অধ্যায় ২ : প্রকৃতি ও আবাসন

বাধ


প্রমত্তা পদ্মার ভয়ংকরী আক্রমণ অতীতের বিভিন্ন সময়ে ক্ষতবিক্ষত করেছে এ সুন্দর নগরীকে। এর পর ভাঙ্গা-গড়ার খেলা ও ফুসে উঠা বিশাল জলরাশি উভয়েই বিপর্যস্ত হয়েছে জনজীবন। রাজশাহী মহানগরী ও প্রাচীন পল্লী চর সাইপাড়া, কাদিরপুর, শ্রীরামপুর, সাহেবগঞ্জ, নবীনগর, হাবাসপুর, নওয়াবগঞ্জ বাজার, বশড়ি, হাড়ুপুর, বাগানপাড়া, বুলনপুর প্রভৃতি পল্লী পদ্মার ধারালো কামড়ে আজ ধ্বংস। কোন কোন পল্লীর বাসিন্দারা উপরের দিকে পুনরায় আবাস স্থাপন করে স্মৃতি রক্ষার্থে পূর্ব পল্লীর নাম ঠিক রেখেছে। যেমন কসাইপাড়া। আবার কোন কোন পল্লী শুধু প্রবীণদের মুখের কাহিনী। আবার কোনটি পদ্মার গর্ভে নিমজ্জিত হয়ে নামটিও অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। 
এ মহানগরীর মানুষ যখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় শুধু প্রকৃতির উপর নির্ভর না করে কৃত্রিম উপায়ে শক্তিশালী হতে শিখল, তখন পদ্মার কামড় ও পাগলামী জলনৃত্যের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তৈরি করতে শিখেছিল বাধ। রাজশাহী মহানগরীর দক্ষিণ সীমান্ত জুড়ে বাধটা একবারে তৈরি হয়নি; কালের বিভিন্ন পর্যায়ের সংস্কারে আজকের অবস্থানে পৌঁছে রাজশাহী মহানগরীর অতন্ত্র প্রহরী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এ সব বাধ নির্মাণ করেছে সরকার। এগুলো রক্ষণা-বেক্ষণ, সংস্কার ও নির্মাণের দায়িত্ব এখন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের। গবেষকদের ধারণা, এ সরকারি বাধগুলোর পূর্বেও পদ্মার তীরে বাধ নির্মিত হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রামপুর বোয়ালিয়া, তালাইমারী প্রভৃতি গ্রামের ভূমি নকসাতেও এর উল্লেখ আছে।১ অনেক দূরে প্রবাহিত পদ্মা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এদিকে এগিয়ে আসার ফলে বাধগুলো নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পুরাতন এ বাধ নদী গর্ভে চলে যাওয়ার পর নতুন বাধ তৈরি করা হয়েছে। তখন বোয়ালিয়ার অনেক অঞ্চলেও নদীর চরগুলো ছিল জমিদারদের খাস মহল। এ জমিগুলোই প্রচুর রেশম ও নীল চাষ হতো। রেশম ও নীলের আবাদকে পদ্মার বন্যা থেকে রক্ষার জন্যই জমিদারেরা প্রতি বছর নিজ নিজ এলাকায় বাধও বেঁধে দিত। এর জন্য প্রজাদেরকে বিশেষ কর দিতে হতো।   
রাজশাহী মহানগরীর দক্ষিণ পাশ দিয়ে নদীর তীর ঘেঁষে নির্মিত বাধের দৈর্ঘ্য ১১ কিলোমিটারের কিছু বেশি।২৯২ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শিলিগুড়ি (বর্তমান ভারতের অন্তর্ভুক্ত) ইরিগেশন বিভাগের আওতায় ১৭৫৭ সালে এ এলাকাকে বন্যার হাত হতে রক্ষার জন্য এ বাধ নির্মাণ করা হয়। তবে বিভাগ গাইড রাজশাহী গ্রন্থে ১৮৫৫ সালে কোর্ট এলাকায় প্রথম ১৭২৯ ফুট বাধ নির্মানের কথা উল্লেখ আছে। কাজী মোহাম্মদ মিছেরের রাজশাহীর ইতিহাস গ্রন্থে একই কথা উল্লেখ আছে। সুতরাং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিবেদনে ১৭৫৭ সালের স্থানে ১৮৫৭ সাল অথবা ১৮৫৫ সাল হবে। 
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, রাজশাহী মহানগরীর উন্নয়নে এ বোর্ডের অবদান হলো পদ্মার বন্যা ও ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষার জন্য পশ্চিমে বেড়পাড়া হতে পূর্ব চর শ্যামপুর পর্যন্ত ১৭ কি.মি. বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধ নির্মাণ, ১৯টি নিষ্কাশন স্লুইচ, ৪টি গ্রোয়েন, ৭টি ব্রিক স্পার, ১টি সলিড স্পার ও ৪.৮১ কি.মি. প্রতিরক্ষামূলক বাধ নির্মাণ । 
প্রথম সরকারি বাধ: রাজশাহী কোর্টের দক্ষিণে শহর জুড়ে ১৭২৯ ফিট বাধটি নির্মিত হয়েছিল ১৮৫৫ সালে।১ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে শ্রীরামপুরে অবস্থিত জেলার দপ্তর, ইউরোপীয়দের আবাসিক কুঠি, সাহেবগঞ্জ প্রভৃতি পদ্মায় নিমজ্জিত হলে জেলা দপ্তর বুলনপুরে স্থানান্তরিত হয়েছিল। তারপর এ বাধ নির্মাণ করে শহরকে রক্ষ করা হয়েছিল। এ ভয়াবহ দুর্যোগে জনগণের অনেক ক্ষতি হয়েছিল। 
কাচারী বাধ : বন্যার কবল থেকে কাচারীকে (জেলা দপ্তর) রক্ষার জন্য ১৮৫৫ সালেই এই বাধটি নির্মাণ করা হয়েছিল পূর্ব বাঁধের সঙ্গে সংযুক্ত করে। কাচারী সংযুক্ত পশ্চিম ও দক্ষিণ ধারে ঢালু করে নির্মাণ করা হয়।১
গোদাগাড়ী বাধ, বুয়ালিয়া বাধ ও তালাইমারী বাধ: ১৮৯৫ সালে এ বাধগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। কসাইপাড়া হতে বুলনপুর পর্যন্ত ১৪,১৮০ ফুট, সাহেবগঞ্জ হতে রাজশাহী-নাটোর রোডের সংযোগ স্থল পর্যন্ত ৮,২২৪ ফুট ও জজ কোর্টের নিকট থেকে গোদাগাড়ী রাস্তার উপর মাটি ঢেলে ১২,৩৫০ ফুট এ তিনটি বাধ নির্মাণ করা হয়েছিল। গোদাগাড়ী বাধটি সোনাইকান্দী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।১
১৮৬৯ সালে পদ্মায় প্রবল বন্যা হয়ে রাজশাহী মহানগরীকে আক্রান্ত করেছিল। তারপর বন্যার কবল থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষার জন্য সরকার বাধ সংক্রান্ত সম্ভবত ১৮৭৩ সালে আইন পাস করে এ বাধগুলো নির্মাণ করে।
পাঠানপাড়া ও দরগাপাড়া বাধ: ১৮৭৩ সালের আইন অনুসারে ১৯৪৪ সালে এ বাধ দুটি নির্মাণ করা হয়েছিল। পাঠানপাড়া বাধ ২৪৫০ফুট ও দরগাপাড়া বাধ ৭৬৬ফুট।১ 
সোনাইকান্দী ও কাজল বাধ : ১৯৪৮-১৯৪৯ ও ১৯৫৪ সালে ১০,৬০০ ফুটের  সোনাইকান্দী বাধ ও ৩,৭৬০ ফুটের কাজলা বাধ নির্মাণ করা হয়েছিল।১   


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd