূচনাকাল ১৩২৬ খ্রিষ্টাব্দকে নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে লেখকের নামবিহীন যে পাণ্ডুলিপির তথ্যসূত্র নির্ভর করে শাহ্ মখদুম (রহ.) এর আগমনকাল ১৩২৬ খ্রিষ্টাব্দ উল্লেখ করা হচ্ছে এবং ঐ পাণ্ডুলিপিতে যে সব ঘটনার বর্ণনা আছে তা ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণের জন্য আরো গবেষণার প্রয়োজন। (বিস্তারিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অধ্যায়)

১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লীর পর্যটক আব্দুল লতিফ গৌড়ের তৎকালীন সুলতানের মিলিটারি ক্যাম্প আলাইপুরে একমাসেরও বেশি অবস্থান করেন। এ সময়ে তিনি রাজশাহীর বাঘা, যশোরের ফতেপুর, নাজিপুর ভ্রমণ ও কয়েকজন আউলিয়ার মাজার জিয়ারত করেন। তাঁর এ ভ্রমণ বিবরণীতে মহাকাল গড় বা বোয়লিয়ার উল্লেখ ছিল না। এ তথ্য ঈঙ্গিত করে, ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে হযরত শাহ্ মখদুম (রহ.) মাজার স্থাপন হলেও প্রসিদ্ধ ছিল না।

প্রাচীন পাণ্ডুলিপির তথ্যানুযায়ী আলী কুলি বেগ পারস্য রাজার সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। ১০৪৫ হিজরি বা ১৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পারস্য রাজার পক্ষে মাজার জিয়ারতে এসে এবাদত বন্দেগী শুরু করেন এবং মাজারকে সংস্কার করে কমপ্লেক্সে রূপ দেন। মাজারের ওপর গম্বুজ ঘর, মসজিদ, ১টি মুসাফিরখানা, ১টি ইমাম বাড়ি ও তাজিয়া, হিন্দুদের জন্য ১টি দোতলা নহবতখানা নির্মাণ করেন। কুলিবেগ সাহেবের এসব কীর্তি প্রমাণ করে তখন থেকেই মাজারকে কেন্দ্র করে মহররম উৎসব শুরু হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদেরও শাহ মখদুম (রহ.) এর ওপর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা ছিল বলে নহবতখানা নির্মাণ করা হয়। মাজার, মহররম উৎসব ও নহবতখানাকে কেন্দ্র করে নবজাগরণ শুরু হয়। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষেরও আগমন ঘটে। ফলে এ স্থানটি ক্রমশ উল্লেখযোগ্য জনপদে পরিণত হতে আরম্ভ করে। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ মাগরিবের পূর্ব মুহূর্তে এ মাজারের পূর্ব-দাক্ষণ কোণায় পুকুর পাড়ে কয়েক জন সিঁদুর পরিহিতা হিন্দু নারী ও কিশোরকে আগরবাতি জ্বলাতে দেখা যায়। তাই মোটা দাগে ধরা যায় ১৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ রাজশাহী মহানগরী প্রসিদ্ধ জনপদের সূচনাকাল। তবে গঞ্জ-বন্দর-শহরের আকৃতি ধারণ করে অস্টাদশ শতাব্দীতে এসে। যেখানে ভূমিকায় ছিল ডাচদের বড়কুঠি স্থাপনের পর রেশম বাণিজ্যের সম্প্রসারণ।