অধ্যায় ২ : প্রকৃতি ও আবাসন

মানব বসতি স্থাপন



নদীকে কেন্দ্র করে নদী থেকে উত্থিত ভূমিতে মহানগরীর উৎপত্তি। রাজশাহী মহানগরী নগরীর অবদান বললে বেশি বলা হবে না। এ ভূমিতে প্রথম কখন কিভাবে জনবসতি গড়ে উঠেছিল তার কোন তথ্য পাওয়া যায়না।১ তবে মানুষের যুগোপযোগী হবার আগে এর সমস্ত অঞ্চলেই বন বাদাড়ে আবৃত ছিল। মূলত রাজশাহী মহানগরীর তখন ছিল চরাঞ্চল। অরণ্য আবৃত চরাঞ্চলে বিভিন্ন রকমের মাংসাশী প্রাণী বাস করতে বলে মানুষ বসবাসের যোগ্য ছিল না। শতবর্ষ পূর্বেও রাতে কোর্ট হতে সাহেববাজার যাওয়ার রাস্তায় বাঘের শিকারে পরিণত হওয়ার আশংকা  ছিল। লেখক দীনেন্দ্রকুমার রায় উনিশ শতকের শেষ দিকে রাজশাহী জজ কোর্টে চাকরিকালীন কোর্ট থেকে টমটমে সাহেব বাজারের দিকে বাসা ফেরার পথে রাত দশটায় একদিন বাঘের কবলে পড়েছিলেন। ঘটনাটি তিনি সেকালের স্মৃতি গ্রন্থে (পৃষ্ঠা -১২৪ ) উল্লেখ করেছেন। বর্তমান ষাটোর্ধ্ব মুরুব্বীগণও শহরের আশে পাশের এলাকার জঙ্গলের স্মৃতিচারণ করেন। 
হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করলে বোঝা যায় তার আগমনের পূর্ব থেকে এখানে জনবসতি ছিল। শ্রীরামপুর, বোয়ালিয়া, চরসাঁইপুর, কাদিরপুর, এখানকার প্রাচীন পল্লী।১ হজরত শাহ্ মখদুমের আগমনের পর হতে এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ক্রমশ হিন্দু-মুসলমানদের বসতি গড়ে উঠে এবং বিস্তার লাভ করে। সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে রাজশাহী মহানগরী (রামপুর-বোয়ালিয়া) উল্লেখযোগ্য পল্লী হিসাবে বিবেচিত ছিল না। ১৬০৯ সালে আব্দুল লতিফ নামক একজন পর্যটক দিল্লী হতে বাংলার গৌড়ে এসে উপস্থিত হন এবং আলাইপুরে এক মাসেরও বেশি সময় অবস্থান করেন। তখন আলাইপুর গৌড়ের সুলতানদের  মিলিটারি সেন্টার ছিল। তিনি রাজশাহীর বাঘা, আলাইপুর, যশোরের ফতেপুর, নাজিরপুর প্রভৃতি স্থান পর্যটন করেন এবং কয়েকজন আউলিয়ার সমাধি জিয়ারত করেন। এসব তিনি একটি সুন্দর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন। সেখানে শ্রীরামপুর বা বোয়ালিয়ার নাম ছিল না। এ থেকে উপরোক্ত মন্তব্য প্রমাণিত হয় এবং  আরো ধারণা হয়, এ সময় হজরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর রামপুর বোয়ালিয়াতে আগমন ঘটলেও তার খ্যাতি ছিল না। রাজশাহীর কুমারপুরে অবস্থানকারী জনৈক আলী কুলী বেগ (রহ.) ১৬৩৪ সালে মখদুম সাহেবের কবরের উপর একটি সমাধি সৌধ পুন:নির্মাণ করেছেন। তখন হতেই এটা দরগারূপে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং দরগাপাড়া মহল্লার নামের সৃষ্টি হয়। ১৬৬০ সালে ডাচ গভর্ণর ফন ডেন ব্রুক বঙ্গদেশের যে নকশা তৈরি করেন তাতে বোয়ালিয়ার উল্লেখ নেই। একটি নৌ স্টেশনের সংকেত দেখা যায়। এ নকশায় বোয়ালিয়া হতে একটি রাস্তা লস্করপুর (পুঠিয়া), হাণ্ডিয়াল, বগুড়ার শেরপুর প্রভৃতি স্থান হয়ে আসাম অভিমুখে ধাবিত। এ রাস্তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে মখদুম সাহেবের সৌধ পুনঃনির্মাণের ফলে বিদেশি সওদাগর ও পর্যটকদের আগমন ঘটে। 
অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে (১৭৪১-৪২) বাংলার রাজধানী যখন মুর্শিদাবাদে ছিল, তখন বর্গীরা রাজধানীর আশে পাশে ঘন ঘন আক্রমণ করতো। তাদের আক্রমণ থেকে নিরাপত্তার জন্য নবাব আলীবর্দী খানের ডেপুটি গভর্নর নওয়াজেশ খানের নেতৃত্বে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সম্পত্তি ও পরিজনবর্গ নিয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর আলী-বারোইপাড়ায় স্থানান্তরিত হন। মুর্শিদাবাদে অনেক লোক পদ্মা ও মহানন্দার উত্তর তীরে বরেন্দ্র ভূমির বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তখন বোয়ালিয়াতেও একটা উপনিবেশ গড়ে ওঠে। 
এসব ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, মখদুম সাহেবের আগমন রামপুর-বোয়ালিয়ায় নতুন যুগের সৃষ্টি করে ও মুর্শিদাবাদ থেকে আগত মোহাজেরদের বসতি স্থাপনের ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করে। নগরীর পাঠানপাড়া, শেখপাড়া, হোসেনীগঞ্জ, সিপাইপাড়া, হেতেমখাঁ, কাদিরগঞ্জ প্রভৃতি  মহল্লা তাদের প্রাচীনস্মৃতি বহন করছে। হোসেনীগঞ্জে শিয়াদের বাস ছিল। 
১৮২৫ সালে জেলা সদর নাটোর থেকে রাজশাহীতে স্থানান্তর হলে এখানে ক্রমশ বিভিন্ন অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে উঠতে থাকে। এর ফলে রাজশাহী অঞ্চলের রাজ-জমিদারেরা রাজশাহীতে তাদের আবাসিক কুঠি স্থাপন করতে থাকে এবং ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে ভাগ্য উন্নতির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জেলার লোকেরও আগমন ঘটে। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর রাজশাহী বিভাগীয় শহরে পরিণত হয়। বিভাগীয় শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন অফিস ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, hÉhp¡ fТaù¡e J Bh¡p ÙÛmz  ১৯৮৭ সালে পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পৌর সেবার সম্প্রসারণ হতে আরম্ভ করে। এসব সুবিধার জন্য জনসংখ্যার হারও বৃদ্ধি পেতে থাকে। 


 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd