অধ্যায় ১৯: জীবনযাত্রা

রাজশাহীর কয়েকটি বিশেষ খাবার


(২০০৯-২০১০ সালে সংগৃহীত তথ্য)

কলাইয়ের রুটি
রাজশাহীর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী খাবার কলাইয়ের রুটি। দেশ স্বাধীনের পর সত্তর দশকেই রাজশাহী শহরে ও বাংলেদেশে কলাইয়ের রুটি বিক্রির সূচনা হয়। পূর্বে নিম্ন আয়ের শ্রমিক শ্রেণির মানুষ কলাইয়ের রুটি কিনে খেলেও এখন সব পেশার মানুষের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মহানগরীর সব এলাকাতেই ফুটপাতে খুপড়ি মত অথবা ছোট কলাইয়ের রুটির দোকান আছে। বর্তমানে রেস্টুরেন্টের মতো উন্নত আয়োজনে কলাইয়ের রুটির দোকানের সংখ্যার ক্রম বৃদ্ধি ঘটছে।

রাস্তার পাশে কলাইয়ের রুটির দোকান (ছবি- ২০১১)

মতিমালা
বাংলাদেশে মতিমালার উৎপত্তি ঘটে রাজশাহীতে। শিরোইল কলোনি নিবাসী দিন মোহাম্মদ ১৯৪৭ সালের পর ভারতের নাগরপুর থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন মতিমালা। চিনি, লেবু, গোলাপি রং হাড়িতে জাল দিয়ে মতিমালা তৈরি ও বিক্রি করা শিখেছিলেন নাগপুরের দরবার আলীর কাছ থেকে ১৫/১৬ বছর বয়সে। দিন মোহাম্মদ বাঁশের লাঠিতে মতিমালার আঠালো মণ্ড পেঁচিয়ে বিশেষ ভঙ্গি ও কথায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। তবে ব্যবসা জমাতেন সাধারণত বিভিন্ন স্কুলের গেটে। খুচরা পয়সা, কাগজের টাকা যে যার মত চায়লেই সাইকেল, ঘড়ি, মালা প্রভৃতি বানিয়ে দিয়ে দিতেন। পেশার কারণে আসল নামটিকে ছাপিয়ে তিনি সবার কাছে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেন মতিমালা নামে। তাঁর ভাষায় তিনি দেশের সব জেলায় ঘুরেছেন এবং সব জায়গাতেই শিষ্য তৈরি করেছেন।
হজমিদানা
কালো শরীরের উপর কালো পোশাক, কালো চশমা, কালো চোঙ্গা টুপি, মুখে কালো চোঙ্গা লাগিয়ে মজার বুলি আউড়িয়ে হজমিদানা নামে এক ধরনের মুখরোচক খাবার বিক্রি করতেন জনৈক ব্যক্তি। তাঁর খাবারের রঙ ও কালো ছিল। অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনি সবার কাছে  হজমিওয়ালা নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। শিশুদের কাছে তাঁর বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। লোকমুখে জানা যায়, তিনি পূর্বে বিহারের অধিবাসী ছিলেন। 
ঘটিগরম
জনৈক ফেরিওয়ালা বিশেষ পদ্ধতিতে ঘটি গরম শ্লোগান দিয়ে এক ধরণের চানাচুর বিক্রি করতেন। টিনের ভিতর চানাচুর থাকত ও চানাচুরের ভিতর বসানো থাকত আগুনসহ তামার ঘটি। চানাচুর গরম রাখার উদ্দেশ্যেই এ কৌশল। ব্যতিক্রম কৌশলের জন্য তিনি শহরবাসীর নিকট বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন। ঘটিগরম এখনও বিক্রি হতে দেখা যায়। 
খাজা

খাজা ও চিনির কদমা

রাজশাহীতে খাজা তৈরি ও বিক্রি হয় ব্রিটিশ আমল থেকে। সে সময় খাজা লন্ডনেও যেত।
বাংলাদেশে খাজার উৎপত্তি ঘটে চাঁপাই নবাবগঞ্জের লাহারপুরে। লাহারপুরের খাজার কারিগর শাহাপদ ও স্বপনের তথ্যানুসারে আনুমানিক দেড়শ/দুশ বছর পূর্বে লাহারপুর নিবাসী রমনী প্রথম খাজা আবিস্কার করেন। বর্তমানে লাহারপুরে ৫৫ ঘর বসত আছে। যারা সবাই খাজার কারিগর। মহানগরীর কোর্ট স্টেশন, গোরহাঙ্গা, নিউমার্কেট প্রভৃতি স্থানে খাজা তৈরি হয়। এক সময় দেবেনের খাজা প্রসিদ্ধ ছিল। সাহেব বাজারের ওমর আলি প্রায় ৫০ বছর যাবৎ খাজা বিক্রি করেন। তাঁর মতে, দেবেন প্রায় ৭০/৮০ বছর পূর্বে কাদিরগঞ্জে খাজা তৈরি শুরু করেন । বর্তমানে মহানগরীর প্রায় সব এলাকাতেই বেশির ভাগই ফুটপাতে দোকান সাজিয়ে খাজা বিক্রি হয়। 
কটকটি
কটকটি এসেছে বগুড়া থেকে। গুড় আটার হালুয়ার মত এক ধরনের জমাট মটমটে খাবার। এতে বাদামও দেয়া থাকে। সাধারণত জুতা, স্যান্ডেল,লোহা, ভাঙ্গা কাচ, প্লাস্টিকের বদলে ফেরিওয়ালারা বিক্রি করে। ফেরিওয়ালা কাঁধে বাহুকের দুপাশে ঝাঁকায় একপাশে থাকে কটকটি। আর একপাশে থাকে বদলানো জিনিস। তবে তাঁরা নগদ টাকায়ও বিক্রি করে। বাচ্চাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কটকটিসহ বিভিন্ন ফেরিওয়ালারা এক সময় ডুগডুগি বা পিতলের ঘন্টা বাজাত। তাঁরা এখন আর ডুগডুগি, ঘন্টার বদলে প্লাটিকের বোতল ব্যবহার করে।   
বারোভাজা
ভাজা বুট, সিদ্ধ বুট, ভেজা ব্টু, মটর ভাজা, মুড়ি, মুলা, সরিষার তৈল, পিঁয়াজ, লবণ, কাঁচা মরিচ, শুকনা মরিচের গুঁড়া, ধনেপাতা বিভিন্ন ধরনের মসলা ইত্যাদি টিনের বা প্লাস্টিকের কোটায় ঢুকিয়ে উল্টাপাল্টা বাড়ি দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে বারভাজা তৈরি করা হয়। বিনোদনমুলক জায়গা, স্কুলের গেট ও জনাকীর্ণ স্থানে সাধারণত কাঠের স্ট্যান্ডের উপর বারভাজাওয়ালা পসার বসান। পূর্বে মাথায় ভ্রাম্যমান হতো। বর্তমানে চাকা ব্যবহার হতে দেখা যায়। বারভাজা রাজশাহীর স্থানীয় মুখরোচক খাবার।

বারোভাজার দোকান

কলাইয়ের বড়া
কলাইয়ের মণ্ডর সঙ্গে কালো জিরা, হিং এর পানি, সুজি, চালের আটা, আদা, রসুন শুকনা-কাঁচা মরিচ, পিঁয়াজের বেরেস্তা ইত্যাদি মিশিয়ে তেলে ভেজে কলাইয়ের বড়া তৈরি করে লিট্টির পাশাপাশি বিক্রি করতেন কালি চরণ ও তাঁর ছেলে মদন কুমার সাহা। কালি চরণ কলাইয়ের বড়া তৈরি শিখে এসেছিলেন ভারতের ভাগলপুর থেকে।  
হাওয়াই মিঠাই বা দিল্লির নাড়ু
হাওয়াই মিঠাই এর আর এক নাম দিল্লির লাড্ডু। তবে প্রকৃত নাম হাওয়াই মিঠাই। পূর্বে টিনে করে বিক্রি হতো। স্বাধীনের পর দশ পয়সায় একটা ছোট্ট গোল্লাকৃতির দিল্লির নাড়ু পাওয়া যেত। টিনের একপাশে কাচ থাকায় সহজেই দেখা যেত। আর বাচ্চাদের সজাগ করার জন্য ফেরিওয়ালা ঘন্টা বাজাত। এখন পলিথিনের মধ্যে বড়াকৃতির দিল্লির নাড়ু দশ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।
ধুপি
ভাপা পিঠার আঞ্চলিক নাম ধুপি। শীত মৌসুমে রাজশাহীর জনপ্রিয় খাবার। শীতের সকালে রোদ ছাড়ানোর পূর্বেই বেশির ভাগ খুদে শিশু ব্যবসায়ীরা মাথায় গরম ধুপির ঝাঁকা নিয়ে হাঁক ছাড়ে, ‘এই.... ধুপি গরেম’। এছাড়া মহানগরীর সব মহল্লার মোড়ে মোড়ে সকালে এবং সন্ধ্যা থেকে অনেক রাত পর্যন্ত ধুপি বিক্রি হয়। ধারণা করা হয়, নগরীর পশ্চিমাঞ্চলের গুড়িপাড়ার মানুষ প্রথমে ধুপি বিক্রির প্রচলন ঘটান।  

রাস্তার পাশে ধুপির দোকান (ছবি- জানুয়ারি ২০১৭)

বাদাম ভাজা
বারভাজার মতই বাদাম খুব জনপ্রিয় খুদে ব্যবসা। বিনোদন কেন্দ্র, সিনেমা হল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যে কোন মোড়ে বাদামওয়ালারা বেশি থাকে। এ সব খুদে ব্যবসায়ীর বেশির ভাগই কিশোর।  

ভ্রাম্যমান বাদাম বিক্রেতা। ছোট আকৃতির বাদাম ভাজা বিক্রির দোকানও আছে (ছবি- জানুয়ারি ২০১৭)

কদমা
গুড় আটার মন্ড থেকে তৈরি মার্বেল আকৃতির এক ধরনের শক্ত খাবার। এর উৎপত্তি সম্ভবত রাজশাহীতেই। শিশুদের প্রিয় খাবার। পান-বিড়ির ছোট ব্যবসায়ীরা কাচের বৈয়ামে রেখে বিক্রি করে। শিরোইল কলোনী নিবাসী রবিউল ইসলামের মতে ব্রিটিশ আমল থেকেই রাজশাহীতে কদমা বিক্রি হয়।
সেরমল
মহরম উৎসবের মেলায় সেরমল ছিল আকর্ষণীয় খাবার। সোনাদিঘির মোড় ও কোর্টের পাশে বুলনপুর ঈদগাহ মাঠে মহররমের মেলা বসত। সেরমলের উৎপত্তি ঘটান ভারত থেকে আগত  শিয়া বংশোদ্ভুত মানুষ । 
লিট্রি
রুলি আটা, গমের আটা, কালো জিরা, হিং এর পানি, সরিষা বা সোয়াবিন তেল মিশানোর পর  খামির  করে পুরির মত তার ভিতর বুটের ছাতু, পিঁয়াজ, আদা, রসুন, মরিচ, সরিষার তেল, জয়ত্রী, সাহা জিরার গুড়া, আচারের তেল, লেবুর রস মিসানো মণ্ড পুরে তেলে ভেজে লিট্টি তৈরি করা হতো। এখন এত প্রকার মশলা ব্যবহার করা হয় না। বিহারের সুন্দরী বালা দাসী নামের এক মহিলা রাজশাহী এসে ১৯২৬/১৯২৭ সালে সাহেব বাজার গণকপাড়ার  গোলঘরের পাশে ফুটপাতে কাঠের ঢোপে লিট্টি বিক্রি আরম্ভ করেন। তাঁর স্বামী রামলাল সাহাও ব্যবসায় সাহায্য করতেন। রাস্তা নির্মাণের জন্য ঢোপ ভেঙ্গে দিলে ব্যবসা উঠিয়ে আনা হয় ভুবন মোহন পার্কের সামনের রাস্তার ডিকে বসাকের পূর্ব পাশে নিজস্ব বাড়ির সামনে। ১৯৬৫/৬৬ সালে সুন্দরী মারা গেলে ব্যবসার হাল ধরেন ছোট ছেলে কালি চরণ সাহা। পরে তাঁর ছেলে মদন কুমার ঐ দোকানেই লিট্টি বানানো শুরু করেন। তাঁর দুই বোন রানী সাহা ও মিনা সাহা তাঁকে সাহায্য করত। ২০০৫ সালে লিট্টির ব্যবসা তুলে দিয়ে কুন্দন সুজ নাম দিয়ে ঐ দোকানেই স্যান্ডেলের ব্যবসা আরম্ভ করেন। এখন ভুবন মোহন পার্কের সঙ্গে পশ্চিম দক্ষিণ পাশে মো. রহমত আলী ৩ বছর থেকে লিট্টি বানাচ্ছেন। বড় মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ পাশ দিয়ে দক্ষিণমুখী রাস্তার কোনায় কাসিয়া নামক জনৈক ব্যবসায়ী লিট্টি বানান। ২০০৯-২০১০ সালে একটা লিট্টির দাম ছিল ২ টাকা। 
দোসা
নানরুটির মত দেখতে এক ধরনের সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার। ২০০৬ সাল থেকে মনিবাজারে নানকিং ফুড কর্ণারে বিক্রি হচ্ছে। খাবারটি রাজশাহীতে নিয়ে এসেছেন এহসানুল হুদা দুলু। দুলুর মতে, রাজশাহী ছাড়া বাংলাদেশে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামে দোসা বিক্রি হয়।  
 


 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd