অধ্যায় ১৯: জীবনযাত্রা

মহানগরীর রেস্তোরাঁ/খাবারের হোটেল


রাজশাহী মহানগরীর প্রথম যুগে রেস্তোরাঁগুলো হোটেলের বৈশিষ্ট্য নিয়েই গড়ে উঠেছিল। সেখানে থাকা-খাওয়া উভয়ের ব্যবস্থা থাকত। পরবর্তীতে হয়ত হোটেল শব্দটি জনপ্রিয় হওয়ার কারণে রেস্তোরাঁর বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়ে উঠা খাবারের দোকানগুলো হোটেলের নাম নিয়ে যাত্রা আরম্ভ করে। হোটেলগুলো মহানগরীর সর্বত্রই ছোট-বড় খাবারের হোটেল বা রেস্তোরাঁ নামে বিদ্যমান। এ সব হোটেলে ভাত, রুটি, চাপাতি, নানরুটি, বিভিন্ন ধরণের সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, নেহারি, কিমা-ডিম-আলুর চপ, কাবাব, সিঙ্গাড়া, লুচি, পুরি, পিঁয়াজি, রসগোল্লা, সন্দেশ, জিলাপি, অবাক, রসেকদম, নাড়ু, বুন্দিয়া প্রভৃতি খাবার পাওয়া যায়।
বঙ্গদেশে আঠার শতক থেকে রেস্টুরেন্ট খোলা হয়। রাজশাহী মহানগরীতে তৈরি খাবার বিক্রি বা খাবার হোটেলের সূত্রপাত সম্পর্কে বলা মুশকিল। এ বিষয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। তবে ধারণা করা হয়, আঠারো শতকের শেষ বা উনিশ শতকের শুরুতে তৈরি খাবার বিক্রির সূচনা হয়েছে রেশম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। তখন যে ঘাট ও গঞ্জের সৃস্টি হয় তা থেকে। পরে বিভিন্ন ধরনের অফিস, আদালত, শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠা হয়ে মানুষের সমাগম বৃদ্ধির ফলে রেস্তোরাঁর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সর্বপ্রথম আদি বসতির মানুষ এখানে ধান, আটা, গুড়, নারকেল, দুধ ইত্যাদি দিয়ে মুড়ি, খৈ, চিড়া, নাড়ু , মুড়কি, বড়া প্রভৃতি বিক্রি করত ফুটপাতে। পরে ঘোষেরা রসগোল্লা তৈরি করে। ছানা দিয়ে রসগোল্লা বানানোর পদ্ধতি ভারতবর্ষে নিয়ে আসে পুর্তগিজরা। তাঁরা রাজশাহীতে আসেনি। সুতরাং ভারত থেকে আগতরাই স্থানীয় মানুষকে রসগোল্লা বানানো শিখিয়েছে।
মহানগরীর পশ্চিমাঞ্চলের নবাবগঞ্জ ঘোষপাড়া নিবাসী বীরেন্দ্রনাথ ঘোষ (৭০), মনোরঞ্জন ঘোষ ওরফে হোবা ঘোষের নিকট থেকে জানা যায়, তাঁরা ছয় প্রজন্ম থেকে মিস্টির ব্যবসা করেন। বর্তমান বাঁধের দক্ষিণে নবাবগঞ্জ নামে ছোট্ট একটা বাজার ছিল, সেই বাজারেই তাঁদের পূর্ব পুরুষেরা মিস্টি বিক্রি করত। বাজারটি পদ্মা গর্ভে বিলিন হয়ে গেলে ব্যবসা উঠে আসে বর্তমান কোর্ট চত্বরে। কালেক্টরের অনুমতি সাপেক্ষে ফি বছর খাজনা দিয়ে ব্যবসা করতে হতো। তাঁদের নিকটতম পূর্ব পুরুষ শিবু ঘোষ, সুরেন ঘোষ, সিরিশ ঘোষ, গোপাল ঘোষ, বিভূতি ঘোষ, কুড়ান ঘোষকে তাঁরা ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও ব্যবসা করতে দেখেছেন। তাঁরা হাড়িতে রসগোল্লা, সন্দেশ, ছানা জিলাপি প্রভৃতি রাখত। খরিদদারদের কলাপাতা বা পদ্মপাতায় এ সব খাবার সরবরাহ করত। মাটির হাড়ায় থাকত পানি। সাথে থাকত মগ। হাড়া থেকে মগে পানি তুলে খরিদদারেরা পান করত। গত শতকের ষাট দশকের কিছু আগে বা পরে বীরেন্দ্রনাথ ঘোষ, মনোরঞ্জন ঘোষ ওরফে হোবা ঘোষ, বল্টু ঘোষ, বাসু  ঘোস, সাধন ঘোষ পূর্ব পুরুষের হাল ধরে ব্যবসার ধরন পাল্টে দেন। কলাপাতা ও পদ্মপাতার বদলে নিয়ে আসেন থালা, গ্লাস, প্লেট। আবার বসার জন্য বেঞ্চের চলন শুরু করেন। তাঁরা এখন মিষ্টির সঙ্গে ভাত ও অন্যান্য খাবারও বিক্রি করেন। রাজশাহী জজ কোর্টের আপিল সহকারী মো.  মনসুর আলী, বীরেন্দ্র নাথ ঘোষ ও মনোরঞ্জন ঘোষের মতে, মধ্য শহর নিবাসী জনৈক নাসির কোর্ট চত্বরে ব্রিটিশআমলের শেষের দিকে সর্ব প্রথম কাঠের ঢোপে খাবার হোটেল স্থাপন করেন। পরবর্তীতে হড়গ্রাম বাজারের মতিবাবু, মধ্য শহরের গোপাল দাস, কালিবাবুও খাবারের হোটেল বসিয়েছিলেন এখানে। এ সব হোটেল স্থাপন হয়েছিল মুক্তার বারের (বর্তমানে উকিল বার -২) পূর্ব দিকে। তাঁরা চা, সিঙ্গাড়া, পরোটা, লুচি, বিস্কুট প্রভৃতি বিক্রি করতেন। মুন্সেফ কোর্টের ঘোড়ার আস্তাবলের ঘরটিতে জনৈক চিন্তা বাবুও ক্যান্টিন দিয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালের দিক থেকে এসব হোটেলে মিষ্টির সঙ্গে ভাতও বিক্রি শুরু হয়। হড়গ্রাম বাজার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজের মতে, ১৯৪৭/৪৮ সালের দিকে পুরনো জজ কোর্টের পশ্চিম দিকের রাস্তার পাশে উজির মিয়ার টিনশেড ও খড়ের বেড়ার একটি ছোট খাবারের হোটেল ছিল।
উপরোক্ত তথ্যের ভিক্তিতে ধারণা হয়, পদ্মার তীরের ঘাট ও গঞ্জে ফুটপাতেই খাবারের হোটেলের আদিম অবস্থা। এরপর বিভিন্ন স্থানের মানুষের আগমনের ফলে ক্রমশ নতুন নতুন ধারণার জন্ম হয় ও বিভিন্ন রকমের খাবারের আবির্ভাবের পাশাপাশি হোটেল/রেস্তোরাঁর অবকাঠামোও পরিবর্তন হতে থাকে। রাজশাহী মহানগরীর খাবারের হোটেল বা রেস্টুরেন্টের ধারণা আসে উড়িষ্যা/মহারাষ্ট্র থেকে। রেশমকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বাণিজ্যিক বন্দরে রূপ নিলে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ রাজশাহী এসে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা শুরু করেন। অন্যান্য ব্যবসার পাশাপাশি তাঁরা খাবারের হোটেলও বসান। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যান। সে সব প্রাচীন হোটেলের মধ্যে মালিক বদল হয়ে কয়েকটি এখনও টিকে আছে। প্রবীণ লোকদের স্মৃতি থেকে কয়েকটি বিলুপ্ত হোটেলেরও সন্ধান পাওয়া যায়। 
জলযোগ
ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্টিত সাহেব বাজার বড় মসজিদের পশ্চিমে রাস্তার পশ্চিম পাশে ছিল জলযোগ নামের হোটেল। বর্তমান আবাসিক হোটেল মুনের নিচতলায় জলযোগ এখন সুবাস ইলেকট্রোনিক্স। বিভূতি ভূষণ চাকীর (জন্ম কাদিরগঞ্জ-১৯৪৮ ) দেয়া তথ্যনুযায়ী  জলযোগের মালিক ছিলেন উড়িষ্যার লোক। নাম প্রল্লাদ ঠাকুর। ১৯৪৭ এর পর তিনি ভারত চলে যান। বিরিয়ানি হাউস (১৯৮৬-৯৮) এর মালিক এম মান্নান (পুরাতন বাড়ি ভুবন মোহন পার্কের পিছনে, বর্তমান রামচন্দ্রপুর) এর মতে, জলযোগের মালিক ছিলেন নারায়ন চন্দ্র ঘোষ। তার ছেলে দিলীপ ও প্রদীপ এখন মালদার মঙ্গল বাড়িতে থাকেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে জলযোগে এক টাকায় বিশটি লুচি ও ৫০ পয়সায় একটি রসগোল্লা পাওয়া যেত। উপরোক্ত তথ্যদ্বয় থেকে ধারণা করা যায়, জলযোগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রল্লাদ ঠাকুর। তিনি ১৯৪৭ সালের পর নারায়ন চন্দ্র ঘোষকে দান অথবা বিক্রয় করে ভারত চলে যান। জোড়কালি মন্দিরের ঠাকুর ও হোটেলের পরিচালক শতবর্ষী নিতাই ঠাকুরের মতে স্বাধীনের পূর্বে জলযোগ উঠে যায়। জলযোগের লুচি নিরামিষ তরকারি, ছানার রসগোল্লা, রাজভোগ বিখ্যাত ছিল।
রহমানিয়া হোটেল
রহমানিয়া গণকপাড়ায় অবস্থিত। হোটেলের বর্তমান স্বত্বাধিকারী মো. শওকত খানের মতে, ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে চল্লিশের দশকে আমার দাদা আনিসুর রহমান হোটেলটি স্থাপন করেন ১৯৬৭/১৯৬৮ সালে। তিনি ১৯৯১ সালে মৃত্যুবরণ করলে মালিক হন তাঁর সন্তানেরা। ফিরনির জন্য হোটেলটি বিখ্যাত হয়ে ওঠে। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে মাত্র চার আনায় এক পাত্র ফিরনি বিক্রি হতো। ২০০৮ সালে তা আট টাকায় উঠে। বর্তমানে ভাত, পোলাও, মাছ, মাংস, সবজি, কাবাব, পুরি, সিংঙ্গাড়া, পরাটা, ফিরনি ইত্যাদি বিক্রি হয়।

রাজশাহী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার

রাজশাহী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, সাহেব বাজার

জোড়াকালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পরিচালক নিতাই ঠাকুরের কাছ থেকে জানা যায়, বিহার থেকে আগত কানাইলালের বাবা রাজশাহী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ব্রিটিশ আমলে স্থাপন করেন। তবে বর্তমান মালিকের মতে, কানাইলাল আগরওয়াল ঐ দোকানের ম্যানেজার ছিলেন। ১৯৪৭ সালের পর আসল মালিক কানাইলালকে দান করে ভারতে চলে যান। এ হোটেলটি গণকপাড়ার প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। বর্তমান মালিক দরগাপাড়ার মো. মাহবুব আলম ও রাজপাড়ার এরফান শফি (৬০)। মো. এরফান শফি ও বিশাল ফ্যাক্টরীর ম্যানেজার মুজিব আলম রনির (৩৫) মতে, বর্তমান মালিকগণ ১৯৯৬ সালে কানাইলাল আগারওয়াল এর কাছ থেকে কিনে নেন। কানাইলাল সম্ভবত হোটেল বিক্রি করে ভারত চলে যান। দোকানের বয়স কমপক্ষে ১০০ বছর। তবে কানাইলাল মালিক ছিলেন কমপক্ষে ৪৫ বছর।  
জোড়াকালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার
মালোপাড়া জোড়াকালী মন্দিরের সঙ্গেই জোড়াকালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। দোকানের মালিক মন্দির। হোটেলের আয়েই মন্দির চলে। ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন হোটেলটি উড়িষ্যা থেকে আগত রাধা ঠাকুর বা তার পূর্ব পুরুষ স্থাপন করেছিলেন। তিনিও ছিলেন এ মন্দিরের ঠাকুর। তাঁর মৃত্যুর পর মন্দিরের ঠাকুর হন  উড়িষ্যার বংশোদ্ভুত নিতাই ঠাকুর। তখন থেকে তিনি হোটেলও পরিচালনা করছেন। ২০১০ সালে তাঁর বয়স শতবর্ষ। প্রতিষ্ঠাকালে দোকানের অবকাঠামো ছিল টিনশেড ও বাঁশের চাটাই। সে সময় কলার পাতায় খাবার ও পানি দেয়া হতো। ২৫ বছর পূর্বে দোকানটি পাকা হয়। এখন টেবিল, চেয়ার প্লেট, গ্লাস সবই আছে। এখানকার লুচি ও নিরামিষ খুব প্রসিদ্ধ। রাজভোগ, রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ, নাড়ু, দইও পাওয়া যায়। তবে ব্যবসা আগের মত নেই।
 

জোড়াকালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, মালোপাড়া (ছবি- ২০১১)

তাজমহল হোটেল
এ হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা কাজী আবুল হোসেনের পুত্র কাজী লিয়াকত আলী বাচ্চুর মতে, সাহেব বাজার সোনাদিঘি মোড়ের পূর্বপাশে খাবারের এ হোটেলটি তাঁর বাবা নিজ ভবনের নিচ তলায় ১৯৪০ সালে স্থাপন করেছিলেন। স্বাধীনের  কয়েক বছর পর হোটেলটি উঠে যায়। বর্তমান হোটেল কক্ষে জুয়েলার্সের দোকান। 
হোটেল কাদেরিয়া
১৯৪২ সালে মো. আব্দুল কাদের নিজ নামে হোটেল কাদেরিয়া স্থাপন করেছিলেন। হোটেলটির অবস্থান ছিল সাহেব বাজার মনি চত্বরের পাশে মাস্টার পাড়া রোডের পাশে । ১৯৭০ সালে হোটেলটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে হোটেলের ঘর দু ভাগ হয়ে কাঁচা মালের আড়ৎ হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। আব্দুল কাদের ১৯৮৫ সালে ৯২ বছর বয়সে মারা যান। তার ছেলে আব্দুল হান্নানের (৬৫) তথ্যানুযায়ী, এ হোটেলে পোলাও এর মত খোকসা নামের এ ধরনের খাবার বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। খাবারটি গরমের দিনে বেশ চলত। এ ছাড়া বিরানি, সিঙ্গাড়া, তন্দুর রুটি, নেহারি, পুরি, পরটা, ভাত, মিষ্টি ইত্যাদি বিক্রি হতো। তাঁদের পূর্বে বাড়ি ছিল কাদিরগঞ্জে। ১৯৩২ সালে সেখান থেকে সাহ্বে বাজার চলে আসেন।
ইসমাইল টি স্টল
রাজার হাতা নিবাসী সোনাদিঘির মোড়ের পাশে ফুটপাতের দর্জি ইসহাক হোসেন (৬৭) এর পিতা ইসমাইল হোসেন এ হোটেলটি স্থাপন করেছিলেন সাহেব বাজারের বর্তমান জিরো পয়েন্টের কাছে। যুদ্ধের সময় পাক আর্মিরা পুড়িয়ে দিলে দোকানের অবসান ঘটে। ইসহাক হোসেনের মতে, আমার পিতাই সিলেট থেকে শিখে এসে রাজশাহীতে তন্দুরের রুটি চালু করেন। এছাড়া ভাত, তরকারী, পরটা, চা সবই বিক্রি হতো। তাদের পূর্বে বাড়ি ছিল সিতলাই। প্রায় ৯০ বছর আগে রাজার হাতা আসেন। 
ঢাকা  হোটেল
পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত মাষ্টারপাড়া রোডে ঢাকা হোটেল প্রসিদ্ধ ছিল। হোটেলটি বন্ধ হয়ে গেছে।
আজাদ  হোটেল
পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত গনকপাড়ায় রহমানিয়ার বিপরীত পাশে আজাদ হোটেল প্রসিদ্ধ ছিল। এ হোটেলও  বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১০ সালে দেখা যায় বিসমিল্লাহ নাম নিয়ে রহমানিয়ার মালিকানায় চলছে।
হোটেল কাসিনা
পাকিস্তান আমলে কাসিনা অভিজাত হোটেল হিসাবে পরিচিতি পায়। এ হোটেলেই রাজশাহীতে প্রথম আলাদাভাবে প্যাকেট চা, দুধ, চিনি, গরম পানি, কাপ খরিদারদের নিকট পরিবেশন শুরু হয়। খরিদদারেরা ইচ্ছে মত কাপে মিশিয়ে নিত। এছাড়া মিষ্টি, দই, সিঙ্গাড়া, পরটা, জর্দা পোলাও, তেহেরি, বিরানি, গোস্তসহ বিভিন্ন তরকারি ইত্যাদি পাওয়া যেত। সাহেব বাজার সমবায় মার্কেটের বিপরীত পাশে কাসিনা ভবনের নিচতলায় হোটেলটি স্থাপন করেছিলেন হেতমখাঁ নিবাসী মোজাফ্ফর হোসেন সরকার। তিনি ১৯৭৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার পূর্বেই স্বাধীনের পর হোটেলটি বন্ধ করে দেন। অনেকের মতে, হোটেলটি স্থাপন হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। তবে মোজাফ্ফর হোসেন সরকারের নাতি ও মকবুল হোসেনের পুত্র মো. রুবেল ১২.১২.২০০৯ তারিখে বলেন, কাসিনা ব্রিটিশ আমলে নিজস্ব ভবনে স্থাপন করা হয়েছিল। হোটেলের ঘরে এখন বই, জুয়েলার্স ও স্টেশনারীর দোকান শোভা পাচ্ছে।
হোটেল মাজেদা
লিজ নেয়া সরকারি সম্পতিতে এ হোটেলটি সোনাদিঘির মোড়ে অবস্থিত। এখানে মহিলাদের জন্য পৃথক কেবিন ছিল। ১৫/১৬ বছর থেকে এ পদ্ধতি উঠে গেছে। এখানকার হালুয়া বিখ্যাত ছিল। মিস্টি, পরোটা, সিঙ্গাড়া, চা, ইত্যাদি দিয়ে শুরু হলেও ৫/৬ বছর থেকে ভাত, মাংস, মাছ, সবজি ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। বোসপাড়া নিবাসী রফি উদ্দিন ১৯৪৭ সালের পর ভারতের মালদা থেকে এসে গত পঞ্চাশের দশকে হোটেলটি স্থাপন করেন। তিনি তাঁর শ্বশুরের নিকট থেকে এ ব্যবসা শিখেছিলেন। তাঁর ছেলে কামরুদ্দিনের নিকট ৭.১২.২০০৯ তারিখে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে তিনি মারা গেলে মালিক হন স্ত্রী আকেলা খাতুন। তবে পরিচালনা করেন মো. কামরুদ্দিন ও মো. আলাউদ্দিন দু ভাই।
চাঁন তারা হোটেল
ভুবন মোহন পার্কের পূর্ব দিকে বর্তমান বিউটি লেদার সপ এক সময় ছিল চাঁন তারা হোটেল। নেহারী ও তন্দুরের রুটির জন্য চাঁন তারা প্রসিদ্ধ ছিল। ১৯৪৭ সালের পর বিহার থেকে জনৈক মোতালেবের পিতা কুমার পাড়ার ঘোষপাড়ায় বাড়ি স্থাপন ও এ হোটেল প্রতিষ্ঠা করেন। বিরানি হাউসের (বিলুপ্ত) প্রতিষ্ঠাতা সাহেব বাজার নিবাসী (বর্তমান বাড়ি রামচন্দ্রপুর) এম এ মান্নান হিরার মতে, স্বাধীনের পর চাঁন তারা বর্তমান জাতীয় পার্টির অফিস গণকপাড়ায় স্থানান্তর হয়। পরে তাঁরা দোকান উঠিয়ে দিয়ে পাকিস্তানে চলে যান। জাতীয় পার্টির অফিসের পূর্বে সেখানে ছাত্রাবাসও স্থাপন করা হয়েছিল।
বিরেনের চপের দোকান
দোকানের নামের জন্য নয়; সিঙ্গাড়া ও চপের জন্য বিরেন প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেন। গণকপাড়া নিবাসী বিরেন্দ্রনাথ সরকার গত শতাব্দির পঞ্চাশ/ষাটের দশকে অলকার মোড়ে রাজশাহী চেম্বার অব্ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পূর্ব পাশের রোডের পূর্ব পাশে ছোট একটা টিন শেডে চা, সিঙ্গাড়া ও চপ বিক্রি শুরু করেছিলেন। বিরেন ১১.১.২০০৯ তারিখে পরলোক গমন করলেও দোকানটি এখনও সেখানে আছে। তবে গত শতাব্দির আশির দশক থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিরেনের দোকান স্মৃতি সিনেমা হল (তৎকালীন নাম) চত্বরে স্থানান্তারিত হয়েছিল। বর্তমান দোকানটি চালায় বিরেনের দুই ছেলে স্বপন সরকার (৪৬) ও তপন সরকার (৩৮)। তাঁদের মতে, দোকানের শুরুতে একটা চপের দাম ছিল ৬ আনা ও ১টা সিঙ্গাড়ার দাম ছিল এক আনা। বর্তমানে একটা মাংসর চপের দাম ২০ টাকা ও ১টা সিঙ্গাড়া ৩ টাকা। এখানে লুচি, চপ, সিঙ্গাড়া, চা বিক্রি হয়। তবে পূর্বের মত ব্যবসা চলে না।
 

পুরি ভাজারত অবস্থায় বিরেন্দ্রনাথ সরকারের ছেলে স্বপন সরকার, অলকার মোড় (ছবি- ২০১১)

রাণীবাজার রেস্টুরেন্ট
বাটার মোড়ের পূর্ব পাশে এ রেস্টুরেন্টটি অবস্থিত। গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে রেস্টুরেন্টটি স্থাপিত হলেও স্বাধীনের পর জিলাপির জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। জনমুখে বাটার মোড়ের জিলাপি নামে পরিচিত। ১৯৮০ সালের দিকে এক সের জিলাপি বিক্রি হতো ১২ টাকায়। ২০১০ সালে ৮০ টাকা কেজি। জিলাপি ছাড়াও এখন চা ও ঈদের সময় লাচ্চা সেমাই বিক্রি হয়। বর্তমান শরীক শামিমের তথ্যানুযায়ী, রেস্টুরেন্টের প্রতিষ্ঠাতা দাদা তমিজ উদ্দিন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হলে তাঁর ছেলে সোয়েব উদ্দিন মালিক হন এবং ২০০২ সালে সোয়েব উদ্দিন মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পুত্রগণ মালিক হয়েছেন।
বিদ্যুৎ হোটেল
প্রতিদিনই নদীর পাবদা, বাছা, কৈ, শিং ইত্যাদি মাছের তরকারি বিক্রয় এ হোটেলের বিশেষত্ব। সাহেব বাজার বড় মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে শ্রী অদিত কুমার ঘোষ ১৯৭৩ সালে স্থাপন করেন। প্রায় ৫ বছর আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ভাড়া নিয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে হোটেলটি পরিচালনা করছেন ফুদকিপাড়া নিবাসী মো. আমানুল্লাহ খান। পুরনো বিদ্যুৎ হোটেলের পশ্চিম পাশে একই মালিক বিদ্যুৎ হোটেল নামেই আর একটি হোটেল পরিচালনা করছেন। সেখানকার ম্যানেজার আমানুল্লাহ খানের ভাগ্নে মো. সেলিম খান শওকত। বিদ্যুতের পূর্বে সেখানে কুস্তরি নামে একটি হোটেল ছিল।
বিন্দু হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট
কাদিরগঞ্জ নিবাসী বানী আমিন তাঁর স্ত্রী হালিমা খাতুনের মালিকানায় ১৯৭৯ সালে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান চত্বর বা তৎকালীন রেলগেট গোরহাঙ্গা মোড়ের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণায় বিন্দু হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট স্থাপন করেছিলেন। তবে বিন্দুর মতে, প্রথমে সেখানে আটামিল ও রেশনের দোকান স্থাপন করা হয়েছিল। বানী আমিন শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের বংশধর। ১৯৮১ সালে সেখানে আটামিল ও রেশনের দোকান তুলে দিয়ে স্থাপন করা হয় একটি খাবার হোটেল। হোটেলের নাম দেয়া হয় বিন্দু হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট। সে সময়ের নবজাত একটি শিশুর নামানুসারে বিন্দু শব্দটি আসে। বিন্দু বানী আমিনের বড় ছেলের সন্তান। বিন্দুর পুরো নাম আবুল বাসার মো. তাজউদ্দীন। ডাক নাম বিন্দু। তাঁর প্রকৃত জন্ম ১৯৮১ সালের ২০ ডিসেম্বর। বর্তমানে বিন্দু রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগের কর আদায় শাখায় উপ ট্যাক্সেশন কর্মকর্তা পদে কর্মরত আছেন। সে সময়ের অনেকটা আধুনিক মানের রেস্তোরাঁটি অল্প দিনের মধ্যেই রাজশাহীবাসীর কাছে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিল। ফলে মোড়টি বিন্দুর মোড় নামেও খ্যাতি অর্জন করে। বিন্দু নামের রেস্তোরাঁটি এখনও আছে। তবে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক মোড়টি প্রশস্তকরণের কারণে ২০০৭ সালে হোটেলের ভবনটি ভাঙ্গা পড়ে। ফলে বিন্দু হোটেল দক্ষিণ পাশের রিলাক্র আবাসিক হোটেলের নিচ তলায় স্থানান্তরিত হয়। 
বর্তমান হোটেল ভাড়া ভবনে চলছে। বিলুপ্ত ভবনটি ছিল তিনতলা ও নিজের। নিচতলায় ছিল হোটেল। দোতলায় হোটেল নির্মাণের অনেক পরে শিমুল ভিডিও স্থাপন করা হয়েছিল। তিন তলায় ছিল রান্নাঘর। বিন্দু হোটেলের মালিক হালিমা খাতুন ও বানী আমিনের মৃত্যুর পর তাঁদের ৫ ছেলে রেস্তোরাঁটির মালিক হন। ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে বিন্দুর তথ্যানুসারে দোকানটি এখনও হালিমা খাতুনের নামেই আছে। এখানে খাজুরের গুড়ের সন্দেশ বিক্রি হয়। এক সময়ে এখানকার দধিয়া সন্দেশের সুনাম ছিল। সম্প্রতি নগর ভবনের পশ্চিম পাশে বিন্দু-২ নামে আর একটি হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে।৭৩৫ 
বিরিয়ানি হাউজ
বড় মসজিদের পশ্চিম-দক্ষিণ পাশে এ হোটেলটি স্থাপন করেছিলেন ভুবনমোহন পার্কের পিছনের বাসিন্দা বর্তমান রামচন্দ্রপুর নিবাসী এম এ মান্নান হিরা। দোকানটি ভাড়াঘরে স্থাপিত হয়ে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। এর প্রধান আইটেম ছিল কাচ্চি ও মোরগ বিরিয়ানি। হিরার মতে, এ দোকান থেকেই রাজশাহীতে প্রথম প্যাকেটে খাবার সরবরাহ শুরু হয়।
টি বাঁধের খাবারের পসার
মহানগরীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনোদন কেন্দ্র পদ্মার তীর ও টি বাঁধ। প্রমত্তা পদ্মার রাগিনী রূপ না থাকলেও রোদেলা বিকেল থেকেই পদ্মার তীরে মানুষের ঢল নামে। আর তীরের সবচেয়ে জনাকীর্ণ এলাকা টি বাঁধ। নগর সভ্যতার কৃত্রিম খাঁচা থেকে নগরবাসী এখানে পেতে  আসে প্রকৃতির নির্মল বায়ু, আলো। আর দেখে দিগন্তের সবুজ, বর্ষায় পদ্মার ঊর্মিমালা। রুচির সঙ্গে মিল রেখেই অনেকটা প্রাকৃতিক খাদ্য প্রকরণের পসার বসে বাঁধের দিঘল গায়ে। এক সময় শুধু ছিল বাদাম, শশা,  পেয়ারা, কামরাঙ্গা, বিলেতি আমড়া ইত্যাদি। নব্বই এর দশক থেকে তার সাথে এসেছে চটপটি, ফুচকা, হালিম ইত্যাদি। এ খাবারগুলো এসেছে মূলত ঢাকা থেকে। এ সব খাবারের ভ্রাম্যমান দোকানগুলোর সারি সারি লাল-সবুজের চেয়ার-টেবিল পদ্মার তীরের নতুন আদল এনে দিয়েছে। সুবিধা এনে দিয়েছে প্রকৃতি বিনোদনপ্রেমী মানুষের। তাঁরা এখন সুন্দর আসনে বসে খেতে খেতেই প্রকৃতির কাছে নয়ন জুড়াতে পারে। 
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd