অধ্যায় ১৯: জীবনযাত্রা

সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান


রাজশাহী মহানগরীতে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোক সবচেয়ে বেশি। এরপর আসে হিন্দু ও খ্রিস্টান। অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বাস করলেও তাদের সংখ্যা একেবারেই সীমিত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পারস্পরিক ভাবের ভিত্তিতে এখানে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বিয়ে ও অন্যান্য আচার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা পরস্পরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখে। 
রাজশাহী মহানগরীতে মুসলমানদের উৎসবের মধ্যে দুই ঈদ, বিয়ে, খাৎনা ইত্যাদি প্রধান। দুই ঈদ মহাউৎসবে পালিত হয়। সবাই নতুন নতুন পোশাক বানায় ও বিশেষ বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করে থাকে। নগরীতে পূর্বে ঢোল, লাঠি খেলার মাধ্যমে জাঁকজমকপূর্ণ মহরমের উৎসব হতো। বিভিন্ন মহল্লায় মহরমের মেলা বসলেও সোনাদিঘির মোড়ে প্রধান মেলা বসত। মশাল, মই আকৃতির মশাল, তাজিয়া নিয়ে, ঢোল বাজিয়ে, হুংকার ছেড়ে এবং লাঠি, তলোয়ারের মহড়া দিতে দিতে বিভিন্ন পাড়ার দল সোনাদিঘির মোড়ে আসতো। হজরত হোসেন (রা.) ও এজিদের যুদ্ধ অনুকরণে সমস্ত দল তুফানি ও মিয়াজান নামে বিভক্ত ছিল। তুফানি ও মিয়াজানদের মহল্লাভিত্তিক খলিফা নির্বাচিত হতো। খলিফা ও দলের নামে জয়ধ্বনি দেয়া হতো। তুফানি ও মিয়াজানদের মধ্যে তুমুল মারামারিও হতো। স্বাধীনের পরও এ মহাউৎসব ব্যাপকভাবে পালন হলেও আশির দশক থেকে এর আয়োজন কমতে থাকে এবং বর্তমানে নাই বললেই চলে। বর্তমান বুলনপুর ইদগাহ্ মাঠেও মহরমের মেলা অনুষ্ঠিত হতো।
কাজী মোহাম্মদ মিছেরের রাজশাহী ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আলী কুলী বেগ (রহ.) কর্তৃক শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) সমাধি পুননির্মাণের পর হতে সমাধি চত্বরে ঘটা করে তাজিয়াদি উঠত। বিশ শতাব্দীর ষাট দশকেও দরগার পীর পালের আয় হতে শতাধিক টাকা মহরমের অনুষ্ঠানে ব্যয় হতো। তবে এ বিষয়ে দলাদলি ছিল। এক দল বলতেন,শাহ মখদুমের রীতি অনুযায়ী এখানে মহরম হতো এবং তারা দরগা চত্বরেই মহরমের অনুষ্ঠানাদির দাবি জানাতো। অন্য দল এর প্রতিবাদ করত (স্বাধীনের পূর্বে)। এ দলাদলির কারণেই হয়ত দরগার সন্নিকটেই এ অনুষ্ঠানাদি হতো। মুর্শিদাবাদ থেকে কিছু শিয়া মাজহাবী লোক (১৯৪৭ সালের পর) আসার ফলে মহরমের পূর্ব রীতি জেগে উঠেছিল। নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদের  পরেই রাজশাহীর মহরম অনুষ্ঠান অগ্রগণ্য ছিল। পাকিস্তান আমলে এর স্থান দাঁড়ায় ঢাকার পর। 
দরগার মহরম পর্ব ও আলীকুলী বেগ (রহ.)কে কেন্দ্র করে কেহ কেহ শাহ্ মখদুম (রহ.)কে শিয়ায়ী দরবেশ বলে অনুমান করতেন। জনৈক মুর্শিদাবাদী এ নিয়ে মামলা করেন। জজ কোর্টের রায়ে বর্ণিত হয়, এ দরগার যত কিছু সুন্নীদের; শিয়াদের নয়। নগরীতে বিভিন্ন পূজা উৎসব পালিত হলেও শারদীয় দুর্গা পূজাই মহাসমারোহে পালিত হয়। হিন্দুরা বিভিন্ন মন্দির ও বিভিন্ন জায়গার পূজা মণ্ডপে দুর্গা পূজার আয়োজন করে মাইক বাজিয়ে থাকে। পূজা মণ্ডপে তারা জাঁকজমকপূর্ণ রঙ বেরঙের আলো জ¦ালিয়ে আলোকিত করে রাখে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারণেই রমজান মাসে দুর্গোৎসব হলে হিন্দুরা গান বাজানো থেকে বিরত থাকেন। মাইকের পরিবর্তে এখন সাউন্ড বক্স ব্যবহার হয়।
খ্রিস্টানদের বড়দিনও জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। তবে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সংখ্যা কম হওয়ায় মুসলমান বা হিন্দুদের মত জোরালো হয় না। বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে ভোজানুষ্ঠানসমূহ বাড়ির ছাদে বা খোলা স্থানে ডেকোরেটিং করে অনুষ্ঠিত হয়। আজকাল তা কমিউনিটি সেন্টার নির্ভর হয়ে পড়ছে। 
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd