অধ্যায় ১০ : রাজশাহীর সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা

রাজশাহীর সাহিত্য


রাজশাহীকে বাংলা সাহিত্য বৃক্ষের অন্যতম শিকড় বলা যায়। এ বিষয়ে অনুসন্ধানী লেখক ও গবেষক ড. তসিকুল ইসলাম রাজা ১৫ মে ২০০০ তারিখের দৈনিক নতুন প্রভাত পত্রিকায় রাজশাহীতে সাহিত্য চর্চার অতীত ও বর্তমান নামে মূল্যবান তথ্য প্রদান করেছেন। বরেন্দ্রের বাতিঘর অগ্রযাত্রার ৫ বছর গ্রন্থে কবি কামরুল বাহার আরিফ ‘রাজশাহীর সাহিত্য চর্চা’ শিরোনামে তথ্যবহুল প্রবন্ধ লিখে রাজশাহীর সাহিত্য-গবেষণা কৃতিত্বকে একটা ফ্রেমে বাঁধার চেষ্টা করেছেন। এ অধ্যায় নির্মাণে প্রবন্ধ দুটি সূত্র সহায়কের ভূমিকা রেখেছে। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদেরও চর্চা হয়েছে বরেন্দ্র ভূমিতে। মধ্যযুগের প্রখ্যাত কবি নরোত্তম দাস (১৫৩১-১৬১১), অষ্টাদশ শতকে শুকুর মাহমুদ, পরবর্তীতে রাজা কৃষ্ণেন্দ্র রায় (১৮৩৪-১৮৯৮), মির্জা ইউসুফ আলী (১৮৫৮-১৯২০), কান্তকবি রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯২৪), ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (১৮৬১-১৯৩০), জগদিন্দ্রনাথ রায় (১৮৬৮-১৯২৬), হাজী কেয়ামতুল্লাহ (১৮৭০-১৯৬০), কবি ও নাট্যকার করিম বকস সরদার (১৮৭৬-১৯৩০), কবি মীর আজিজুর রহমান মাস্তান (১৯০০-১৯৭৮), বর্তমান যুগে হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিন, আবু বকর সিদ্দিক, সনৎকুমার সাহা, স্বরোচিষ সরকার প্রমুখ বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চায় কৃতিত্ব স্থাপন করেছেন।
রাজশাহীর সাহিত্য চর্চার ইতিহাস প্রাচীন বাংলা থেকে হলেও বর্তমান রাজশাহী মহানগরী কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার শুরু হয় উনিশ শতকে। তার পূর্বে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বা বৃহত্তর রাজশাহীর বর্তমান নওগাঁ, নাটোরের বিভিন্ন জায়গায় বিখ্যাত বিখ্যাত সাহিত্যিক-লেখকের জন্ম হয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজশাহী মহানগরী রেশম ও নীল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সমৃদ্ধশালী হিসেবে গড়ে উঠলেও প্রশাসনিক কেন্দ্রের গুরুত্ব পায় উনবিংশ শতাব্দীতে। অর্থাৎ ১৮২৫ সালে জেলার প্রশাসনিক অফিস নাটোর থেকে রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হওয়ার পর পেশাগত কারণেই এখানে বেশ কিছু শিক্ষিত ও সমাজ সচেতন ব্যক্তির আবির্ভাবের পাশাপাশি বৃহত্তর রাজশাহীর বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদারেরাও কুঠি স্থাপন করেন। এ সকল জমিদার ও সমাজ সচেতন ব্যক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরবর্তীতে পত্রিকা প্রকাশের বিষয়ে মনোযোগী হন। ফলে সাহিত্য চর্চারও পরিবেশ গড়ে উঠে।
১৮২৮ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল (তৎকালে ইংলিশ স্কুল) স্থাপনের ফলে এখানে যেমন ইংরেজি শিক্ষার সম্প্রসারণ আরম্ভ হয়, তেমনি তার প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর রাজশাহী কলেজকে কেন্দ্র করে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ হতে আরম্ভ করে। অবশ্য মুদ্রিত আকারে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয়েছিল এ কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্বেই। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত জ্ঞানাংকুর পত্রিকায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) প্রথম রচনা প্রকাশিত হয়েছিল।২২৭ (বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার বৃহত্তর রাজশাহী-১৯৯১ এর ৩৬৫ পৃষ্ঠায় জ্ঞানাংকুরের প্রকাশকাল ১৮৭২ সাল উল্লেখ আছে)। পরবর্তীতে শিক্ষা পরিচয়, উদ্বোধন, ঐতিহাসিক চিত্র, রাজশাহী সমাচার, নূর-উল ঈমান, উৎসব, পল্লী বান্ধব, পল্লী শক্তি, পল্লব প্রভৃতি সাহিত্য চর্চার অগ্রগতি বৃদ্ধি করে। ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী এসোসিয়েশন সাহিত্য চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের ১২ নভেম্বর রাজশাহী এসোসিয়েশন আয়োজিত সাহিত্য সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘শিক্ষার হেরফের’ নামের বিখ্যাত প্রবন্ধটি পাঠ করেছিলেন।২২৭ ১৯৮৫ সালের ৫ জানুয়ারি রাজশাহী এসোসিয়েশন পুররুজ্জীবিত হয়ে সাহিত্য, শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। ২০০০ সালের ১০ অক্টোবর রাজশাহী প্রতিভা ১ম খন্ড গ্রন্থ ছাড়াও রাজশাহী এসোসিয়েশন সাহিত্য পত্রিকা, প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে স্মরণিকা প্রকাশ করে থাকে।
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে রাজশাহী আসেন। এ ক্লাব প্রতিষ্ঠার ফলে রাজশাহীর মুসলিম তরুণ সমাজের মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ও বাংলা বিভক্তির ফলে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র সাহিত্য চর্চা আরম্ভ হয়। তার প্রভাব রাজশাহীতেও পড়ে। তদুপরি, রাষ্ট্রভাষাকে কেন্দ্র করে এখানকার শিক্ষিত তরুণ সমাজের মাঝে নব চেতনা গড়ে উঠতে শুরু করে। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে দিশারী সাহিত্য মজলিশ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে এবং প্রতিষ্ঠানটি হাবিবুর রহমান শেলীর সম্পাদনায় দিশারী নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ করে।১২৭ (বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর রাজশাহী ১৯৯১ এর ৩৫৯ পৃষ্ঠায় দিশারীর প্রকাশকাল ১৯৫০ সাল উল্লেখ আছে)। এ প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকাটি রাজশাহীর তরুণদের মধ্যে নতুন স্বাদ এনে দিয়েছিল। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে সাহিত্য চর্চায় ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), ড. মুহম্মদ এনামুল হক (১৯০৬-১৯৮২), ড. মযহারুল ইসলাম (১৯২৮), ড. কাজী আব্দুল মান্নান (১৯৩০-১৯৯৪), ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল (১৯৩৬-১৯৮৯), ড. মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম (১৯২৭), ড. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় (১৯২৭-১৯৮৪) প্রমুখ শিক্ষকের প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সাহিত্য চর্চা ও গবেষণার পথ প্রশস্ত হয়। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী (১৯২৮), আলী আনোয়ার, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক ড. মুখলেসুর রহমান, ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. এ.আর. মল্লিক, ড. সালাহউদ্দিন আহমদ প্রমুখের সাহিত্য সাধনা, গবেষণা ও পত্র-পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে রাজশাহীর সাহিত্য অগ্রগতি লাভ করে।
১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে ড. মযহারুল ইসলাম কবি হেয়াত মামুদ সম্পর্কে গবেষণা অভিসন্দর্ভ রচনা করে সর্বপ্রথম পিএইচডি লাভ করেন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ড. কাজী আব্দুল মান্নানের গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা’ রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হয়। সে সময় মুস্তাফা নূর-উল-ইসলাম ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর সম্পাদনায় ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘পূর্বমেঘ’ সমগ্র দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকসহ অনেক বিখ্যাত লেখক সৃষ্টি হয়েছে এ পত্রিকার মাধ্যমে। একই সময়ে মহসীন রেজার সম্পাদনায় ‘সুনিকেত মল্লার’ ও ডক্টর মযহারুল ইসলামের ‘উত্তর অণ্বেষা’ পত্রিকা ঘিরে একদল লেখক তৈরি হয়েছে। আব্দুল হাফিজের নেতৃত্বে প্রগতিশীল লেখকগণ অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। মুস্তাফিজুর রহমান, ফরহাদ খান, রুহুল আমিন প্রামাণিক, সিকান্দার আবু জাফর, সেলিনা হোসেন, ফজলুল হক, জুলফিকার মতিন প্রমুখ সে সময়ের উজ্জ্বল নক্ষত্র। এ লেখকদের অনেকে বর্তমানে সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছেন। সে সময় আব্দুর রশীদ খানের আইডিয়্যাল প্রিন্টিং প্রেস ও অধ্যাপক মুহম্মদ একরামুল হকের মডার্ন প্রিন্টিং প্রেস বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও পত্র-পত্রিকা বের করেছে। এর মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ খানের ‘নিরন্তর স্বর’, আব্দুল হাফিজের, ‘সুকান্তের সমগ্র কবিতা’, লোক কাহিনীর ‘দিগ-দিগন্ত’, ড. মযহারুল ইসলামের ‘ফোকলোর পরিচিতি ও লোক সাহিত্যের পঠন-পাঠন’, ড. কাজী আব্দুল মান্নানের ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা’, ড. এবনে গোলাম সামাদের ‘বাঙালির জন্ম পরিচয়’, ‘রাজশাহীর ইতিবৃত্ত’, মুস্তাফিজুর রহমানের কাব্যগ্রন্থ ‘নিরবধি আলোকে আধারে’, কবি বন্দে আলী মিয়ার কাব্য ‘দক্ষিণ দিগন্ত’, শামসুল হক কোরায়শীর কাব্য ‘গোধূলির কান্না’ উল্লেখযোগ্য।২২৭
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে রাজশাহীর সাহিত্য চর্চা নতুন জীবন দৃষ্টি নিয়ে সূচনা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কজন খ্যাতনামা কবি ও সাহিত্যিক অধ্যাপনাও শুরু করেন। কবি আতাউর রহমান, কবি আবু বকর সিদ্দিক, কবি আসাদুজ্জামান, কবি জুলফিকার মতিন, কবি মযহারুল ইসলাম, কবি সৈয়দ আলী আহসান, কথা শিল্পী হাসান আজিজুল হকের সান্নিধ্যে অনেক তরুণ লেখক নিজেদের যোগ্যরূপে গড়ে তুলেন। ড. মজির উদ্দীনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় একদল তরুণ গবেষণায় কৃতিত্ব অর্জন করেন। এদের মধ্যে ড. মো. হারুন-অর-রশীদ, ড. অমৃতলাল বালা, ড. তসিকুল ইসলাম রাজা, ড. অনীক মাহমুদ, ড. ফরিদা সুলতানা, ড. মনিরা কায়েস এ সময়ের উল্লেখযোগ্য নাম। দেশ স্বাধীনের পর প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক সাহিত্য চর্চারও প্রয়াস ঘটে। উত্তরা সাহিত্য মজলিশ (১৯৭৩) থেকে কবি বন্দে আলী মিয়ার সম্পাদনায় প্রতীতি নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মুহম্মদ আব্দুস সামাদ, অধ্যাপক এসএম আব্দুল লতিফ, ড. রশীদুল আলম, মরহুম আব্দুল গনি, কবি খোন্দকার জাহানারা বেগম, মুস্তাফিজুর রহমান, শামসুল হক কোরায়শী, আনোয়ারুল আবেদীন প্রমুখ প্রতীতিতে নিয়মিত লিখতেন।
১৯৭৬ সালে রাজশাহী থেকে জাতীয় মানের পত্রিকা দৈনিক বার্তা প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকায় চাকুরি সূত্রে দেশের বেশ কজন উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আসেন রাজশাহীতে। নুরুল ইসলাম পাটোয়ারি, আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরী, সৈয়দ রেদওয়ানুর রহমান, কামাল লোহানী, আজিজ মিসির, মীর নুরুল ইসলাম, মোসলেম আলী বিশ্বাস, ওয়াজেদ মাহমুদ তাদের মধ্যে অন্যতম। এ সকল সাহিত্যিক ও সাংবাদিকগণের অবদানে রাজশাহীতে একদল তরুণ লেখক তৈরি হয়। তাঁরা আজ অনেকে লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে কৌশিক আহমেদ, জামিল রায়হান, অনীক মাহমুদ, মামুন হুসাইন, মনিরা কায়েস, আরিফুল হক কুমার, নাজিব ওয়াদুদ, মোহাম্মদ কামাল, সরকার মাসুদ, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, তারিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ মুসা, হাসনাত আমজাদ, তপন দাশ, মালেক মেহমুদ, মীর রবিউল ইসলাম, আশরাফুল আলম পিন্টু, সিরাজুদ্দৌলাহ বাহার, ওয়ালী কিরণ, রাশেদ রাইন প্রমুখ অন্যতম। শুরুতে দৈনিক বার্তার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন ওয়াজেদ মাহমুদ। এ পত্রিকাটির কিশোর কুঁড়ির মেলা নামে বিভাগও তরুণ লেখক তৈরি করে। এ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন মাহমুদ আনোয়ার হোসেন। পরবর্তীতে এমএ কাইউম এ দায়িত্ব পালন করেন। এমএ কাইউমের দায়িত্বকালেই কিশোর কুঁড়ির মেলা বেশ কয়েকটি গল্প প্রকাশ করে এ গ্রন্থের লেখক আনারুল হক আনাকে উৎসাহিত করে। 
নিয়মিত সাহিত্য চর্চায় উৎসাহিত করার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন গড়ে উঠে রাজশাহীতে। এক সময় রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদ নিয়মিত সাহিত্য আসরের আয়োজন করত। এ সংসদের মুখপত্র পরিলেখ নামের পত্রিকায় বিখ্যাত লেখকদের সঙ্গে তরুণ লেখকদেরও লেখা ছাপা হতো। রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তসিকুল ইসলাম রাজা ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন হাসনাত আমজাদ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনন, শব্দায়ন, আড্ডা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আবৃত্তি চর্চা ও সাহিত্য সভার আয়োজন করা হয়। স্বনন দেশের একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি নাজিম মাহমুদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে নেতৃত্ব আসেন কবি মোহাম্মদ কামাল।২২৭ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় লেখক ফোরাম, সন্দীপন সাহিত্য পরিষদ (১৯৯৬) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত আরো দুটি প্রতিষ্ঠানে। সন্দীপনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হারুন-অর-রশিদ সরকার এবং পরবর্তী পরিচালক নূরুস সা’দত। নুরুস সা’দাতের সম্পাদনায় এ প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে মাসিক নির্ঝর প্রকাশ করে থাকে। এছাড়া নিয়মিত সাহিত্য আসর ও সাহিত্য কর্মশালার আয়োজন করে।২৩০
ফজলুল হক (মৃত্যু ১৩ আগস্ট ২০০৯) ও শামসুল আলম সরদারের পরিচালনায় রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ সাহিত্য চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ১ অক্টোবর ১৯৯৩ তারিখে জন্মলাভ করে এ প্রতিষ্ঠানটি সাহিত্য সম্মেলনেরও আয়োজন করে। এ সম্মেলনে স্বনামধন্য লেখক ও কবিরাও উপস্থিত হন। ফজলুল হকের সম্পাদনায় মাসিক লোকপত্র রাজশাহীর সাহিত্য চর্চায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে।
নিয়মিত সাহিত্য বৈঠক ও প্রকাশনার জন্য রাজশাহী লেখিকা সংঘের অবদানও প্রশংসনীয়। লেখিকা সংঘ চতুষ্কোণ (গল্প সংকলন), নীল যন্ত্রণা (বারোয়ারী উপন্যাস), মেঘের অন্তরে বহ্নি (কবিতা সংকলন), বিমূর্ত ভাবনা যতো (কবিতা সংকলন), জীবন যেখানে যেমন (গল্প উপন্যাস), সুবর্ণ রেখা (কবিতা সংকলন) প্রভৃতি প্রকাশ করেছে। এ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সাহিত্যচর্চা করে খ্যাতি অর্জন করেছেন জাহান আরা বেগম, আজিজা বেগম, খোদেজা বেগম, হামিদা হক, খন্দকার জাহানারা বেগম, রেবেকা আসাদ, হেলেনা বেগম, রোকেয়া রহমান, মাফরুহা আকতার উর্মি, মিতা জামান, শামসুজজাহান সুলতানা বানু, সৈয়দা মাস্তুরা মোনালিসা, লুৎফুন্নেসা আজিজ, রোজেটি নাজনিন, সৈয়দা আয়েশা বেগম, ফরিদা খানম, রোজিনা ইসলাম, শাকিয়া হায়দার, সৈয়দা সুরাইয়া হক প্রমুখ।২২৭
১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পরিচয় সংস্কৃতি সংসদ। এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক প্রফেসর একেএম মহিউদ্দীন। পরবর্তী আহ্বায়ক নাজিব ওয়াদুদ এবং পরিচালক সরদার আবদুর রহমান। এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৬ সাল থেকে পরিলেখ নামে ত্রৈমাসিক লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করে। পত্রিকাটির সম্পাদক নাজিব ওয়াদুদ ও প্রধান সম্পাদক সরদার আব্দুর রহমান। এছাড়া এর মাসিক সাহিত্য আসরে লেখা পাঠ ও পর্যালোচনা হয়ে থাকে।২৩০ পরিলেখ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে। নাজিব ওয়াদুদ ও ফজলুল হক তুহিনের সম্পাদনায় এ প্রকাশনা পদ্মাপাড়ের ছড়া (২০০৪) প্রকাশ করে। মহানগরীর লক্ষ্মীপুর কাজীহাটায় ২০০১ সালে রাজশাহী সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সরদার আব্দুর রহমান প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। পরিচালকেরই সম্পাদনায় এখান থেকে দিগন্ত নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ হয়। এছাড়া রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের বিপরীত উচ্চারণ, রাজশাহী কলেজ থিয়েটার, লোক সংস্কৃতি কেন্দ্র সাহিত্য চর্চায় অবদান রাখছে।২৩০
গোষ্ঠীগত উদ্যোগ ছাড়াও অনেকে সাহিত্য চর্চা করে আসছেন। তাদের অনেকেরই গ্রন্থ ঢাকা থেকে প্রকাশ হয়েছে। ১৯৭২ সালে রাজশাহী থেকে প্রথম যে সাহিত্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় সেটি ছিল প্রথম কাব্যগ্রন্থ জুলফিকার মতিনের স্বৈরিণী স্বদেশ তুই। এরপর বিভিন্ন লেখক, কবি ও গবেষকের গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে।
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd