অধ্যায় ৩ : রাজশাহীর জমিদারি

তাহিরপুর জমিদারি


তাহিরপুর অঞ্চলের আফগান শাসক তাহির খানের নামানুসারে পরগণার নাম তাহিরপুর। বাংলার কথিত বার ভূঁইয়াদের মধ্যে দুটি ছিল রাজশাহী এলাকায়। একটি সাঁতুল অপরটি তাহিরপুর। রাজশাহী জেলার অন্তর্গত বাগমারা থানার ৫ মাইল পূর্বে তাহিরপুর অবস্থিত। বারনই নদীর পূর্ব তীরে রামরামা গ্রামে তাহিরপুর জমিদারের আবাস ছিল। পরে নদীর অপর তীরে রাজবাড়ি নির্মিত হয়। সমরপালের মতে, এ রাজবংশের প্রথম পুরুষ ছিলেন অষ্টম শতাব্দীর লোক শাণ্ডিল্য গোত্রীয় পণ্ডিত ভট্টনারায়ণ বা নারায়ণভট্ট। বারেন্দ্র কুলপঞ্জিকা অনুসারে তিনি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণের আদিপুরুষ। ষোড়শ শতাব্দীর এ বংশেরই ২৭তম পুরুষ কামদেব ভট্ট মুঘলদের পক্ষে আফগান জায়গির তাহিরখানকে পরাজিত করার পুরস্কারস্বরূপ এ পরগনার জমিদারি লাভ করেন। কামদেবের পূর্বপুরুষ সকলেই ধর্ম, সাহিত্য, দর্শন চর্চা করে আসছিল। তিনিই ছিলেন ভিন্ন প্রকৃতির এবং অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষিত একটি শক্তিশালী বাহিনীর গড়ে তুলেছিলেন। এ দেশের আফগানদের বিরুদ্ধে মুঘল অভিযান চলার সময় তিনি মোঘলদের পক্ষে তাহিরখানকে পরাজিত করেন। 
কামদেবের মৃত্যুর পর পুত্র বিজয় লস্কর জমিদারি লাভ করেন। তিনিই রামরামায় বিশাল রাজবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। তার তিন পুত্র ছিল ভূপনারায়ণ, হৃদয় নারায়ণ ও হরিনারায়ণ। বিজয় লস্করের পর জমিদারি লাভ করেছিলেন হৃদয়নারায়ণ। বড় ভাই জীবিত থাকা সত্ত্বেও মেজ ভাই কেন জমিদার হয়েছিলেন তার কারণ জানা যায়নি। সে সময় পুঠিয়ার জমিদার পরিবারের পুষ্পরাক্ষ তাহিরপুর জমিদারি পরিচালনা করতেন। হৃদয়নারায়ণের কোনো সন্তান ছিল না এবং পুষ্পরাক্ষকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি কাশি গমনের পূর্বে তাঁর প্রাপ্য সম্পত্তি পুষ্পপারাক্ষকে দান করে যান। ফলে তাহিরপুর জমিদারির আয়তন ছোট হয়। হৃদয়নারায়ণের পর ছোটভাই হরিনারায়ণ জমিদারির ভার গ্রহণ করেন। তার একমাত্র পুত্র ছিল কংসনারায়ণ এবং কন্যা ছিল করুণাময়ী। অনেকে এ কংসানারায়ণ ও রাজা গণেশকে একই ব্যক্তি বলে ধারণা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের জীবনকাল ভিন্ন। 
অতীতে দুর্গাপূজা সারধারণ মানুষের দ্বারা হতো না। কংসনারায়ণ অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করেছিলেন। এ দেশের শারদীয় দুর্গোৎসব প্রচলন তার কৃতিত্বের সঙ্গে জড়িত। তিনি বিশাল আয়োজন করেন। তাতে সে সময় প্রায় ৯ লাখ ৫ টাকা খরচ করেছিলেন। বর্তমানে তা ৬শ কোটি টাকারও বেশি।
রাজা কংসনারায়ণের পর রাজা উদয় নারায়ণ জমিদার হন। উদয় নারায়ণের পুত্র ইন্দ্রজিত। ইন্দ্রজিতের দুই পুত্র চন্দ্রনারায়ন ও সূর্যনারায়ণের আমলে বাংলার সুবাদার শাহ সুজা তাহিরপুর রাজবাড়ি লুটপাট করে ধ্বংস করে এবং জমিদারিও বাজেয়াপ্ত করে। সুজা বন্দী করে দিল্লী প্রেরণ কালে বন্দী অবস্থাতেই লজ্জায় দুঃখে অপমানে সূর্যনারায়ণের করুণ মৃত্যু ঘটে। জানা যায়, সূর্যনারায়ণের নিজ কন্যাকে শাহ সুজা তাঁর হারেমে প্রেরণ করার নির্দেশ দেয়। সূর্যনারায়ণ এ অন্যায় ও নিকৃষ্ট নির্দেশ অমান্য করলে তার জীবনে এ করুণ পরিণতি নেমে আসে। যতদূর জানা যায়, তাহিরপুর জামিদারের লক্ষ্মীনারায়ণ নামে একপুত্র ঢাকায় পালিয়ে বাঁচেন এবং অন্যরা সুজার আক্রমণে নিহত হন। এর মধ্যে আওরঙ্গজেব উত্তরাধিকার যুদ্ধে জয়লাভ করে দিল্লীর সম্রাট হন। তিনি মীর জুমলাকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন এবং সুজা আরাকানের দিকে পালিয়ে যায়। আওরঙ্গজেব লক্ষ্মীনারায়ণকে তাহিরপুরের জামিদারি ফিরিয়ে দেন এবং তাঁকে রাজা উপাধি প্রদান করেন। রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ পুনরায় তাহিরপুরে এ জমিদারির রাজধানী নির্মাণ করেন। নাটোর রাজবংশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রঘুনন্দনের কন্যাকে লক্ষ্মীনারায়ণ বিয়ে করেন। কন্দর্পনারায়ণ, মহেন্দ্রনারায়ণ, রূপেন্দ্রনারায়ণ ও ভূপেন্দ্রনারায়ণ নামে তার চার পুত্র ছিল। লক্ষ্মীনারায়ণ জীবনের শেষ পর্বে নির্দিষ্ট সময়ে জমিদারির রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হন। এর ফলে তার জ্যৈষ্ঠ পুত্র কন্দর্পনারায়ণকে বন্দী করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি বন্দী অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেন। ছোট পুত্র ভূপেন্দ্র নারায়ণ নিঃসন্তান অবস্থাতেই মারা যান। ফলে লক্ষ্মীনারায়ণের মৃত্যুর পর জমিদারির উত্তরাধিকারী হন মহেন্দ্রনারায়ণ ও রূপেন্দ্রনারায়ণ। তাদের মাতামহ রঘুনন্দনের মধ্যস্থতায় জমিদারি দু’ভায়ের মধ্যে বিভক্ত হয়। মহেন্দ্রনারায়ণ পান ছয় আনা এবং রূপেন্দ্র নারায়ণ পান দশআনা অংশ।  
তাহেরপুর ছয় আনা শাখা: মহেন্দ্র নারায়ণের মৃত্যুর পর পুত্র রতীন্দ্র ও রতীন্দ্রের মৃত্যুর পর তার পুত্র রায়বেন্দ্র জামিদারির মালিক হন। লক্ষ্মী ও সরস্বতী নামে রায়বেন্দ্রর দুই স্ত্রী ছিল। তাঁদের সন্তান ছিল না। ফলে রায়বেন্দ্রর মৃত্যুর পর তার দুই পত্নীই সম্পত্তির মালিক। 
তাহিরপুর দশ আনা শাখা: রূপেন্দ্রনারায়ণের জীবনাবসানের পর পুত্র রণেন্দ্রনারায়ণ জমিদারি লাভ করেন। রণেন্দ্রনারায়ণ রণু রাজা নামে পরিচিত ছিলেন। তার দুই কন্যা ছিল উমা সুন্দরী ও দুর্গা সুন্দরী। এ দুই সহদোরার বিয়ে হয়েছিল চৌগ্রাম জমিদারির দুই সহদোর আনন্দরাম রায় ও বিনোদরাম রায়ের সঙ্গে। রূপেন্দ্রনারায়ণের পুত্র সন্তান ছিল না এবং তিনি স্ত্রী রাণী শংকরীকে জমিদারি উইল করে দেন। ফলে রাণী শংকরী জমিদারির দার্য়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি মৃত্যুর পূর্বে এ ব্যবস্থা করেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর জমিদারির উত্তরাধিকার  হবে কোনো দৌহিত্র। তার কন্যা উমাসুন্দরীর কোনো সন্তান ছিল না এবং দুর্গা সুন্দরীর ১৭৮২ সালে এক মাত্র পুত্র জন্ম গ্রহণ করে। তার নাম বীরেশ্বর। মাতামহীর উইল  অনুসারে তিনি দশ আনা শাখার মালিক হন। তার এগার বছর বয়সে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়। তিনি অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় জমিদারি বন্দোবস্ত হয় পিতা আনন্দরামের সঙ্গে। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর বীরেশ্বর জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘদিন পরিচালনা করে ১৮৫৩ সালে মারা যান। মুত্যুর সময় তার ঋণের পরিমাণ ছিল অনেক।
রাজা বীরেশ্বরের দুই পুত্র ছিল চন্দ্রশেখরেশ্বর ও মহেশ্বর। বীরেশ্বরের মৃত্যুর পর চন্দ্রশেখরেশ্বর জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি জমিদারির পরিচালনায় যোগ্যতার পরিচয় দেন এবং পিতার সমস্ত ঋণ পরিশোধ করেন। তিনি অনেক জনহিতকর কাজও করেন। ১৮৫৪ সালে রাজশাহীতে তাঁর উদ্যোগে সেবাব্রত প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়।  এ প্রতিষ্ঠান থেকে গরিব ও দুঃখীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। প্রতিবছর এ প্রতিষ্ঠানে ১২০০ টাকা প্রদান করতেন। তাহিরপুরে একটি মাইনর স্কুল ও একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাহিরপুর, মালদহ ও দিনাজপুরে অবস্থিত তিনটি স্কুলের জন্য মাসিক ৬০ টাকা ১২ আনা অনুদান প্রদান করেন। তিনি তাহিরপুরে রথযাত্রা ও মেলার প্রবর্তন করেন। 
রাজা চন্দ্রশেখরেশ্বর মৃত্যুর আগে ছোট ভাই মহেশ্বরকে জমিদারির অর্ধেক ভাগ দিয়েছিলেন। বড় ভাইয়ের প্রতি মহেশ্বরের প্রচণ্ড ভক্তি ছিল। কিন্তু তিনি বুদ্ধিমান ছিলেন না। মহেশ্বরের জগদীশ্বর, তারাকেশ্বর, শিবেশ্বর ও কাশীশ্বর নামের চার পুত্র ছিল। তাঁরা কেউ জমিদারি পরিচালনায় উপযুক্ত ছিলেন না। বিধায় তারা পিতার প্রাপ্ত জমিদারির বিলাস ও অপব্যয়ে প্রায় নষ্ট করে দেন এবং ঋণগ্রস্ত হত। অবশেষে গরিবীহালে তাঁদের জীবন কাটে। 
রাজা চন্দ্রশেখরের তিন স্ত্রী ছিল। তৃতীয় স্ত্রী সৌদামিনীর গর্ভে ১৮৬০ সালে তার একমাত্র সন্তান শশি শেখরেশ্বর রায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৬৫ সালে চন্দ্র শেখরেশ্বরের মৃত্যুকালে শশিশেখরেশ্বর অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন। ফলে জমিদারি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের তত্ত্বাবধানে যায়। ১৮৮১ সালে ২১ বছর বয়সে শশিশেখরেশ্বর রায় জমিদারির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৮৮৯ সালে তিনি রাজা ও ১৮৯৬ সালে রাজাবাহাদুর উপাধি পান। তিন পুত্র শিবশেখরেশ্বর, শান্তি শেখরেশ্বর ও শক্তিশেখরেশ্বর এবং দুই কন্যা রেখে ১৯২৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একজন শিক্ষিত, বিচক্ষণ, সুপণ্ডিত ও প্রজা দরদী জমিদার ছিলেন। সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষক ও বাংলা, সংস্কৃত, উর্দু, আরবি ভাষা জানতেন। ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী এসোসিয়েশনের তিনি চতুর্থ সভাপতি ছিলেন। 
শশিশেখরেশ্বরের মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ পুত্র শিব শেখরেশ্বর জমিদারির দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি নিষ্ঠুর স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তার দ্বারা অনেক প্রজার বাড়ি-ঘর লুট ও ধ্বংস হয়। সে কারণে সরকার তাকে জমিদারি  থেকে সরিয়ে শান্তিশেখরেশ্বরকে দায়িত্ব দেন। শান্তিশেখরেশ্বরের জমিদারি আমলেই জমিদারি পরিচালনার ভার কর্মচারীরের উপর অর্পণ করে সমস্ত পরিবার স্থায়ীভাবে কলকাতা গমন করেন। ১৯৫০ সালে জমিদারির অবসান ঘটে।


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd