অধ্যায় ৭: সংসদ সদস্য

ফজলে হোসেন বাদশা


ফজলে হোসেন বাদশা ৫১০

ফজলে হোসেন বাদশা রাজশাহীবাসীর কাছে বাদশা ভাই বা বাদশা নামে বেশি পরিচিত। তিনি ১৯৫২ সালের ১৫ অক্টোবর রাজশাহী মহানগরীর হড়গ্রাম বাজারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খন্দকার আশরাফ হোসেন রাজশাহী  জজ কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। মা দিলারা হোসেন। পিতা খন্দকার আশরাফ হোসেন রাজশাহী বার এসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন ধরনের সমাজ সেবামূলক ভূমিকা পালন করেন। মা গৃহ পরিচালনার পাশাপাশি নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে সামাজিক দায়িত্বে সচেতন ছিলেন।৬২৮ 
নয় ভাই বোনের মধ্যে বাদশা তৃতীয়। তাঁর জন্ম, শৈশব, তারুণ্য, বর্তমান রাজশাহী মহানগরীতেই। বর্ণমালা শেখা শুরু করেন মা ও বোনের কাছে। ১৯৬৭ সালে তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৭০ সালে নিউ গভ. ডিগ্রী কলেজ, রাজশাহী থেকে এইচএসসি পাস করেন।  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অনার্সসহ অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ও এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন।৬২৮
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বাদশা তুখোড় ছাত্র নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। শুরু থেকে তিনি প্রগতিশীল বামধারা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) এর সদস্য পদ গ্রহণ করেন। এর দু বছর পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাদশা একজন সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় তিনি রাজশাহী মহানগরীর পশ্চিমাঞ্চলে ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করেন। এরপর সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা মেলাঘর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোগদান করেন। পরে মুর্শিদাবাদ জেলার পানিপিয়া ক্যাম্পে আসেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার জন্য তিনি কিছুদিন ধুলাউড়া ক্যাম্পেও ছিলেন।৬২৮
 দেশ স্বাধীনের পর প্রগতিশীল ছাত্র সমাজকে সংগঠিত করেন ও ছাত্রদের দাবি আদায়ে বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ জন্য তাঁকে বার বার কারাবরণও করতে হয়। ক্রমশ তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ফলে ১৯৮০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) এর ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) নির্বাচিত হন। এ বছরের ৬ ডিসেম্বর  তিনি বাংলাদেশ বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী নামে নতুন একটি ছাত্র সংগঠন নির্মাণে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।৬২৮ তিনি সংগঠনটির প্রথম সভাপতি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সংগঠনটির বিপ্লবী শব্দটি বিলুপ্তি করে নামকরণ হয় বাংলাদেশ ছাত্রী মৈত্রী। ছাত্র জীবন শেষের পর যুব সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন। তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ যুব মৈত্রী নামের নতুন সংগঠন এবং সভাপতি নির্বাচিত হন। ছাত্রদের দাবি আদায়ের পাশাপাশি তাঁকে শ্রমিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে দেখা যায়। ফলে এক সময় রাজশাহী মহানগরীর রিক্সাচালকদের প্রয়োজনের বন্ধু হয়ে ওঠেন। ১৯৭৭ সালে রিকসা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে তাঁদের সংগঠিত করেন। কৃষি-কারখানার শ্রমিকদের অধিকার আদায়েও বাদশা সহযোগী কর্মীর ভূমিকা পালন করেন।৬২৮  ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের সামাজিক জীবনধারার উন্নয়ন এবং তাঁদের প্রতি নির্যাতনের প্রতিবাদে বাদশা সবসময়ই সক্রিয় থেকেছেন। ১৯৯৩ সালে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ গঠনে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন এ পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা। বরেন্দ্র অঞ্চলে তাঁর প্রচেষ্টায় দুটি আদিবাসী স্কুল স্থাপন হয়।৬২৮
১৯৮২ সালে ২৩ মার্চ দেশে সামরিক শাসন শুরু হলে বাদশা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আন্দোলন চলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভূত্থান পর্যন্ত। এ অভূত্থান ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন নামে পরিচিত। বাদশা আন্দোলনের সংগ্রামী সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। এ জন্য নয় বছরের আন্দোলনে তাঁকে বার বার কারাবন্দী হতে হয়। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছাত্র নেতা থেকে বর্তমান পর্যন্ত  ছাত্র দাবি, গণতন্ত্র, আদিবাসী অধিকার, শ্রমিক নির্যাতন বন্ধকরণসহ বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় আছেন।
তিনি ১৯৯১ , ১৯৯৬, ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনে রাজশাহী-২ (পবা-বোয়ালিয়া) আসনে সংসদ সদস্য পদে এবং ২০০২ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৮ সালে রাজশাহী জেলাকে জাতীয় সংসদের ৫টি আসনের পরিবর্তে ৬টি আসনে ভাগ করা হয়। রাজশাহী মহানগরী বোয়ালিয়া নামে রাজশাহী-২ আসন নির্ধারিত হয়। ফজলে হোসেন বাদশা ২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটভুক্ত বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জাতীয় সংসদে বসার সুযোগ পান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি পুনরায় তিনি একই আসনের সংসদ সদস্য  নির্বাচিত হন। ইতোমধ্যে তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে রাজশাহীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নে দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হন। মহানগরীর উপশহরে অবস্থিত শহীদ এএইচএম কামারুজ্জান ডিগ্রী কলেজকে সরকারিকরণে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এ কলেজের অবকাঠামো উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রচেষ্টাতে রাজশাহী কলেজে পুনরায় উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি সংযোজিত হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে তিনি সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অংশ গ্রহণ করে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।৬২৮
বাদশা রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিশোর ও তরুণ জীবনে তিনি ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি দিগন্তপ্রসারী সংঘ ও এ্যালাইড ক্লাবের পক্ষে ১ম বিভাগ ফুটবল লীগে খেলতেন। বর্তমানে তিনি দিগন্তপ্রসারী সংঘের স্থায়ী পরিষদের চেয়ারম্যান। 
বাদশার সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবন অনেক বারই ঢাকা ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ হয়েছে। বন্দী অবস্থাতেও তিনি নির্যাতনের শিকার হন। আবার তাঁকে বন্দীদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে উঠতে দেখা যায়। একবার রাজশাহীতে কারাবাসের সময় বন্দীদের উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলেন। ঐ আন্দোলন দমনে গুলি চললে তিন জন বন্দী নিহত হন। এতে আন্দোলন আরো গতিশীল হয়ে উঠে ও এক পর্যায়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কারাগারে আসেন। মন্ত্রী বাদশাসহ আন্দোলনরত নেতাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে বন্দীদের বেশ কিছু দাবি মেনে নেন। তাঁর প্রচেষ্টায় কারা অভ্যন্তরে ঐ তিন মৃত্যুর স্মৃতির স্মরণে একটি শহীদ মিনারও নির্মিত হয়। ১৯৮৩ সালে ঢাকায় সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দানের কারণে ডিসেম্বরে সামরিক বাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। ক্যান্টনমেন্টে নয় দিন ও নয় রাত তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়।৬২৮
বাদশার সহধর্মিণী তসলিমা খাতুন পেশায় কলেজ শিক্ষক। সংসার ও পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তসলিমা সমষ্টিগত নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে থাকেন। তিনি বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের একজন নেত্রী। এ দম্পতি একটি মাত্র সন্তানের জনক-জননী। তাঁদের সন্তানটি কন্যা। নাম ফাহিজা নুযহাত জয়ী। সে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।৬২৮
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd