অধ্যায় ১৪: সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান

ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটি


ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটি 

রাজশাহী-ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটি 

২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস ও নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটির আনভেলিং সিরোমনি উপলক্ষে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটিতে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য সমৃদ্ধ একটি ১১০৫ বর্গফুটের স্থাপিত ম্যুরাল

ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটি (কেআরএফসি) ও রাজশাহী- ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটি (আরকেএফসি) দু’দেশের দু’নগরীতে পৃথক সময়ে এ নামেই গঠিত হয়। নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটিতে এর নাম ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটি (কেআরএফসি)। বাংলাদেশের রাজশাহী মহানগরীতে এর নাম রাজশাহী-ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটি (আরকেএফসি)। নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটি রাজশাহী মহানগরীর সিস্টার সিটি। ১৯৭৯ সালে ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী ফ্রেন্ডশিপ কমিটি গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধুত্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ইউরোপের মনোরম ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটিতেই এ কমিটি জন্ম লাভ করে। তবে এর ঐতিহাসিক ভূমিকা আরো পিছনের। ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটির সাংবাদিক অডভার মুনক্স গার্ড এ সংগঠনটি স্থাপন করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি রাজশাহীতে আসেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ ও যুদ্ধ পরিস্থিতির সংবাদ নরওয়েবাসীর কাছে পৌঁছানো। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রাজশাহীতে অবস্থান করে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রতি পাক বাহিনীর বর্বরতার প্রতিবেদন নরওয়ের পত্রিকায় প্রেরণ করতেন। ডা. প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাসের মতে, স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বাংলাদেশকে নরওয়ের স্বীকৃতি প্রদানেও তাঁর ভূমিকা ছিল। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন। দেশে ফেরার পর তিনি নিজ শহর  ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড ও রাজশাহীর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। এ চিন্তাধারার বশবর্তী হয়ে ১৯৭৯ সালে ক্রিস্টিয়ানস্যান্ডে একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির নাম দেয়া হয় ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটি (কেআরএফসি)। তিনি রাজশাহীতেও অনুরূপ কমিটি গঠনে সহায়তা করেন। 
অডভার মুনক্স গার্ড ছিলেন রাজশাহী খ্রিস্টিয়ান মিশন হাসপাতালের তৎকালীন সুপারিটেনডেন্ট ডা.ইউএন মালাকারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ডা.মালাকারের মাধ্যমে রাজশাহীতে ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ কমিটির কার্যক্রম শুরু হয়। তখন খ্রিস্টিয়ান মিশন হাসপাতালের মধ্যেই এর কার্যক্রম আবদ্ধ ছিল। স্থানীয় কমিটি বলতে কিছুই ছিল না। ওই সময়ে রাজশাহী শহরে শিশুদের সুচিকিৎসার বিশেষ কোন হাসপাতাল না থাকায় ডা. ইউএন মালাকারের অনুরোধে রাজশাহীতে ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটির আর্থিক সহযোগিতায় রাজশাহী খ্রিস্টিয়ান মিশন হাসপাতালে ১৯৭২ সালে একটি শিশু বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়।৬৫২ এরপর ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী ফ্রেন্ডশিপ কমিটির আর্থিক সহায়তায় রাজশাহী খ্রিস্টিয়ান মিশন হাসপাতালে একটি নার্সিং স্কুলও স্থাপিত হয় । ডা.ইউএন মালাকারের অবসর গ্রহণের পর রাজশাহী খ্রিস্টিয়ান মিশন হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে ডা.প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাস দ্বায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অডভার মুনকস গার্ড ১৯৮৭ সালে ডা. প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাসকে ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ কমিটির পক্ষ থেকে নরওয়েতে আমন্ত্রণ জানান। এ আমন্ত্রণের পর ডা.বিশ্বাস ১৯৮৯ সালে রাজশাহী-ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটি গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এর সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে প্রফেসর ডা. জুবাইদা খাতুন ও ডা.প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাস। 
কমিটি স্থাপনের পর ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটি প্রত্যক্ষভাবে রাজশাহী মহানগরী ও দেশের উত্তরাঞ্চলে উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতা করছে। যেমন-
১.     খ্রীষ্টিয়ান মিশন হাসাপাতাল, রাজশাহীতে শিশু ওয়ার্ড ও সিনিয়র নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন।
২.    এসিডি, রাজশাহীকে অনুদান প্রদান।
৩.    রাজশাহী ক্যানসার হাসপাতালের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ।
৪.     বারোইপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজশাহী স্থাপন।
৫.     সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জন্য ১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন।
৬.     দিনাজপুর ও গাইবান্ধা জেলায় স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন।
৭.     বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য রাজশাহীতে সেবা কেন্দ্র স্থাপন।
৮.     প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য রাজশাহীতে তরী ফাউন্ডেশনে সহযোগিতা প্রদান।
৯.    ফাউন্ডেশন ফর য়ুম্যান এন্ড চিলড্রেন অ্যাসিস্টেনস (এফডব্লুসিএ), রাজশাহীকে সহযোগিতা প্রদান।
ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটি এবং রাজশাহী সিটির এ সহযোগিতা আরো বৃদ্ধির লক্ষে উভয় সিটির মেয়র ২০১১ সালে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন। সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে উভয়ের সম্পর্কে উত্তোরত্তোর বৃদ্ধির জন্য প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজশাহী মহানগরীর পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষে ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটি ৫৪ লাখ টাকা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনকে অনুদান দিয়েছে। এ অনুদানের সিংহভাগ এসেছে ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটির কয়েকটি স্কুলগামী ছাত্রদের টিফিনের সঞ্চিত অর্থ থেকে। 
বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস ও নরওয়ের  ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটির আনভেলিং সিরোমনি উপলক্ষে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটিতে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য সমৃদ্ধ একটি ১১০৫ বর্গফুটের ম্যুরাল স্থাপন করেছে। ম্যুরালটি উন্মোচন করেন ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটির মেয়র অরভিড গ্রুন্ডেজন ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। মানবতাবাদী সাংবাদিক অডভার মুনক্স গার্ড এর অমর কৃতিত্বের স্মারক স্বরূপ রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ সন্ধ্যায় বড়কুঠি বিনোদন কেন্দ্রের নামকরণ করেছে অডভার মুনক্স গার্ড পার্ক। ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটির মেয়র অরভিড গ্রুন্ডেজন ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এ পার্কের নামফলক উদ্বোধন করেন। 
পার্কটি অডভার মুনক্স গার্ড নামকরণে কয়েকজন মানুষের কৃতিত্ব চলে আসে। সর্ব প্রথম নগর ভবনে সচিব কেএম আব্দুস সালামের কক্ষে মহানগরীর বিভিন্ন চত্বর ও সড়কের নামকরণের জন্য গঠিত কমিটির এক সভায় তৎকালীন সহকারী জনসংযোগ কর্মকর্তা (অস্থায়ী) মো. আনারুল হক (আনারুল হক আনা) প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামাণিকের পরমর্শে অংশ গ্রহণ করেন। উপরোক্ত ব্যক্তিদ্বয় ছাড়া নামকরণ কমিটির সদস্য আকবারুল হাসান মিল্লাতও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ঐ সভায় আনারুল হক আনার কয়েকটি প্রস্তাবের মধ্যে ছিল টিবির মোড় চত্বরের নাম অডভার মুনক্স গার্ড ও রাজশাহী সিটি চার্চের সামনের গ্রীন গার্ডেনের নাম রেভারেন্ড বিহারীলাল সিং গার্ডেন। তাঁর প্রস্তাব সভা গ্রহণ করে। এর কিছুকাল পর ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটির সদস্যবৃন্দসহ ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটির মেয়র অরভিড গ্রুন্ডেজন এর রাজশাহী আগমন উপলক্ষে আনা তৎকালীন প্যানেল মেয়র-১ ও ১২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সরিফুল ইসলাম বাবু ও প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল হককে কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে টিবির চত্বরটিকে অডভার মুনক্স গার্ড চত্বর নাম দিয়ে উভয় সিটির মেয়রের মাধ্যমে ফলক উন্মোচনের প্রস্তাব দেন। তাঁরা এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন ও প্রধান প্রকৌশলী স্থানের পরিবর্তন করে বড়কুঠিতে নির্মিত পার্ককে অডভার মুনক্স গার্ড নামকরণের কথা বলেন। তাঁর পরামর্শ মোতাবেক বড়কুঠির পার্ক অডভার মুনক্স গার্ড পার্ক নামকরণ হয়। যা ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখ সন্ধ্যায় একটি ব্যানার টাঙ্গিয়ে উন্মোচন করা হয়েছিল। ব্যানারটিতে পরিচয়সহ অডভার মুনক্স গার্ড এবং মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও মেয়র অরভিড গ্রুন্ডেজন এর ছবি অংকিত ছিল। নগর ভবনের অ্যানেক্স ভবনের ৩য় তলায় নব নির্মিত ৩৬৫২ বর্গফুটের সিটি হলে ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটির মেয়র মি. হ্যারাল্ড ফুরে (Mr. Harald Furre) ও ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী সিটি ফ্রেন্ডশিপ কমিটির সদস্যদের সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন মেয়র (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. নিযাম উল আযীম।৬১৯


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd