অধ্যায় ৪: প্রশাসনিক ইতিহাস ও অফিস

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার


রাজশাহী মহানগরীর পদ্মার তীরে সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার অবস্থিত। ব্রিটিশ আমল অর্থাৎ ১৯১৪ সাল হতে এটা কেন্দ্রীয় কারাগার বা বিভাগীয় কারাগারের মর্যাদা লাভ করে আসছে। পশ্চিমমুখী এক তোরণ বিশিষ্ট এ কারাগারের উত্তর-দক্ষিণের দৈর্ঘ্য ১১২৫ ফুট ও পূর্ব-পশ্চিমে ৭৪২ ফুট।১ কারাগারের মধ্যবর্তী বাগান, কর্মচারীর বাসস্থান, খেলার মাঠসহ মোট আয়তন ৪০ একর।২
রাজশাহী প্রাচীন কারাগারটি ছিল নাটোর রাজবাড়িতে।১ ১৭৮২ সালে বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হোস্টিংস (১৭৭২-৮৫) নতুনভাবে ৫ বছরের চুক্তিতে রাজস্ব আদায় ও প্রতি জেলায় ফৌজদারী ও দেওয়ানী আদালত স্থাপন করেছিলেন। সে সময়ও নাটোরের রাজার মাধ্যমেই এ কাজ সম্পাদন হতো এবং লর্ড কর্নওয়ালিশের (১৭৮৬-১৭৯৩) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পর্যন্ত তার মাধ্যমেই রাজশাহীর শান্তি রক্ষা, দেওয়ানী-ফৌজদারী বিচার হতো ও অপরাধীকে কারাগারে প্রেরণ করে শাস্তি দেয়া হতো। কর্নওয়ালিশের শাসন সংস্কারের ফলে প্রত্যেক জেলার কারাগার পুনঃসংস্কার হয় এবং নাটোরের তেবাড়িয়ােেত রাজশাহীর প্রথম সরকারি কারাগার স্থাপন হয় এবং জেলা কালেক্টরের অধীনে পরিচালনার দায়িত্ব আসে। অতঃপর তেবাড়িয়া থেকে কারাগার রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হয়। তবে কত সালে স্থানান্তরিত হয় জানা যায় না। গবেষকদের ধারণায় ১৮২৫ সালে জেলা সদর নাটোর থেকে রাজশাহীতে স্থানান্তর হলে কারাগারটিও স্থানান্তর হয় ।
কারাগারের মধ্যে তিনটি বিভাগ আছে। সাধারণ প্রশাসন বিভাগ, শিল্প বিভাগ ও বিভাগীয় পরিদপ্তর। সাধারণ প্রশাসন বিভাগের কাজ কয়েদী ও কর্মচারীদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। শিল্প বিভাগের কাজ দ্রব্যাদি উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রশাসন পরিচালনা।২

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের নবনির্মিত মেইন গেট (ছবি- জানুয়ারি ২০১৭)

কারাগারের প্রাচীন ভবন: কারাগারের অভ্যন্তরের উত্তর দিকে অবস্থিত পূর্ব-পশ্চিমে একতলা বিশিষ্ট কয়েকটি ব্যারাক আছে, যেগুলো বেশ প্রাচীন। গবেষকদের মতে এ ব্যারাকটিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনারা থাকতো। জেলার সদর দপ্তর নাটোর হতে রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হওয়ার পর তেবাড়িয়া থেকে এ ব্যারাকেই কারাগার স্থানান্তরিত হয়।১
২২ এপ্রিল ২০০৫ তারিখের যুগান্তর পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং এরপর কার্যত কারাগার ভবনের সংস্কার হয়নি। কারাগারের বন্দি ক্ষমতা ১২৭৭জন। এরমধ্যে ৪১জন মহিলা বন্দি থাকার ব্যবস্থা আছে। পুরুষ বন্দিদের জন্য ২৭টি ও মহিলাদের জন্য মাত্র ১টি ওয়ার্ড আছে। এসব ওয়ার্ডে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত বন্দি থাকে। উক্ত তথ্য মোতাবেক বন্দির সংখ্যা মোট সাড়ে তিন হাজার। এরমধ্যে ১৭০০জন কয়েদি ও বাকিরা হাজতি। মহিলা হাজতি ও কয়েদির সংখ্যা ১০০জন। কারাগারে সেল আছে ৫০টি।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সানশাইন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী এ কারাগারে বন্দির সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। এর মধ্যে মৃত্যু দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ৯৭জন ও যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত কয়েদী প্রায় ৮০০জন। ২০০৭ সালে দুটি ভবনের সামান্য সংস্কার হলেও প্রতিষ্ঠার পর কারাগারটির সার্বিক সংস্কার হয়নি। অতিরিক্ত বন্দিদের জন্য নির্মিত হয়নি নতুন ভবন। প্রায় দু’যুগ আগে নিরাপত্তা ওয়ার্ডের দ্বিতীয় তলার ৪টি ওয়ার্ড পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কয়েক বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় খাপড়া ওয়ার্ড। হাজতিদের ডিভিশন ওয়ার্ড ও সিভিল ভবনের সব ওয়ার্ড ঝুঁকিপূর্ণ। মহিলা ওয়ার্ডের অবস্থাও তাই। বন্দিদের জন্য নেই স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। সাক্ষাৎ প্রার্থীদের জন্য নেই বিশ্রামাগার।৫০১
কারাগারের শিল্প: শিল্পের দিক থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খ্যাতি আছে। এখানকার পটিয়সী কয়েদীরাই নিপুণ হাতে নানান কুটিরজাত শিল্প দ্রব্য তৈরি করে প্রয়োজন মত কারাগারের চাহিদা মিটায় ও কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ক্রেতাদের নিকট বিক্রয় করে। কারাগারের প্রধান তোরণের পূর্ব পাশে কারা উৎপন্ন পণ্য সামগ্রী বিক্রয়ের জন্য একটি শো-রুম আছে। মহানগরীর স্থানীয় জনসাধারণ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মেহমানগণ কারাপণ্য সামগ্রী তুলনামূলক সুলভ ও ন্যায্য মূল্যে ক্রয় করে থাকেন। পণ্য সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে কম্বল, চৌকিদারী পোশাক, কয়েদীদের যাবতীয় পোশাক, গালিচা, নকশী জায়নামাজ, মশারী, গামছা, তোয়ালে, ধুতি, লুঙ্গি, বিছানার চাদর, শাড়ি, নারকেল ছোবড়ার পাপোশ প্রভৃতি। এছাড়া বাঁশ-বেতের ঝুড়ি ও কাঠের বিভিন্ন আসবাবও তৈরি হয়।  পূর্বে ধান-গম ভাঙ্গা, তেলের জন্য ঘানি টানা, মাখন টানা প্রভৃতি কাজও কয়েদিরা করতো। এখন এসব কাজ মেশিনে হয়ে থাকে। এক সময় উৎকৃষ্ট মানের রেড়ির তৈল প্রস্তুত হতো এবং বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসামসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন চিকিৎসালয়ে চালান হতো।১
কারাগারের কৃষি: কারাগারের পূর্ব পাশে বড় একটি ফসলী জমি আছে। সেখানে কয়েদিরা ধান ও অন্যান ফসলের আবাদ করে নিজেরা ভোগ করে। আগে উত্তর পাশেও আবাদ হতো। সেখানে এখন কারা রক্ষীদের আবাসিক ভবন তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থা : কারাগারের নিরক্ষর কয়েদীদের জন্য অল্প বয়স্ক ও বয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। এ জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। অপরাধীদের মাঝে যারা শিক্ষিত তাদের দ্বারা এখানে শিক্ষকতার কাজ করানো হয়। এ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বেতন ভোগী শিক্ষকও নিয়োজিত আছেন। কারাগারের ভিতরে একটি লাইব্রেরীও আছে।২ বন্দিদের জন্য নিয়মিত সেনিটেশন ও ব্যায়ামের ব্যবস্থা আছে। ওয়ার্ডে টিভি ও মহিলা ওয়ার্ডে ফ্যান আছে।১৬৩
জেলখানা ময়দান: রাজশাহী মহানগরীতে জেলখানা ময়দানে বেশ সুপরিচিত একটি নাম। এককালে ময়দানের জমজমাট মেলা বসতো। বেশ কিছুকাল ময়দানটি নগরবাসীর খেলা-ধুলার জন্যও উন্মুক্ত ছিল। রাজশাহী জেলা স্টেডিয়ামের পরই এ ময়দানে বড় বড় টুর্ণামেন্টের আয়োজন হতো। বর্তমানে মাঠটি কারা কর্তৃপক্ষ উঁচু প্রাচীর বেষ্টনী দিয়ে দিয়েছে। সেখানে এখন কারারক্ষীদের প্যারেড ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ময়দানের দক্ষিণ পাশে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করা হয় ১৯৮৮ সালে। 
২০০৪ সালে বিদ্যালয়টি পূর্ব পাশে স্থানান্তর করা হয়। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি সরকারি হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টির ছাত্র-ছাত্রী ১৪০ জন ও শিক্ষক ৪জন। সেখানে কারারক্ষী ও সাধারণ মানুষের সন্তানরা লিখাপড়া করে।৪১৭
চিকিৎসা ব্যবস্থা: কয়েদীদের  চিকিৎসার  জন্য কারাগারের অভ্যন্তরে একটি হাসপাতাল আছে।২ তবে রোগ খুব জটিল হলে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালে ও দেশের অন্যান্য জায়গার রোগীদের ভর্তি করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। হাসপাতালে ১জন চিকিৎসক, ১জন ফার্মাসিস্ট ও বন্দিদের মধ্যে থেকে ১০ জন নার্স আছে।১৬৩
কারা পরিবেশ : কারাগারটি পদ্মার তীরে অবস্থান করাই আবাসের জন্য বেশ উপযোগী। এর বাহির ও ভেতরের পথ; আশপাশ বেশ পরিচ্ছন্ন। বিশেষ বিশেষ স্থান আবার ফুলের বাগানে সুসজ্জিত। কয়েদীদের ব্যারাকগুলো বেশ স্বতন্ত্রভাবে স্থাপিত। স্ত্রী কয়েদিগণ স্বতন্ত্র কয়েদখানায় থাকেন। রাজবন্দী ও বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির মর্যাদা অনুসারে এখানে ১ম, ২য়, ও ৩য় শ্রেণির কয়েদখানার ব্যবস্থা আছে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েদীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তৃতীয় শ্রেণির কয়েদীদের আবাসস্থল অনেকটা অসন্তোষজনক।১ বন্দিদের কোন বালিশ দেয়া হয়না, শুধু ৩টা কম্বল ও ১টা চট দেয়া হয়। ২০টি গোসলখানার মধ্যে ২টি মহিলাদের জন্য। ১৫৮টি পায়খানার মধ্যে ২টি মহিলাদের জন্য। ১২৫টি প্রসাব খানার মধ্যে ২টি মহিলাদের জন্য।১৬৩ এখানে ফাঁসির মঞ্চ ও সেল আছে।১
কারাগার প্রশিক্ষণ একাডেমি: রাজশাহী কারাগার প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের জন্য রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে জাতীয় অর্থনীতি পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত হয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ৯ জুন ২০১৫ তারিখে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। কারাগারের প্রধান হলেন ডিআইজি। কারাগারের দক্ষিণ পাশে তাঁর বাসভবন।
 


 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd