অধ্যায় ৮ : রাজশাহী মহানগরীর ভার্স্কয

শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান স্মৃতিস্তম্ভ


শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান স্মৃতিস্তম্ভ

শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এবং স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের অন্যতম জাতীয় নেতা ছিলেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি রাজশাহী মহানগরীর কাদিরগঞ্জ মহল্লায়। তবে তিনি ১৯২৩ সালের ২৬ জুন নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া থানার মালঞ্চি রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন নূরপুর গ্রামে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁকে হত্যা করা হয়। কামারুজ্জামান জমিদার ও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর দাদা হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার (১৮৪৮-১৯৩৬) রাজশাহী জেলার বর্তমান গোদাগাড়ি উপজেলার গুলাইয়ের জমিদার ছিলেন। তিনি ১৯২৪ থেকে ১৯২৬ ও ১৯৩০ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য (এমএলসি) ছিলেন। সমাজসেবায়ও তার খ্যাতি ছিল। কামারুজ্জামানের পিতা আব্দুল হামিদ মিয়া (১৮৮৭-১৯৭৬) রাজনীতিবিদ ও পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) ছিলেন। 

মৃনাল হক নির্মিত শহীদ কামারুজ্জামান স্মৃতিস্তম্ভ (বিলুপ্ত)

রাজশাহীর কৃতী সন্তান শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান স্মৃতিকে চির অম্লান রাখার উদ্দেশ্যে রাজশাহীর আর এক কৃতী সন্তান শিল্পী মৃনাল হক প্রায় নিজ খরচে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান চত্বরে শহীদ কামারুজ্জামান স্মৃতিস্তম্ভ ভাস্কর্যটি স্থাপন করেছিলেন। মৃনাল হক নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি ২০১০ সালের ৩ নভেম্বর উদ্বোধন করেছিলেন শহীদ কামারুজ্জামানের সহধর্মিণী জাহানারা কামারুজ্জামান। স্মৃতিস্তম্ভের ফলক উন্মোচন উপলক্ষে স্তম্ভের দক্ষিণ পাশে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। ভাষা সৈনিক আবুল হোসেনের সভাপতিত্বে ঐ সভায় শহীদ কামারুজ্জামানের পুত্র রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বক্তব্য পেশ করেন। ফজলে হোসেন বাদশা তাঁর ভাষণে স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরকে শহীদ কামারুজ্জামান চত্বর ঘোষণা দেন। মন্যুমেন্টটির সঙ্গে চত্বরের পশ্চিম-উত্তর পাশে ফুটপাত ঘেঁষে তরঙ্গ আকৃতির দেয়ালসহ শোভাবর্ধন কিছু কাজ করা হয়। যা ২২ নভেম্বর ২০১১ তারিখে মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন উদ্বোধন করেন।  
তবে ভাস্কর্যটি ভেঙ্গে পুনরায় শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান মন্যুমেন্ট নামে নির্মাণ করা হয়েছে।  স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জনাব জাহাঙ্গীর কবির নানক ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে এ মন্যুমেন্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ৬৫ লাখ টাকা।৭৩২ মন্যুমেন্টটির বেদীর পূর্ব ও পশ্চিম পাশে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের প্রতিকৃতিসহ সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখা আছে। 
৫৩ ফুট উচ্চতার বাঁকানো ঊর্ধ্বমুখী এ মন্যুমেন্টে আছে ১৭ টি ছিদ্র। এ উচ্চতা দিয়ে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের জীবদ্দশার ৫৩ বছরকে বোঝানো হয়েছে। বাঁকানো অংশ দ্বারা উপনিবেশিক শাসন থেকে মোড় নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পথ চলার অর্থ প্রকাশ করে। ১৭ টি ছিদ্রের অর্থ ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল।৭৩২ এ দিনেই শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা আমবাগানে (বর্তমানে মুজিবনগর) প্রবাসী সরকারের অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হিসেবে অধ্যাপক ইউসুফ আলীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের জন্ম ১৯২৩ সালের ২৬ জুন ও শহীদ হন ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর। হিসেব অনুসারে তাঁর পার্থিব জীবন ছিল ৫২ বছর ৪ মাস ১১ দিন। মন্যুমেন্টের সঙ্গে আছে ২টি ঝর্ণা ও অটোলাইট।৭৩২ মন্যুমেন্টটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আশরাফুল কবির লি. রাজশাহী। ডিজাইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন।৭৩৩

আশরাফুল কবির লি. নির্মিত শহীদ কামারুজ্জামান স্মৃতিস্তম্ভ

মৃনাল হক নির্মিত মন্যুমেন্ট ভেঙে নতুন মন্যুমেন্ট নির্মাণের বিষয়ে এএইচএম খায়ারুজ্জামান লিটন এক সভায় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সেটির মান যথাযথ না হওয়ায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নিজ উদ্যোগে মন্যুমেন্টটি সরিয়ে পুনরায় স্থাপন করবে।৭৩৩
শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান চত্বর নামকরণের পূর্বে জায়গাটি গোরহাঙ্গা রেলগেট নামে পরিচিত ছিল। মহল্লার নামানুসারে গোরহাঙ্গার সঙ্গে রেলগেট শব্দটি যুক্ত হয়। ধারণা করা হয় ১৯২৯-১৯৩০ সালে আব্দুলপুর থেকে আমনুরা রেলওয়ে নির্মাণের পর গোরহাঙ্গা  রেলগেট নামের উৎপত্তি ঘটে। শহর থেকে নওহাটাগামী সড়কের উপর দিয়ে রেলপথ স্থাপন হওয়ায় সেখানে গেট নির্মাণ করা হয়। ফলে জায়গাটি গোরহাঙ্গা রেলগেটের নামে পরিচিতি পায়। মোড়ের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণায় ১৯৭৯ সালে আটামিল ও রেশনের দোকান স্থাপন করা হয়েছিল। ১৯৮১ সালে সেখানে আটামিল ও রেশনের দোকান তুলে দিয়ে স্থাপন করা হয় একটি খাবার হোটেল। হোটেলের নাম দেয়া হয় বিন্দু হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট। সে সময়ের অনেকটা আধুনিক মানের রেস্তোরাঁটি অল্প দিনের মধ্যেই রাজশাহীবাসীর কাছে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিল। ফলে মোড়টি বিন্দুর মোড় নামেও খ্যাতি অর্জন করে।
জানা যায় শহরের মাঝ দিয়ে প্রবাহমান বিলুপ্ত বারাহী নদীটি বর্তমান নগর ভবনের পশ্চিম পাশ দিয়ে বাঁক নিয়ে পূর্বমুখী হয়ে বর্তমান শহীদ কামারুজ্জামান চত্বরের উপর দিয়ে বহমান ছিল। এ নদী পারাপারের জন্য এক সময় এখানে একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছিল। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সরণী নির্মাণের সময় ব্রিজটি একেবারে মাটির নিচে তলিয়ে যায়। বর্তমানে এ চত্বরের দক্ষিণ পাশে গোরহাঙ্গা গোরস্থান ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবন। উত্তর দিকে রেল লাইন, রেলগেট ও নব নির্মিত ট্রাফিক পুলিশ বক্স। পশ্চিমের কিছু দূরে নগর ভবন। পূর্বে বেশ কিছু দূরে বন্ধ সরকারি রেশম কারখানা, তারপর ঢাকা বাস টার্মিনাল, আন্ত:জেলা বাস টার্মিনাল ও তার বিপরীতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন অবস্থিত।
বর্তমান মহানগরীর রোড নেটওয়ার্কের ফোকাল পয়েন্ট শহীদ কামারুজ্জামান চত্বর। রিক্সা বা অটোরিক্সায় এখান থেকে মহানগরীর সব দিকেই যাওয়া যায়। এ চত্বর থেকে চার দিকে বয়ে গেছে তিনটি মহাসড়ক ও একটি সাহেববাজারমুখী রাস্তা। এ রাস্তা দিয়ে পদ্মার তীরেও যাওয়া যায়। পশ্চিমের মহাসড়ক চলে গেছে রাজশাহী কোর্ট হয়ে, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, সোনা মসজিদ হয়ে ভারত। পূর্বমুখী সড়ক দিয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নাটোর হয়ে বগুড়া, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য জেলায় যাওয়া যায়। উত্তরমুখী রাস্তাটি বিমানবন্দর হয়ে চলে গেছে নওগাঁ। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে এ রাস্তাটির বিমান বন্দর পর্যন্ত নাম দেয়া হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন বীর বিক্রম সড়ক। তাঁর একটি নামফলকও স্থাপন করা হয়েছিল রেলগেটের পশ্চিম পাশে। তবে ফলকটি আর দেখা যায় না। ৪ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল হক জানান, ফলকটি আরো সুন্দরভাবে স্থাপন করা হবে।

 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd