অধ্যায় ২ : প্রকৃতি ও আবাসন

কয়েকটি জমিদার বাড়ি


জমিদার শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ভূমির অধিকারী। আরবি জমিন ও ফার্সী দার শব্দ দুটি থেকে এর উৎপত্তি। রাজশাহীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে অনেক ছোট বড় জমিদারের অস্তিত্ব দেখা যায়। বস্তুত বাংলাদেশের আর কোন জেলায় এত জমিদার ছিল কি না সন্দেহ। প্রজা বাৎসল্য ও উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের ফলে এসব জমিদার রাজা, মহারাজার খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। ১৮২৫ সালে রাজশাহী জেলা সদর নাটোর হতে রামপুর-বোয়ালিয়াতে (রাজশাহী নগরী) স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে বিভিন্ন অফিস ভবন স্থাপন এবং আধুনিক শিক্ষার গোড়াপত্তন ও সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। জেলার বিভিন্ন স্থানে রাজা-জমিদারদের আনাগোনাও শুরু হয়। ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নাটোর, দিঘাপাতিয়া, পুঠিয়া, তাহিরপুর, দুবোলহাটি, কাশিমপুর প্রভৃতি স্থানের জমিদারগণ রামপুর-বোয়ালিয়ায় আবাসিক কুঠি স্থাপন করেন। এসব আবাসিক কুঠিসমূহ এখন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বিভাগের কার্যালয় হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে প্রাচীন অবকাঠামো ভেঙ্গে ফেলে প্রায় সবগুলোতেই নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
দিঘাপাতিয়া রাজবংশের কুঠি: নগরীর ঘোড়ামারায় অবস্থিত। পূর্বে কুঠিটি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে সরকারি অফিস। এখন সম্পূর্ণ নতুন ভবন তৈরি হওয়ায় প্রাচীন রাজবংশের চিহ্ন মেলেনা।
এর পার্শ্বেই ছিল দিঘাপাতিয়ার রাজার ভগ্নিপতি মহেন্দ্র উকিলের বাড়ি। দেশের প্রথম জাদুঘর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরটির সূচনা এ ভবনেই হয়েছিল। পরে বিভাগ উন্নয়ন অফিস এবং বর্তমানে বরেন্দ্র কলেজ। পুরাতন রাজভবনের বিলুপ্ত ঘটেছে নতুন ভবন নির্মাণের কারণে। 
রাজশাহী সরকারি হাই মাদ্রাসার দক্ষিণে দিঘাপাতিয়ার রাজার আর একটি স্বাস্থ্য নিবাস কুঠি ছিল। সেটা পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
পুঠিয়া পাঁচ আনী রাজবংশের কুঠি: পদ্মা নদীর উপকন্ঠে নগরীর শেখের চকে এর অবস্থান। বর্তমানে শাহ্ মখদুম কলেজ। নতুন নতুন বিল্ডিং নির্মিত হয়ে পুরনো রাজকীয় দালান ধ্বংস হয়ে গেছে। এর প্রধান ফটকের উপর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বিশাল সিংহ মূর্তিটি পরাক্রমশালী রাজবংশের ঐতিহ্য বহন করতো। নতুন ফটকেও সিংহ মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছে।
নাটোরের রাজবংশ (ছোট তরফ) এর কুঠি: এটি রাজশাহী সিটি কলেজ রাজারহাতা মহল্লায়। তা ছিল নাটোর রাজবংশ বা জমিদারির ছোট তরফের সর্বশেষ জমিদার বীরেন্দ্র কুমার রায়বাহাদুরের পরিত্যক্ত কাচারি বাড়ি। ১৯৬০ সালে জেলা প্রশাসনের সহায়তাই ০.৬৮ একর জমিসহ বাড়িটি ১৮ হাজার ১০৮ টাকা ১৫ আনাই রাজশাহী সিটি কলেজ ক্রয় করে। এরপর সিটি কলেজকে লোকনাথ হাই স্কুল থেকে এখানে স্থানান্তর করা হয়।৫০৫
পানসিপাড়া রাজবংশের কুঠি : এ রাজবংশের জমিদার মোহিনী রায়ের কুঠি ছিল কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার পূর্ব প্রাচীর সংলগ্ন। বর্তমানে এটা বোয়ালিয়া ক্লাব হিসেবে সুপরিচিত।
বাগধানী জমিদারের কাচারী বাড়ি: রাজশাহী শহরে কবি কাজী নজরুল ইসলাম আগমনের ফোকাল পয়েন্ট দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাবের প্রাথমিক যাত্রা বাগধানী জমিদারির কাচারি দালান আজও দণ্ডায়মান। তাঁর প্রাঙ্গণে নির্মিত হয়েছে দোতলা হোসেনীগঞ্জ শেখপাড়া মসজিদ, তিনতলা খন্দকার হাউস। মূল ভবনে বাস করছেন বাগধানী জমিদারের উত্তরসূরী খন্দকার পরিবার। তাঁদের পূর্বতন বাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের সালার। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর চাকরির সুবাদে এ পরিবারটি চলে আসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরির পর ষাটের দশকের শুরু বা তাঁর দু/এক বছর আগ থেকে বসবাস আরম্ভ করেন কাচারি ভবনে।
করচমাড়িয়ার জমিদার বাড়ি: এ জমিদারির প্রসিদ্ধ ব্যক্তি রাজকুমার সরকার ও তাঁরপুত্র স্যার যদুনাথ সরকার। এ জমিদার বাড়িতেই বর্তমার রাণীবাজার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়।
তালন্দ জমিদারির বাড়ি তালন্দ ভবন: সাহেব বাজার বড় মসজিদ হতে পূর্ব দিকে স্টার স্টুডিওর সামনে রাস্তার দক্ষিণ পাশে এ ভবনটি অবস্থিত। রাজশাহী মহনগরীতে বিদ্যমান জমিদার বাড়িসমূহের মধ্যে একমাত্র এ ভবনের তোরণপথটি এখনো টিকে থেকে রাজশাহী অঞ্চলের জমিদারদের আভিজাত্য ও ভাবগাম্ভীর্যের বার্তা বহন করে চলেছে।
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd