অধ্যায় ১৯: জীবনযাত্রা

রাজশাহী মহানগরীর সিনেমা হল


সিনেমার প্রাথমিক প্রযুক্তি বায়োস্কোপ। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে লুই ল্যুমিয়ের ও অগাস্ত নামের দুই ভাই পৃথিবীকে  সর্ব প্রথম এ বিস্ময়কর উপহার দিয়েছিলেন। তাঁদের চলচ্চিত্র কোম্পানীর নাম ছিল মেসার্স ল্যুমিয়ের ব্রাদার্স সিনেমাটোগ্রাফস (Messers Lumier Brothers Cinamatographs)। ১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই ভারতের বোম্বাইয়ের ওয়াটসন হোটেলে তাঁরা বায়োস্কোপের মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন। যার প্রবেশ মূল্য ছিল এক রুপি। ঐ জুলাইয়েই চলচ্চিত্র আসে কলকাতায়। ১৮৯৮ সালে হীরালাল সেন একজন মার্কিনীর কাছ থেকে একটি পুরনো প্রজেক্টর কিনে প্রথম ভারতীয় হিসেবে বায়োস্কোপ দেখাতে শুরু করেন।৬০৫ 
রাজশাহী মহানগরীতে বায়োস্কোপ প্রযুক্তিতে কখন, কে, কিভাবে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন ? প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার জন্য ব্যাপক অনুসন্ধানের প্রয়োজন। তবে ১৮ মাঘ ১৩০৬ বা ৩১ জানুয়ারি ১৯০০ তারিখের সাপ্তাহিক হিন্দু রঞ্জিকা পত্রিকার একটি প্রতিবেদন আমাদের তথ্য দেয়, ১৯০০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে এখানে কিছু দিন বায়োস্কোপ প্রদর্শন করা হয়েছিল। যার ভেন্যু ছিল জনৈক শরৎ বাবুর বাগানে। গবেষকদের ধারণা, শরৎ বাবু বলতে সে সময়ের দিঘাপতিয়ার জমিদার শরৎ কুমার রায়। তাঁর বাগানটি ছিল রাজশাহী কলেজের উত্তর পাশে বর্তমান রহমতুন্নেসা ছাত্রী হোস্টেলের জায়গায়। বিশেষ, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ চারটা শ্রেণিতে দর্শনীর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। যথাক্রমে দর্শনী মূল্য ছিল ৪ টাকা, ২ টাকা, ১ টাকা ও ৮ আনা। এ প্রদর্শনীতে মহিলাদের বসার পৃথক ব্যবস্থা ছিল। প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিল রেলগাড়ির দৃশ্য, ট্রান্সভালের যুদ্ধ, ষাঁড় ও ঘোড়ার লড়াই, ফুটবল খেলা, নৌকা বাইচ, সাহেব ও মেমসাহেবদের নাচ, সমুদ্রে ঝড়। উচ্চ মূল্য বা অন্য কারণে হোক এ প্রদর্শনীতে দর্শক বেশি হয়নি।৬০৮  
টাউন হল
সিমেনা হল ইতিহাসের সঙ্গে রাজশাহী এসোসিয়েশন ও ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাব নামের দুটি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট। ১৮৭২ সালের ২১ জুলাই (বঙ্গাব্দ শ্রাবণ ১১৭৯) রাজশাহী এসোসিয়েশন এসোসিয়েশন ফর দ্যা জমিন্দারস নামে যাত্রা শুরু করে। যার পরবর্তী নাম রাজশাহী এসোসিয়েশন।৯৬ রাজশাহী এসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি হন দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায় ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন রাজকুমার সরকার। প্রমথনাথ রায়ই প্রকৃতপক্ষে রাজশাহী এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। রাজশাহী এসোসিয়েশনের অনুপ্রেরণা ও সহায়তায় তৎসময়ের ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাব টাউন হল নির্মাণ করেছিল। পরবর্তীতে এ টাউন হলই রাজশাহী মহানগরীর প্রথম সিনেমা হলে পরিণত হয়। টাউন হল নির্মাণের পর ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাব ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ায় টাউন হল নিলামে তোলে। রাজশাহী এসোসিয়েশন ১৯১৯ সালের ২ এপ্রিল টাউন হল কিনে নেয়। দিঘাপতিয়ার রাজ পরিবারের ১১ হাজার এবং বাবু রাখাল চরণ মণ্ডল, বাবু সুদর্শন চক্রবর্তী, বাবু মহেন্দ্র কুমার সাহা চেীধুরী, বাবু ভবাণী গোবিন্দ চৌধুরী, বাবু দুর্গদাস ভট্টাচার্য প্রমুখের নিকট থেকে সংগৃহীত ৩ হাজার ১শ টাকার আর্থিক সহযোগিতায় হলটি কেনা হয়েছিল। রাজা প্রমথনাথ রায়ের পুত্র ও রাজশাহী এসোসিয়েশনের ৬ষ্ঠ সভাপতি রাজা প্রমদানাথ রায়ের স্মৃতিকে সংরক্ষণের উদ্দেশে ১৯২৯ সালে রাজশাহী এসোসিয়েশনের  ৫৭ তম সভায় রাজশাহী  টাউন হলের নাম রাজা প্রমদানাথ টাউন হল রাখা হয়।
রাজশাহী টাউন হলেই সোমপুরের জমিদার রূপেন্দ্রনারায়ণ ভাদুড়ী প্রথম সিনেমা চালু করেন। তাঁর নামানুসারে রূপেন সিনেমা নামে প্রথম নির্বাক ও পরে সবাক সিনেমা চালানো হতো। কলকাতার একে রায় তাঁর কন্যার নামানুসারে পরবর্তীতে রূপেন সিনেমার পরিবর্তে নামকরণ করেন ‘অলকা সিনেমা’। ফলে এ নামটি সবার নিকট পরিচিত লাভ করে এবং প্রকৃত নামটি হারাতে বসে।৯৫ ১৯৮৬ সালের ১৯ মে রাজশাহী এসোসিয়েশনের এক সভায় অলকা সিনেমার পরিবর্তে স্মৃতি সিনেমা রাখা হয়।৬০৯ 
প্রাপ্ত তথ্যানুসারে রাজশাহী মহানগরীর সর্বপ্রাচীন সিনেমা হল টাউন হলের নাম রাজশাহী টাউন হল থাকাকালীন সময়েই নির্বাক সিনেমার যুগেই রূপেন সিনেমা নামে হলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সুতরাং ১৯১৯ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে রাজশাহী মহানগরীতে সিনেমা হলের বীজ উপ্ত হয়। এসোসিয়েশন পুনর্গঠন ও সিনেমা হলের নাম পরিবর্তনসহ আরো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়ার পরও রাজশাহীর সর্ব প্রাচীন  সিনেমা হলটিকে ২০০৯ সালে ভেঙ্গে ফেলতে হয়। সেখানে রাজশাহী এসোসিয়েশন বহুতল বাণিজ্যিক ভবন স্থাপন হয়েছে। তবে হলের পূর্ব নাম অলকা নামানুসারে এ স্থানটির নাম অলকার মোড় হিসেবে পরিচিত। 
অলকাসহ বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত রাজশাহী মহানগরীতে মোট পাঁচটি সিনেমা হল নির্মিত হয়। অন্য চারটি হলো- কল্পনা (পরবর্তী নাম উৎসব), বর্ণালী, স্নিগ্ধা (পরবর্তী নাম উপহার সিনেমা হল লিমিটেড) ও লিলি। হলগুলোয় দর্শকের সংখ্যা কমতে থাকায় একবিংশ শতাব্দীর শূন্য দশক শেষ হতে না হতেই চারটি সিনেমা হল ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী নিউ মার্কেটের পশ্চিম-উত্তর দিকে উপহার সিনেমা লিমিটেড নামে মাত্র একটি সিনেমা হলই বিদ্যমান। পূর্বে এ হলের নাম ছিল স্নিগ্ধা।

কল্পনা বা উৎসব সিনেমা হল
উৎসব সিনেমা হলের পূর্ব নাম ছিল কল্পনা। ব্রিটিশ আমলে ১৬ জনের রাজশাহী সিন্ডিকেট কল্পনা নামে এ সিনেমা হলটি চালু করেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভারতে চলে যায়। দেশ স্বাধীনের পর সিন্ডিকেটের ম্যানেজার দীনবন্ধু দেশে ফিরে হলের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করেন ঢাকার মোশারফ চৌধুরীর কাছে। মোশারফ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই সাইফুল ইসলাম চৌধুরী হলটির নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করেন রাজশাহী কোর্ট এলাকার রাজপাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রহমানের নিকট। আব্দুর রহমান কল্পনা নামটি পরিবর্তন করে রাখেন উৎসব। ২০১০ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহতেও উৎসবে সিনেমা প্রদর্শন করা হয়। পরবর্তীতে হলটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। সেখানে স্বচ্ছ টাওয়ার নামে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এর অবস্থান ১৮৯, সেখের চক (আলুপট্টির পূর্ব দিকে পুরাতন নাটোর রোডের দক্ষিণ পাশ সংলগ্ন)।৩২১ এ মোড়টি এখনও কল্পনার মোড় নামে পরিচিত।

কল্পনা সিনেমা হল (ছবি- ইন্টারনেট)

বর্ণালী

বর্ণালী সিনেমা হল (ছবি- ইন্টারনেট)

মহানগরীর গ্রেটার রোডের দক্ষিণ পাশ সংলগ্ন কাদিরগঞ্জ ও পুরনো বিলসিমলার মাঝামাঝি ছিল বর্ণালী সিনেমা হলের অবস্থান। পাকিস্তান আমলে বাবুল ও রুবেল চৌধুরীর উদ্যোগে হলটি স্থাপন করা হয়েছিল। দুই ভাই নামের সিনেমা দিয়ে হলটির উদ্বোধন হয়। সিনেমাটিতে রাজ্জাক অভিনয় করেছিলেন।৬০৭ ২০০৯ সালে ডেসটিনি ২০০০ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সেন্টার হলটি ক্রয় করে নেয় এবং বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভেঙ্গে ফেলে জায়গাটিকে ঘিরে রাখে। হলটি না থাকলেও ঐ এলাকাটি বর্ণালী নামে পরিচিত।৩২১
স্নিগ্ধা বা উপহার সিনেমা হল লিমিটেড

উপহার সিনেমা লিমিটেড (ছবি- ২০১৬)

বর্তমানে রাজশাহী মহানগরীতে উপহার সিনেমা হল লি. একমাত্র সিনেমা প্রেক্ষাগৃহ হিসেবে সচল আছে। এর প্রাচীন নাম স্নিগ্ধা। হলটি ১৯৭৪ সালে চালু হয়। স্নিগ্ধার প্রথম সিনেমা ছিল নিমাই সন্ন্যাসী।৬০৬ এ সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন হাসান ইমাম।৬০৭ ভাষা সৈনিক মুহাম্মদ একরামুল হক ও সাটিয়ার এন্ড হক কোম্পানী হলটি স্থাপন করেছিলেন। কোম্পানীটির স্বত্বাধিকারী ছিলেন মিয়াপাড়ার মো. ওয়াহেদ উদ্দীন সাটিয়ার ও তাঁর ভাইয়েরা। একরামুল হকের মেয়ে স্নিগ্ধার নামানুসারে হলটির নামকরণ হয়েছিল স্নিগ্ধা।৭৯৮ কয়েক বছর চলার পর হলটি বন্ধ হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জ নিবাসী (ঢাকায় সেটেল্ড) মো. মোশারফ হোসেন ১৯৮৪ সালে হলটি কিনে নিয়ে সংস্কার করেন এবং ১৯৮৫ সালের ১৪ এপ্রিল পুনরায় চালু করেন অন্যায় সিনেমার মাধ্যমে। মোশারফ ১৯৯৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর মৃতবরণ করেন। তিনি জীবিত থাকাকালীন থেকে তাঁর পুত্র সাজিদ হোসেন চৌধুরী হলটি তত্ত্বাবধান করে আসছেন। এ হলের অবস্থাও ভালো না। শুধুমাত্র ঈদ-উল-ফিতরেই দর্শকে আসন পূর্ণ হয়। এছাড়া শুক্রবারে অর্ধেক টিকিট বিক্রি হয় এবং সপ্তাহর শেষ দিনে টিকিট বিক্রয় শতকরা ১৫ ভাগে নেমে আসে। ২৪ কাঠা জমির আয়তনের সিনেমা ভবনটি তিনতলা। আসন সংখ্যা ১০০৫টি। ব্যবসায় লোকসানের কারণে এ হলটিও বিক্রয়ের প্রক্রিয়া চলছে।৪৪২ 
লিলি সিনেমা হল
হড়গ্রাম বাজার থেকে দারুশা রোডের পূর্ব পাশ সংলগ্ন মোল্লাপাড়ায় লিলি সিনেমা হল নির্মাণ করা হয়েছিল বিশ শতকের নব্বই দশকে। বিলুপ্ত এ হলের দক্ষিণ পাশ দিয়ে সিটি বাইবাস রোড (কাশিয়াডাঙ্গা-বেলপুকুর রোড)। ব্যবসা বন্ধ হওয়ার কারণে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে হলটির প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে হলটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। হলটি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও স্থানটি লিলি সিনেমা হলের মোড় নামে পরিচিতি পেয়েছে।
এ সিনেমা হলগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পেশা ও কর্মসংস্থান সৃিষ্ট হতে দেখা যায়। সিনেমা হলে যেমন কিছু লোক কাজ করার সুযোগ পান, তেমনি কিছু ব্যবসায়ী ও শ্রমিকের নতুন সংস্থান হয়ে থাকে। সম্প্রতি দেখা গেছে উপহার সিনেমা হলে ১৩ প্রকার পদে ২৭ জন কর্মচারী আছেন। ম্যানেজার ১ জন, টিকিট পয়েন্টোর ৬ জন, গেট কিপার ৩ জন, প্রজেক্টর অপারেটর ২ জন, ক্যাশিয়ার ১ জন, বুকিং-মাস্টার ৩ জন, দারোয়ান ৩ জন, শিট মিস্ত্রি ১জন, সুইপার ২ জন, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ১জন, স্যানিটারী মিস্ত্রি ১জন, শিট ক্লিনার ২ জন, সুপারভাইজার ১জন। দ্বিতীয় সংস্থানের মধ্যে পড়ে রিক্সাপুলার, যানবাহন গ্যারেজের ইজারাদার, হোটেল, বটপরটা-পান-সিগারেট ইত্যাদির দোকানদার, বাদাম-বারভাজা-চকলেট ইত্যাদির হকার। পূর্বে বিরতির সময় এসব হকারেরা হলের ভিতরে গিয়ে বিশেষ সুরে তাঁদের উপস্থিতি দর্শকদের জানিয়ে দিতো। বর্তমানে তাঁরা শুধু বাইরে বিক্রির সুযোগ পায়। 
এক সময় নতুন বা দর্শক নন্দিত সিমেনা এলে কাউন্টারে টিকিট পাওয়া যেতনা। এক বিশেষ গ্রুপ কাউন্টার থেকে অগ্রিম টিকিট কিনে নিয়ে হাতে করে বিক্রি করতো। তাঁদের বলা হতো দালাল। তাঁরাও সিনেমা হল থেকে রুজির অন্বেষণ করতো। বিশেষ দিন বা বিশেষ সিনেমা ছাড়া এখন আর দালালের উপস্থিতি থাকে না। 
টিকিটের মাধ্যমে দর্শকদের নিকট থেকে যে প্রদর্শনী মূল্য নেয়া হয়, সেগুলোর কয়েকটি খাত থাকে। বর্তমানের খাত প্রবেশ ফি, রক্ষণাবেক্ষণ, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ও পৌরকর। অলিখিতভাবে আরো কিছু খাত আছে। যেমন- ডিজিটাল মেশিন ভাড়া। বিভিন্ন সময় সরকার সিনেমা হলের টিকিটের মাধ্যমে জনগণের কাছে থেকে টাকা সংগ্রহ করে বিশেষ তহবিলও গঠন করেছে। শোনা যায় ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে ভারত থেকে আগত শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য আদায় করা হতো শরনার্থী পুনর্বাসন কর। বিগত আশির দশকে যমুনা সারচার্জ নামে বর্তমান বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের জন্য দর্শকদের নিকট থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল বলেও শোনা যায়। 
সিনেমা হলগুলোয় আসন শ্রেণি বিন্যাসে তারতম্য দেখা যায়। বর্তমান উপহার সিনেমা হলে তিনটি ফ্লোরের নিচতলায় আছে জনতা ও শৌখিন, দ্বিতীয় তলায় বিলাস ও তৃতীয় তলায় নিরালা। এগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন শ্রেণি জনতা ও সর্বোচ্চ নিরালা। জনতার টিকিটের মূল্য ৪০টাকা ও নিরালার ১১০ টাকা। দোতলা বিশিষ্ট বিলুপ্ত অলকা বা স্মৃতি সিনেমা হলে ছিল শাপলা, শৌখিন ও বিলাস। দোতলা এক সময় শুধু মাত্র মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকতো। তার শিটপয়েন্টারও ছিল মহিলা। মহিলা শিটপয়েন্টারদের একজনের নাম ছিল শংকরী। তিনতলা বিশিষ্ট কল্পনা বা উৎসবে ছিল জনতা, শৌখিন, বিলাস ও নিরালা নামে চার শ্রেণির আসন । বর্ণালীতে জনতা, রিয়ার স্টল, শৌখিন, বিলাস, দোলনা নামের ৫ শ্রেণি ছাড়াও দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার মাঝামাঝি ছিল বক্স নামের দুটি বিশেষ কক্ষ। অনেকে বক্স রিজার্ভ করে সিনেমা দেখতো। শ্রেণি অনুসারে টিকিট মূল্যে তারতম্য ছিল। সময়ের পরিবর্তনে টিকিটের মূল্যও যুগোপযোগী করা হতো। যেমন-১৯৬৭-১৯৬৮ সালের দিকে কল্পনা সিনেমা হলের জনতা শ্রেণির টিকিটের মূল্য ছিল আট আনা বা পঞ্চাশ পয়সা। সে সময় ছাত্রদের জন্য বিশেষ সুবিধা ছিল। তারা অর্ধেক মূল্যে টিকিট সংগ্রহ করতে পারতো। অর্থাৎ জনতা শ্রেণির টিকিট কিনতো ১সিকি বা ২৫ পয়সায়। দেশ স্বাধীনের পর বর্ণালী সিনেমা হলে জনতা শ্রেণির টিকিটের মূল্য ছিল মাত্র বারো আনা বা ৭৫ পয়সা।৬০৭
এক সময় সব পেশার মানুষই ছিল সিনেমা হলের দর্শক। তাঁরা সপরিবারে, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বা একাকি সিনেমা হলে যেত। বর্তমানে সিংহভাগ সিনেমার জন্যই ভিন্ন আঙ্গিকে গল্প তৈরি করা হয়। এখন বিশেষ বিশেষ চরিত্রের লোকেরাই সিনেমা দেখে থাকেন। তাঁরা বেশির ভাগই ছাত্র ও স্বল্প আয়ের মানুষ। তাঁদের মধ্যে মহানগরীর স্থানীয় মানুষ থাকেন না বললেই চলে।
সে সময় সিনেমা বই নামেও পরিচিত ছিল। পাঠক প্রিয় গল্প, উপন্যাস, প্রণয় কাহিনী, ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে সিনেমার গল্প নির্মাণের কারণে বই বলা হতো। 
নির্বাক ছবি দিয়েই সিনেমা শুরু হয়েছিল রাজশাহীতে। সবাক যুগে এসে বাংলা ভাষা প্রাধান্য পায়। পাকিস্তান আমলে বাংলা ও উর্দুর আধিক্য ছিল। দেশ স্বাধীনের পর বংলার পাশাপাশি মাঝে মাঝে ইংরেজি সিনেমা চলতে দেখা গেছে। ইরেজিতে অলকা বা স্মৃতি সিনেমা হলের প্রধান্য ছিল বরাবরই। ভারতের হিন্দিও চলতে দেখা গেছে। বিগত আশির দশকে বর্ণালীতে আলিবাবা ও চল্লিশ চোর নামে একটি হিন্দি সিনেমা চলেছে। সিনেমাটির হিন্দি সংলাপের সঙ্গে বাংলা ভাষার সাব টাইটেলও উচ্চারণ হয়েছিল। বর্তমানে উপহারে আমদানিকৃত ভারতের বাংলা সিনেমা চলতে দেখা যাচ্ছে।
মহানগরীর একমাত্র সিনেমা হল উপহারে এখন বিকাল শো ৩টা থেকে ৬টা, সন্ধ্যা শো ৬টা থেকে ৯টা ও নিশিথ শো ৯টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত প্রদর্শন করা হয়। এক সময় মহানগরীর প্রতিটা সিনেমা হলেই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকাল ১০টা থেকে মর্নিং শো চলতো। আবার ঈদ উপলক্ষে কোন কোন সিনেমা হলে সকাল থেকে রাত পর্যন্তই সিনেমা প্রদর্শন করা হতো। দর্শক না থাকায় এখন মর্নিং শো নেই।
স্বদেশের প্রতি সম্মান ও জাতীয় সংহতির নিদর্শন স্বরূপ পাকিস্তান আমল থেকেই জাতীয় পতাকার সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের প্রচলন আছে। পাকিস্তান আমলে পরিবেশন হতো হাফিজ জলঙ্করীর কবিতা৭০৯ ‘পাকসার জমিন সারবাদ... জাতীয় সঙ্গীত।৬০৭ দেশ স্বাধীনের পর গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার সোনার বাংলা... জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। জাতীয় পতাকা ওড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সব দর্শক আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতো। পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য এখন স্মৃতির দৃশ্য হতাশ করে। দর্শকদের সে প্রবণতা কমে গেছে। এখন ছাত্র দর্শকদের মধ্যেই কেউ কেউ দাঁড়ায়।    
সিনেমা হলগুলো বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ দর্শক সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে আয়ের স্বল্পতা। দিনের পর দিন লোকসান দিতে দিতে মালিক পক্ষ সেগুলো বিক্রি অথবা ভেঙ্গে ফেলে নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করছেন। দর্শক বিমুখ হওয়ার পিছনে আছে বিবিধ কারণ। মহনগরবাসী প্রায় একই ধরনের কারণ চিহ্নিত করেন। উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে-
১.     ক্যাবল ও ডিশের মাধ্যমে টিভিতে দেশি-বিদেশি সিনেমা প্রদর্শন।     
২.    বাজারে অল্প মূল্যে সিনেমার সিডি বিক্রি। 
৩.    মানসম্মত চিত্তাকর্ষণ কাহিনীর অভাব। 
৪.     সিনেমার চরিত্রে অশ্লীল পোশাকের ব্যবহার।
৫.    উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার না হওয়ার কারণে ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ। 
৬.     হলগুলোয় অসামাজিক ক্রিয়াকলাপের ফলে নারী দর্শকদের নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি। 
মহানগরীর সিনেমা হলগুলো ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে পড়লেও নগরীর কয়েকটি নির্মাণাধীন বহুতল আধুনিক বানিজ্যিক ভবনে তুলনামূলক ছোট আকৃতির সিনেমা হলের অপসন থাকতে দেখা যাচ্ছে। যেমন- রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের পুরাতন নগর ভবনের জায়গায় নির্মাণাধীন রাজশাহী সিটি সেন্টারের নবম তলার একটি অংশে ৩৯১০ বর্গফুটের একটি সিনেমা হল বা সিনেপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। নির্মাণাধীন রাজশাহী এসোসিয়েশন ভবনের ৩য় তলার অংশ বিশেষে থাকছে রাজা প্রমদানাথ হল নামের মিলনায়তন। এ মিলনায়তনে সিনেমা প্রদর্শনও করা যাবে। তবে হলের অবকাঠামো যাই হোক না কেন, সেখানে দর্শক উপস্থিতির আশংকা থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন না হলে সেগুলোয় পূর্বের মতো দর্শক উপস্থিতির সম্ভাবনা নেই। সিনেমাকে যদি বিনোদনের পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজনীয় গণ মাধ্যম হিসেবে নির্মাণ করা যায়, তাহলে হয়তো এ শিল্পের জনপ্রিয়তা আসতে পারে। 
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd