অধ্যায় ৪: প্রশাসনিক ইতিহাস ও অফিস

প্রাচীন শাসন আমল


প্রাচীন বাঙলার জনপদ-বিভাগ

রাজশাহী মহানগরীর চেয়ে রাজশাহীর ইতিহাস বহু প্রাচীন। হজরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর আগমনের পূর্বে এ মহানগরীর জীবন প্রবাহের কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। আবার মখদুম সাহেবের আগমনেরও সুনির্র্দিষ্ট সাল তারিখ নেই। এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তবে মতামত যায় থাক না কেন তিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীর পূর্বে আসেননি এটা সত্য। তাঁর জীবনী পড়লে এ মহানগরীর তৎকালীন রাষ্ট্রীয় অবস্থা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। সেকালে মহাকাল গড়ের (রাজশাহী মহানগরীর) রাজা অংশুদেও যে নরবলীসহ তান্ত্রিক প্রথা চালু রেখেছিল তা থেকে বোঝা যায়, এখানকার প্রশাসন ব্যবস্থা কোন সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না অথবা স্বাধীন ছিল। সে যুগের কত সাল পূর্ব থেকে এখানে মানব বসতি গড়ে উঠেছিল তার কোন দালিলিক প্রমাণাদি পাওয়া যায় না। ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী মহানগরী নদীর চরাভূমি থেকে উৎপত্তি হয়। বছরের পর বছর পদ্মা ও বিভিন্ন নদীর পলি মাটি জমে জমে এখানে চরের সৃষ্টি। এক সময় নগরীর মধ্যভাগ দিয়ে বারাহী নামক একটি নদীর অস্তিত্ব ছিল। বর্তমানে সেটি ১নং ড্রেনে রূপান্তরিত হয়েছে। অতঃপর এ চরাভূমিতে বিভিন্ন রকমের উদ্ভিদের জন্ম হয়ে বন-বাদড়ের জন্ম হয়েছিল। বর্তমানে যুগের প্রবীণগণের অনেকে এ বন-বাদাড়ের গল্প করেন।

প্রাচীন যুগে রাজশাহী মহানগরীর ভূমি কি অবস্থায় ছিল তা জানা না গেলেও নগরীর উপকণ্ঠের বরেন্দ্র ভূমি বহু প্রাচীন। গবেষকদের মতে এ ভূমি প্রায় ৬০ কোটি বছর আগের আর্কিয়ান যুগে পত্তন হয়েছিল। সুতরাং বরেন্দ্র ভূমিতে যুগে যুগে বিভিন্ন রাজবংশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা হয়েছে। রাজশাহী মহানগরীর অলিখিত বা অজানা ইতিহাস যুগও বরেন্দ্র ভূমির ইতিহাসেরই অন্তর্ভুক্ত। রাজশাহী মহানগরীর প্রাচীন ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে এ প্রাচীন বরেন্দ্র ভূমির খ্রিষ্ট পূর্ব চতুর্থ-তৃতীয় শতাব্দীর ইতিহাসই আলোচনা করতে হয়। তার পূর্বেও এখানে মানব সবতি গড়ে উঠেছিল। তবে সে আমলের শাসন প্রণালী সম্পর্কে লিখিত আকারের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। সেকালে এ বরেন্দ্র অঞ্চল পুণ্ড্রবর্ধনের একটা বৃহৎ প্রদেশ বা ভুক্তি ছিল। পুণ্ড্রবর্ধনের কেন্দ্রস্থল বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রী। মূলত বরেন্দ্রীর প্রাচীনতম নামই পুণ্ড্রবর্ধন।১ বরেন্দ্রী বা বরিন্দের দক্ষিণাংশের সীমান্তস্থিত ভূমি ভাগই রাজশাহী জেলা।১ এর পূর্বে করতোয়া, পশ্চিমে মহানন্দা, দক্ষিণে পদ্মা ও উত্তরে হিমালয় পাদদেশের টিরাইভূমি বেষ্টিত ছিল।১১৭ অন্য কথায় মোটমুটি এ রাজ্য জলপাইগুড়ি (ভারত), দার্জিলিং (ভারত) এবং পাবনা জেলার অংশ বিশেষ ব্যতীত বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল।২ ধারণা করা হয় প্রাচীনকালে পুণ্ড্রগণ এদেশ শাসন করতেন। খ্রিষ্টপূর্ব হাজার অব্দে রচিত ঐতিরীয় ব্রাহ্মণ নামক এক গ্রন্থে অন্ধ, সবর প্রভৃতি অধতঃপতিত জাতির সঙ্গে পুণ্ড্রদের নামও উল্লেখ আছে। মহাভারত ও হরিবংশ গ্রন্থ থেকে অবহিত হওয়া যায় পুণ্ড্র, অঙ্গ, বঙ্গ, সুস ও কলিঙ্গ অন্ধমনি দীর্ঘতমাঃর বংশোদ্ভূত (অসুর রাজ বালীর মহিষীর গর্ভজাত)। এদের নামানুসারে পাঁচটি দেশের নাম ছিল পুণ্ড্র, অঙ্গ, বঙ্গ, সুস ও কলিঙ্গ।৪ মহাভারত, হরিবংশ ও এদের অনুগামী পুরাণসমূহ বাসুদেব নামে একজন মাত্র পুণ্ড্র রাজার নাম উল্লেখ আছে। তিনি একজন শকিস্তশালী নরপতি ছিলেন। পুণ্ড্র নামে অভিহিত বঙ্গের বৃহত্তর অংশ তাঁর শাসনাধীনে ছিল। কথিত আছে বাসুদেব ভীম কর্তৃক বিজিত হয়। সুদেব নামক তাঁর এক পুত্র কৃষ্ণের চক্রাঘাতে নিহত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে পুণ্ড্রবর্ধন মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। বর্তমান বগুড়া শহরের ৭ মাইল উত্তরে মহাস্থানে এ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল।১১৭ খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডারের পাক-ভারত অভিযান সম্পর্কে মৌর্য সম্রাট বা চন্দ্রগুপ্তের রাজসভায় আগত গ্রীক দূত মেগাস্থিনিসের অনুস্মরণে এরিয়ান ডিও ডোরাস ও টলেমী প্রমুখের গ্রন্থে বাংলাদেশের যে প্রাচীন গঙ্গারাষ্ট্রের বিবরণ আছে, তা বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রথম সংবাদ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।১  
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য জৈন ধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং তিনি পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত কোটিবর্ষের এক ব্রাহ্মণপুত্র প্রবীণ ধর্মযাজক ভদ্রবহুর শিষ্য ছিলেন বলে কথিত আছে। অশোকাবদান গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বৌদ্ধ উপসনাকে ঘৃণা করার অপরাধে অশোক পুণ্ড্রবর্ধনে দিগম্বর সম্প্রদায়ের বহু জৈন সন্ন্যাসীকে হত্যা করেন।২
দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীতে এ অঞ্চল সম্ভবতঃ কুষাণ রাজবংশের শাসনাধীনে ছিল। ঐ যুগের কয়েকটি স্বর্ণমুদ্্রা উত্তরবঙ্গে ও পশ্চিম বাংলার হুগলী জেলার মহানাদ গ্রামে পাওয়া গেছে।২ বগুড়ার মহাস্থানগড়ে আবিস্কৃত একটি স্বর্ণমুদ্রার এক পিঠে কুষাণ রাজ কনিস্কের প্রতিমূর্তি আছে। কুষাণরা এসেছিলেন মধ্য এশিয়া থেকে। তাঁরা প্রাচীন পারসিক ভাষায় কথা বলতেন। তাঁদের ভাষায় বোরিন্দ মানে উচুঁ। উত্তরাঞ্চলের লাল মাটির অঞ্চলকে এখনও বোরিন্দ বলা হয়।৪ বগুড়ার রায়কালী গ্রামে কুষাণ সম্রাট বাসুদেবের নামাংকিত একটি মুদ্রাও পাওয়া গেছে।১ তবে কুষাণ অধিকার সম্পর্কে জোরালো যুক্তি পাওয়া যায় না।
কুষাণরা পুণ্ড্রবর্ধন অধিকার করলে তাদের পতনের পর গুপ্তদের শাসন শুরু হয়।২ খ্রিষ্টীয় ৫ম শতাব্দী পর্যন্ত পুণ্ড্রবর্ধন গুপ্তদের অধীনে একটি ভুক্তি বা প্রদেশ ছিল। গুপ্তদের আদি বাসস্থান ছিল বাংলার উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে। পরবর্তীকালীণ গুপ্ত তাম্রশাসনসমূহ ও এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায়, বর্তমান রাজশাহী জেলাসহ সমগ্র উত্তর বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যের পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। গুপ্ত রাজবংশ শিথিলমূল হলে পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তিতে ধর্মাদিত্য (৫৫০-৫৬৫) সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করেন।১ তারপর রাজা গোপচন্দ্র (৫৬৫-৫৮৫ খ্রি.) রাজা সমাচারদেব (৫৮৫-৬০২ খ্রি.) গৌড় বঙ্গের স্বাধীন নরপতি এবং মহারাজাধিরাজ উপাধি লাভ করেন। যতদূর জানা যায়, দেবের রাজ্য শাসনের পরই শশাঙ্কদেব গৌড়ের রাজা হন এবং মহারাজধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি কান্যকুব্জ পর্যন্ত তাঁর রাজ্য বিস্তার করেন। রোটার্স গড়ের আবিস্কৃত লিপিতে তিনি শ্রীমহাসামন্ত শশাঙ্ক দেবস্য নামে উল্লিখিত আছেন। এ থেকে বোঝা যায়, শশাঙ্ক প্রথম জীবনে বোধ হয় গুপ্ত রাজ্যের মহাসামন্ত ছিলেন। তিনি ভাস্কর বর্মা ও হর্ষ বর্ধনের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হন এবং মগধ ও গৌড় (পুণ্ড্রবর্ধন) থেকে বর্তমান ভারতের পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদে (তৎকালীন রাঢ় দেশের কর্ণসুবর্ণ) আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন (৬১৯-৬২০ খ্রি.)। মৃত্যুপূর্ব দিনগুলো তাঁর খুব দুঃখে কেটেছিল।১
হর্ষ বর্ধনের রাজত্বকালে বিখ্যাত চীন পর্যটক হিউয়েন সাঙ (৬২৯-৬৪৫খ্রি.) ভারতবর্ষ ভ্রমণ করেন। তিনি তাঁর ভ্রমণ  বিবরণীতে রাজা শশাঙ্ককে কর্ণসুবর্ণের অধিপতি বলে উল্লেখ করেছেন। ৬৪২-৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পুণ্ড্রবর্ধন (মহাস্থান) পর্যটন করেন। তিনি রাজশাহীর দক্ষিণ সীমান্ত গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মধ্যবর্তী কোন এক স্থানে পদ্মা অতিক্রম  করে পুণ্ড্রবর্ধনে পৌঁছেছিলেন। তিনি পুণ্ড্রবর্ধনে ২০টি সংঙ্ঘারাম ও শতাধিক দেবালয় প্রত্যক্ষ করেন।১ 
রাজা শশাঙ্কের পরের ইতিহাস ছিল অরাজকতাপূর্ণ। তখন গৌড়, বঙ্গ, সমতটে কোন রাজার আধিপত্য ছিল না। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থা ছিল ছিন্ন ভিন্ন ও সর্বত্র বিশৃঙ্খলাপূর্ণ । সে সময় মৎস্যন্যায় নামে ইতিহাসে পরিচিত। অর্থাৎ বৃহতের অপেক্ষাকৃত ছোটকে গিলে খাওয়ার মৎস্যদের যে প্রবণতা, তাই হয়েছিল তখন এদেশের মানুষের অবস্থা। এ দুরাবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে গৌড় বঙ্গের কিছু সামন্ত প্রধানরা মিলিত হয়ে ব্যাপটের পুত্র গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেন। গোপালের পুত্র ধর্মপালের খালিমপুর লিপিতে তার উল্লেখ আছে।  তিনি প্রথমে বাংলার রাজা নির্বাচিত হলেও পরে মগধাদি অধিকার করেন। ৭৫০ খ্রি. হতে ১১৬০ খ্রি. পর্যন্ত পাল রাজবংশ রাজত্ব করেন।১ পাল রাজাদের রাজত্ব অনেকগুলি মণ্ডলে বিভক্ত ছিল। এর একটির নাম ছিল বরেন্দ্র। সন্ধ্যাকর নন্দির রচিত রাম চরিত কাব্যে গঙ্গার উত্তরে এবং করতোয়া ও মহনন্দা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বরেন্দ্র বলা হয়েছে। পাল রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন।৪ তাঁদের অনেক কীর্তি বৃহত্তর রাজশাহীতে এখনও বিদ্যমান। এগুলোর মধ্যে নওগাঁর পাহাড়পুর নামক স্থানে সোমপুর বিহারের ধ্বংসাবশেষ, রামাবতী, মহীসন্তোষ, জগদ্দল মহাবিহার, হলুদ বিহার, গরুড়স্তম্ভ উল্লেখযোগ্য।১
পালবংশের পর সেনবংশ রাজত্ব আরম্ভ করে। বিজয় সেন হলেন সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম রাজা। তিনি মদন পাল দেবকে বিতাড়িত করে গৌড়ের রাজা হন। দাক্ষিণাত্যের কর্ণাট দেশীয় চন্দ্র বংশীয় সামন্ত সেন বৃদ্ধ বয়সে রাঢ় দেশে সম্ভবতঃ গঙ্গার তীরে উপনিবিষ্ট হন। সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেন। আর হেমন্ত সেনের পুত্রই বিজয় সেন।১  বিজয় সেন প্রথমত বরেন্দ্র অঞ্চলের  দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে আধিপত্য বিস্তার করেন। তারপুত্র বল্লাল সেন এবং বল্লালের পুত্র লক্ষণসেন ১০৯৫-১২০৩খ্রি. পর্যন্ত গৌড় বঙ্গে রাজত্ব করেন।১ লক্ষণ সেন ছিলেন সেন বংশের শেষ রাজা। তিনি পাল বংেশের শেষ রাজা গোবিন্দ পালকে পরাজিত ও বন্দী করে মগধাদি অধিকার করেন। রাজশাহী মহানগরীর চৌদ্দ কিলোমিটার পশ্চিমে কুমারপুর ধ্বংসাবশেষের নিকট বিজয়নগর ধ্বংসাবশেষকে বিজয় সেনের রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হয়।১ রাজশাহী মহানগরীর সাত মাইল পশ্চিমে রাজা বিজয় সেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দেওপাড়া গ্রামের প্রদ্যুমেশ্বর শিবলিঙ্গ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ও একটি দিঘি আছে। 
সেন রাজারা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু। তাঁরা নিজেদের ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় হিসেবে দাবি করতেন। তাঁরা ব্রাহ্মণ হয়েও ক্ষত্রিয়দের মত যুদ্ধ করতে পারতেন। বল্লাল সেন দান সাগর, অদ্ভূত-সাগর প্রভৃতি গ্রন্থের রচনা ও গৌড় বঙ্গের ব্রাহ্মণ-কায়স্থগণের বর্ণ প্রথা প্রবর্তন করেন। তবে লক্ষণ সেন একজন বিদ্যোৎসাহী ও দানশীল রাজা ছিলেন।১    
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd