অধ্যায় ৪: প্রশাসনিক ইতিহাস ও অফিস

জেলা পরিষদ


বিলুপ্ত জেলা পরিষদ ভবন ও ভবনের ভেতরে দেয়ালে স্থাপিত শিলালিপি

স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়। রাজশাহীতে শিক্ষা বিস্তার, জনস্বাস্থ্য সেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৮৬ সালের অক্টোবরে সরকারি বেসরকারি ২২ সদস্যের সমন্বয়ে রাজশাহী জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছিল।১ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. এ.এইচ. রডক রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন এবং প্রথম ভাইস  চেয়ারম্যান ছিলেন মি. এল কেমিরেন। সদস্য ছিলেন সর্বজনাব সি.আর. মেরিয়েট, ই.এল.ল্যাঙ্গ, সি.বি. ওয়ালটন, এসজে এন্ড্রুজ, ডবলিউ জে. ডনেল, ডা. মরিশন, সৈয়দ তোফাজ্জল হোসেন, শাহ জহুরুল হোসেন, মৌ. মুহম্মদ তাহের, শ্রী ব্রজ গোপাল বাগচী, শ্রী কিশোরী মোহন চৌধুরী, শ্রীকালীনাথ চৌধুরী প্রমুখ। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকার বলে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হতো। ১৯১১ সালে জেলা পরিষদের সদস্য ছিল ২৩জন। ৫জন ছিল পদাধিকার বলে, ১১জন নির্বাচিত ও ৭ জন মনোনীত সদস্য। পরে স্বায়ত্তশাসিত আইন সংশোধন করে বেসরকারি সদস্য পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার নিয়ম করা হয়। ১৯২০ সালের এপ্রিলে এমাদুদ্দীন আহমদ  জেলা পরিষদের (District Board) প্রথম বেসরকারি চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে রাজা বিএন রায়, পিএন রায়, মৌ. মনিরুদ্দীন আকন্দ, বিএল আব্দুস সামাদ চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর বেসরকারি চেয়ারম্যান পদের বিলুপ্তি ঘটে এবং ১৯৫৮ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খান মুহম্মদ শামসুর রহমান (C.S.P) বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অতঃপর সামরিক শাসনামলে ডিস্টিক্ট বোর্ড আইনের সংশোধন করে বেসরকারি চেয়াম্যান পদের পরিবর্তে সরাকরি এবং ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড নামের পরিবর্তে District Council রাখা হয়। সে অনুসারে ১৯৫৯ সালের ১১ জুলাই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শামসুর রহমান (খান মুহম্মদ) পদাধিকার বলে চেয়ারম্যানের শপথ গ্রহণ করেন। District Council এর সদস্য ছিল ৪৬ জন। ২৩ জন সরাকারি ও ২৩ জন মনোনীত বেসরকারি সদস্য। পরবর্তীতে ডেপুটি কমিশনার মুহম্মদ মুজিব-উল-হক (C.S.P ), ডেপুটি কমিশনার পিএ নাজির (C.S.P ) District Council এর সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জেলা প্রশাসক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে এ কমিটি বাতিল করা হয় এবং জেলা প্রশাসক কিছু দিন প্রশাসক ও পরবর্তীতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন ১৯৮৮ এর আওতায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য মনোনয়ন দেয়া হয়।
জেলার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য জেলা পরিষদের প্রতিনিধি সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর পরিষদ বাতিল ঘোষিত হলে জেলা প্রশাসক ১৩ জুন ১৯৯১ সাল পর্যন্ত অস্থায়ী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে। স্থানীয় সরকার বিভাগের ১১ জানুয়ারি ২০০১ তারিখের প্রজেই-৪/জেপ-৬৭/৯৪/৭৮(১৩৪)নং প্রজ্ঞাপন মোতাবেক  জেলা পরিষদে একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপ-সচিব) পদ সৃজনের পর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নির্বাহী কাজ পরিচালনা করছে।  ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোহাম্মদ আলী সরকার।৭৯১ ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখ মঙ্গলবার তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।৭৯২ 
রাজশাহী জেলায় মোট ৯টি উপজেলা ও মেট্রোপলিটন এরিয়াই ৪টি থানা আছে। জেলা পরিষদের প্রশাসনিক এরিয়া এ ৯টি উপজেলা পরিষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ভবন: রোড সেস আদায়ের জন্য ১৮৭৪-৭৫ সালে জেলা পরিষদ ভবনের দক্ষিণাংশে বাঁশ ও টালী দিয়ে চৌচালা একটি কাঁচা-পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। এ ঘরেই জেলা পরিষদের কার্যক্রম শুরু হয়।১ জেলা বোর্ড গঠন হবার পর ১৮৯৬-৯৭ সালে ৫২৪৫ টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মিত হয়। রাজশাহী কোর্ট চত্বরে ০.৩৩ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনের ২২টি কামরা ছিল।
ভনটির জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়ার কারণে ভেঙ্গে ফেলে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের পর ২০১০ সালে বিক্রি করে দেয়া হয়। ভবনটি এখন নেই। সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। জেলা পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অফিস কোর্ট মসজিদের দক্ষিণে বুলনপুরে জেলা পরিষদের স্টাফ কোয়ার্টারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে পোস্ট অফিসও যায়। মাহবুব জামান ভুলু প্রশাসক নিয়োগ হবার পর জেলা পরিষদের অফিস শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার পূর্বপাশ সংলগ্ন ৩নং ডাকবাংলোই স্থানান্তর করা হয়েছে।৪৩৫ 
৮ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য প্রণীত প্রকল্প অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। এর ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

সম্পত্তি বিবরণ
(জেলা পরিষদের ১৬ আগস্ট ২০০২ তারিখের প্রতিবেদন ও ২০১৪ সালের উন্নয়ন পরিক্রমা অনুযায়ী) 
ডাকবাংলা

১নং ডাকবাংলা বর্তমান আরএমপির সদর দপ্তর

ডাকবাংলা ১২টি। এগুলোর মোট জমি ১২.৩৮ একর । ১নং ডাকবাংলা আর এমপির সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ৫ কামরা বিশিষ্ট এ ভবনটি ১৯০৬ সালে নির্মিত হয়। ৩নং ডাকবাংলাটি ভাড়ার মাধ্যমে জনৈক ব্যক্তিকে লিজ দেয়া হয়েছে।

মেডিকেল স্টোর (বর্তমানে অবলুপ্ত)
১টি। জমির পরিমাণ ৩.৪৪ একর। এ অবলুপ্ত মেডিকেল স্টোরটি সোনালী ব্যাংক, রাজশাহী কোর্ট বিল্ডিং শাখা ভাড়া হিসেবে ব্যবহার করছে। 
১টি সচিবের বাসভবন (নির্মাণাধীন), ১টি সাবেক জেলা প্রকৌশলীর বাসভবন, ১৫টি পুকুর, মোট জমি ২১.৬৯ একর, ২টি লেক, মোট জমি ৩১ একর, মোট ৪.৪৯ একরের ৩টি দাঁড়া, ৬টি ফেরীঘাট, ১টি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট, ১টি প্রিন্টিং প্রেস (অব্যবহৃত) আছে।
মূক ও বধির বিদ্যালয়
মূক ও বধিল বিদ্যালয় ১টি। মূক ও বধির বিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট সোনাদিঘীর পশ্চিম পাড়ে পুরাতন সিটি ভবনের পিছনে ০.৯ একর আয়তন বিশিষ্ট একই চত্বরে অবস্থিত। ইনস্টিটিউট ১৮৯৭/১৮৯৮ সাল এবং বিদ্যালয়টি ১৯৩১ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। বিদ্যালয়টি বর্তমানে অবলুপ্ত। 

বাজার
বাজার ১টি। জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান মনির উদ্দিন আকন্দের নামানুসারে মনি বাজারটি সিঅ্যান্ডবি মোড়ে অবস্থিত। এর আয়তন ১.৫৪ একর। এতে ৫৪টি বিভিন্ন  ধরনের দোকান আছে। প্রতি বছর এখান থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আয় হয়।

অডিটোরিয়াম
রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তন নামে অডিটোরিয়ামটি মনিবাজারের মাঝখানে অবস্থিত। এর আসন সংখ্যা ১০৮টি। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের অর্থায়নে এর সংস্কার শেষে নতুনভাবে নামকরণ করা হয়েছে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান অডিটোরিয়ম। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে নতুন নামফলক উন্মোচন করেন। অডিটোরিয়মটি সংস্কারে ৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নে ৩ কোটি ২৩ লাখ, আধুনিক আসন স্থাপনে ৫৩ লাখ এবং বিদ্যুৎ ও সাউন্ড সিস্টেমে ৯৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।৭৮৪

জেলা পরিষদের রাস্তা
জেলা পরিষদের রাস্তা ২০টি। রাস্তাগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ১০৭৭ কি.মি। এর মধ্যে ১৩০ কি.মি. পাকা এবং ৯৪৭ কি.মি কাঁচা। রাস্তাসমূহের পাশে মোট ৩০.৩৮ একর জমি আছে। ব্রিজ- ৯৪টি, কালভার্ট- ১৬৪টি। লোকাল বোর্ডের (বর্তমানে জেলা পরিষদ) রাস্তা ছিল- ১৫২টি। এগুলোর পরিমাণ ৬৮৬.২০ একর। 
জনবল
রাজশাহী জেলা পরিষদে ১ জন প্রশাসক, ১ জন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ১ জন সচিব, ২ জন সহকারী প্রকৌশলী, ১ জন উপ-সহাকারী প্রকৌশলী, ১ জন ২য় শ্রেণির কর্মচারী রয়েছে। এছাড়া ১১ জন তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ডসার্ভে ইনস্টিটিউটে ২৫ জন, ডাক বাংলা ও সরাইখানাই ১৭ জন কর্মচারী আছে।৪৩৬
 

 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd