অধ্যায় ১৩: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান

ধর্ম


রাজশাহী সাম্প্রাদায়িক সম্প্রীতির মহানগরী। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক এখানে যেমন নিজ নিজ সংস্কৃতিতে ধর্মীয় কর্ম পালন করে, তেমনি পারস্পরিক সৌহার্দ্যতার সামাজিক বন্ধন  তৈরি করেছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বৃহৎ বৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোয় পারস্পরিক নিমন্ত্রণের উপস্থিতি চোখে পড়ে। মুসলমানদের প্রধান উৎসব দুই ঈদের আনন্দে হিন্দু, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা ভাগ বসাতে আপত্তি করে না। আবার বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবে নগরীতে যখন আনন্দের বন্যা বয়, তখন মুসলমানরাও তাদের আনন্দে এক হয়ে যায়। খ্রিষ্টানদের বড়দিন কিংবা অন্যান্যদের  ক্ষেত্রে ও একই অবস্থা লক্ষণীয়। 
ব্রিটিশ আমলে পশ্চিম থেকে আগত হিন্দুদের স্থাপিত গুপিনাথের আখড়া, হনুমানজির আখড়া ও লালজির আখড়ায় রামলিলা হতো। সরস্বতিপূজা বেশ জাঁকজমকভাবে পালন হতো। শহরে চার-পাঁচ শ  সরস্বতি প্রতিমার মিছিল বের হতো। তুলনামূলকভাবে দুর্গা পূজার আয়োজন কম হলেও বিভিন্ন রকমের আমোদ-প্রমোদ অনুষ্ঠিত হতো। এ পূজা উপলক্ষে থিয়েটার, যাত্রা, কবি পাচালি, তপ, ছন্দ, গানে সে সময়ের উৎসব মুখর হয়ে উঠতো। ৩০ আশ্বিন রাখি পূর্ণিমার দিন কংগ্রেস কর্মীরা আনুষ্ঠানিকভাবে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করতেন। সেদিন তাঁরা গায়তেন, সই আদরে বেঁধে রই পরানে পরানে.....।৬৮২
 
মাহবুব সিদ্দিকীর শহর রাজশাহীর আদিপর্ব গ্রন্থে রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রবন্ধে ফজর আলি খাঁন (১৮৯৫-১৯৮০) লিখেছেন,  ‘মুসলমানদের মহরমের সময় দশ দিন ধরিয়া ডাঙ্কা (ঢোল) বাজিত, কুস্তি, লাঠিখেলা, তলোয়ার ছোরা পাট্টার কৌশল ও খেলা দেখাইত। জারি মর্সিয়া কাসিদের মিছিল ও তাজিয়া ডোলা প্রভৃতি আখড়া বাহির হইত। মিঞাজানদের দল ও তুফানির দল প্রতিযোগিতা করিত এবং এই প্রতিযোগিতায় প্রায় বৎসরই মারামারি হইত। ১৯৪৮ সালে মুর্শিদাবাদের শিয়া সম্প্রদায় রাজশাহী আসিয়া  স্বাড়ম্বরে শানিত্মপূর্ণ ভাবে মহরমের মজলিস, জারি মিছিল বাহির করিতেন। স্থানীয় গ্রামবাসি কাসিদের “হায়-হোসেন” মিছিল বাহির করিত।’ 

এ ইমাম বাড়াটি রাজশাহী কোর্টের বুলনপুর ঈদগাহ মাঠের  দক্ষিণাংশে  স্থাপিত ছিলো। ২০১১ সালে এটিকে পূর্ব স্থানের দক্ষিণ পাশ সংলগ্ন বাঁধের দক্ষিণ পাশ সংলগ্ন একটি বাড়ির সঙ্গে দেখা যায়।

হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ). এ জীবনী পাঠ করলে অনুমিত হয় যে, তাঁর আগমনের পূর্বে এ নগরীর মানুষ তান্ত্রিক প্রথায় বিশ্বাসী ছিল এবং তখন এ জনপদের নাম ছিল মহাকালগড়। মহাকালগড়ে অমানবিক তান্ত্রিক প্রথা অনুযায়ী নরবলি দেয়া হতো। মহাকালগড়ের তৎকালীন রাজা অংশুদেও চান্দভ-ীবর্মভোজ ও তার ভাই অংশুদেও খেজ্জুর চান্দখড়গ বর্মগুজ্জ ভোজ দেবতার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নরবলিসহ তান্ত্রিক প্রথা পালন করতো। যে পাথরের উপর নরবলী দেয়া হতো হযরত শাহ্ মখদুম দরগা শরীফে এখনও তা সংরক্ষিত আছে। এ জঘন্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধেই হযরত শাহ্ মখদুমের আবির্ভাব ঘটেছিল এবং তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে মানবতার বিজয় নিশান উড়িয়েছিলেন। সে কালের মানুষ মহাকালগড়ের তান্ত্রিক রাজার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার কারণে হয়তো তাঁরা হযরত শাহ্ মখদুম (রহ.)কে পরম শ্রদ্ধায় গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর নিকট দীক্ষা গ্রহণ ও ইসলাম ধর্মের সম্প্রসারণ করেন। এরপর অষ্টাদশ শতাব্দীতে মহাজেরদের আগমনের ফলে মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে ব্যবসা, শিক্ষা প্রভৃতি সুবিধার কারণে বিভিন্ন জেলা থেকে মুসলমানদের আগমনে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি লাভ করে। ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান বিভক্তির ফলে হিন্দুদের সংখ্যা আরো ব্যাপক হারে কমতে থাকে এবং মুসলমানদের  সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। বৃটিশ শাসনামলে শিক্ষা সম্প্রসারণ ও  জমিদারিত্ব রদবদলের কারণে এখানে মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে একটা মানসিক তফাৎ লক্ষ্য করা যায়। পাকিস্তান আমলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রভাব এ মহানগরীতেও ছিল। তবে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর সাম্প্রদায়িক বৈরিতা কখনই সৃষ্টি হয়নি। বরং সম্প্রীতির কথাই ভাবতে শিখেছে।

 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd