অধ্যায় ৭: সংসদ সদস্য

বেগম খালেদা জিয়া


বেগম খালেদা জিয়া

বেগম খালেদা জিয়াই একমাত্র সরকারের নির্বাহী প্রধান যিনি রাজশাহী-২ (পবা-বোয়ালিয়া) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ তারিখে ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন। 
বেগম খালেদা জিয়ার আসল নাম খালেদা খানম এবং ডাক নাম পুতুল।২১৯ তিনি ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন।২১৯ বেগম খালেদা জিয়ার পূর্ব পুরুষের আদি নিবাস ফেনী জেলার শ্রীরামপুরের ফুলগাজী গ্রামে। খালেদা জিয়ার ব্যবসায়ী বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার ব্যবসার কাজে জলপাইগুড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানেই খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন।২১৮ তবে মো. লুৎফর রহমান বীনু রচিত ছোটদের দেশনেত্রী গ্রন্থের ৬ পৃষ্ঠায় জন্ম তারিখ ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, জন্ম স্থান দিনাজপুরের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু আহমাদ উল্লাহ সম্পাদিত ৫ম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থে দেশ বিভাগের পর (১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট) ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাসের কথা উল্লেখ আছে। সে হিসেবে খালেদা জিয়ার জন্মস্থান জলপাইগুড়িকেই ধরা যায়। তাঁর শৈশব-কৈশোর কাটে দিনাজপুর শহরের দফগাঁ ঘাসিপাড়া ও মুদিপাড়ায়। ১৯৫০ সালে তিনি দিনাজপুর মিশন স্কুলে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। ১৯৬০ সালে দিনাজপুর গালর্স স্কুল থেকে ম্যাট্রিক (এসএসসি) পাস করেন। ১৯৬৩ সালে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে তাঁর বিয়ে হয় তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি)। ১৯৬৫ সালে তিনি স্বামী জিয়াউর রহমানের নিকট পাকিস্তানে যান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী তাঁকে আটক করে এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি পান। খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর দুই সন্তান তারেক রহমান (পিনু) ও আরাফাত রহমান (কোকো)কেউ আটক রাখা হয়েছিল।২২০ ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি দুপুর সাড়ে বারোটায় ইউনিভার্সিটি মালায় হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে কোকো মৃত্যু বরণ করেন।৭৮৬ ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের দ্বারা জিয়াউর রহমান বীর উত্তম শহীদ হবার পর প্রায় ২ বছর পর দেশের এক চরম রাজনৈতিক সংকটকালে তিনি রাজনীতিতে আসেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করলে দেশ মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপি’র সদস্য পদ গ্রহণ করে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করেন খালেদা জিয়া। এরপর ১৯৮৩ সালের মার্চে বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও ১৯৮৪ সালের ১০ মে চেয়ারপারসন হন।২১৮
রাজনীতিতে খালেদা জিয়া স্বৈরাচারী সরকারের পতনের এক দফা এক দাবিতে আপোষহীন ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালেই ৭ দলীয় জোট গঠন হয়। স্বৈরাচার বিরোধী আপোষহীন আন্দোলনের জন্য তিনি আপোষহীন দেশনেত্রী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন। ১৯৮৬ সালের শেষের দিকে তিনি আপোষহীন দেশনেত্রী উপাধি পান।২১৮
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি ৭ বার আটক হন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার সরকার পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফলে তিনি সংসদীয় দলের নেত্রী নির্বাচিত হন। বিদ্যমান নিয়মে একক ব্যক্তির সর্বোচ্চ সংখ্যক পদ প্রার্থীতায় তিনি ৫টি আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৫টিতেই জয়লাভ করেন। তিনি ২৬৬ ফেনী-১ আসনটি রেখে বাকিগুলো উপ নির্বাচনের জন্য ছেড়ে দেন। ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এ শপথের মাধ্যমে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হবার গৌরব অর্জন করেন। এরপর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি চালু হয়। এজন্য বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পুনরায় শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পুনরায় জয়লাভ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া সংসদ নেত্রী নির্বাচিত হন। ৬ষ্ঠ সংসদ ১৯৯৬ সালের ২৪ মার্চ শুরু হয়। বিরোধী পক্ষের তীব্র বিরোধিতায় তিনি ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি ঘটান। উক্ত সংসদের ১টি মাত্র অধিবেশন ও কার্যদিবস ছিল ৩টি।২২১ এ সংসদেই ২৬ মার্চ ১৯৯৬ তারিখে ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল) গৃহীত হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া ফেনী-১, লক্ষীপুর-২, চট্টগ্রাম-১, বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৫টিতেই জয়লাভ করেন।২১৬ কিন্তু নির্বাচনে তাঁর দল ২য় সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন লাভ করায় তিনি প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী হন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ৪ দলীয় জোটের (বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (শা-ফি), ইসলামী ঐক্যজোট) প্রার্থী হিসেবে ফেনী-১, লক্ষীপুর-২, খুলনা-২ এবং বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই জয়লাভ করেন।২২৩ এ নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট স্মরণকালের বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করে। বঙ্গভবনের দরবার হলে ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭.২৬ মিনিটে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নিকট তিনি ও তাঁর কেবিনেটের অন্যান্য সদস্য শপথ গ্রহণ করেন।২২২ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হয়ে বগুড়া-৬, ৭ ও ফেনী-১  আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনটিতেই তিনি জয়লাভ করেন। তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠন করলে তাঁকে বিরোধী দলের আসনে বসতে হয়। ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদের জাতীয় নির্বাচন তিনি ও তাঁর দল বর্জন করেন। চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন।
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd