অধ্যায় ৬: ভাষা-স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক সভার স্থান

মুক্তিযোদ্ধা আলী মনসুরের পান্ডুলিপি


রাজশাহী কোর্টের প্রায় দু’কিলোমিটার পশ্চিমে হাড়ুপুর নিবাসী ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আলী মনসুর। দেশ স্বাধীনের বেশ কয়েক বছর পর বাড়ি করেছিলেন পূর্ব রায়পাড়ায়। এক সময় মারাত্মক অর্থাভাবে বাড়িটা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ ও রায়পাড়ার পশ্চিমে সাইরগাছায় আর একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। 
আলী মনসুর মুক্তিযুদ্ধকালীন ৭নং সেক্টরের ৪ নং সাব সেক্টরের ট্রুপস লিডার ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি দু’বার হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিকে আক্রান্ত হয়ে তিনি ২০০০ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হন। পরের দিন ৩১ জানুয়ারি সেখানে হাঁটু থেকে ডান পা কেটে ফেলা হয়। তাঁর স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা (খেদু) ১৯৯৭ সাল থেকে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। স্ত্রী ও নিজের চিকিৎসার জন্য অনেক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন এ মুক্তিযোদ্ধা। এক সময় রাজশাহী কোর্টের পূর্ব রায়পাড়ার বাড়িটা বিক্রি করে দিতে হয় তাঁকে। ভারত এবং বাংলাদেশের রাজশাহী ও ঢাকার বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসার পর অবশেষে ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর কাছে আশ্রয় নেন রাজিয়া সুলতানা। আলী মনসুর তখন হাঁটু থেকে ডান পা হারিয়ে বারডেমেই চিকিৎসাধীন। মমতাময়ী স্ত্রীর চির বিদায়ের আগে বা পরে সাক্ষাৎ হয়নি এ দুর্ভাগা মুক্তিযোদ্ধার। মার্চের শেষ দিকে তিনি বারডেম থেকে রাজশাহী ফিরেন। তাঁর কিছু কাল পর তিনিও পরলোক গমন করেন। পৃথিবীতে রেখে যান তিথি ও মৌসুমী নামের দুই কন্যা আর স্বহস্তে লিখিত এক্সারসাইজ খাতায় লেখা একটা পাণ্ডুলিপি। এ গ্রন্থের লেখক আনারুল হক আনার হাড়ুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠী মো. মখলেসুর রহমান মুকুলের উৎসাহে পাণ্ডুলিপিটি লিখেন বারডেমের অসহনীয় কষ্টের দিনগুলোই। আলী মনসুরের মৃত্যুর পর তাঁর বড় কন্যা তিথির সঙ্গে মুকুল বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। 
আলী মনসুরের গভীর বেদনার কলমে পাণ্ডুলিপিতে প্রথমেই উঠে এসেছে তাঁর অমর কৃতিত্ব মুক্তিযুদ্ধের দুঃসসাহসী অভিযান, বিভিন্ন অপারেশন, কিছু ঘটনা ও ব্যক্তি জীবনের কিছু কথা, ঋণের তালিকা ইত্যাদি। বারডেম থেকে ফিরে এ খাতারই শেষ পৃষ্ঠার দিকে উল্টো করে আরো কিছু কষ্টের শব্দ রেখে যান। সেখানে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে তাঁর স্ত্রীর জন্য কষ্টেগাঁথা অনুভূতি। এ অংশের শুরুতেই তিনি তাঁর স্ত্রীর নাম, জন্মের তারিখে ফাঁকা স্থান, মৃত্যুর তারিখ ১৪ জানুয়ারি/২০০০, সময় সকাল ৫.১৫ মিনিট রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল লিখেন। শুরুতে স্ত্রীর মৃত্যুর তারিখ ১৪ জানুয়ারি/২০০০ লিখলেও ভিতরে লিখেছেন ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি। আসলে ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিই সঠিক। কারণ স্ত্রীর মৃত্যুর সময় তিনি ঢাকার বারডেমে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর পাণ্ডুলিপি থেকে প্রাপ্ত অপারেশন অভয়া ব্রিজ ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় টেলিফোন অফিস ভবন অপারেশনের ঘটনা পরিমার্জন করে এখানে উপস্থাপন করা হলো।
অপারেশন অভয়া ব্রিজ: রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি থানাধীন সর্ব পশ্চিমে অভয়া ব্রিজের অবস্থান। সে সময় চাঁপাই নবাবগঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজটা ভেঙ্গে ফেলার জন্য ৭নং সেক্টরের ৪ নং সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ডাক্তারসহ প্রায় ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা, কয়েক জন বিডিআর সদস্য অপারেশন চালান। দলে ছিলেন হাড়ুপুর নিবাসী ট্রুপস লিডার মুক্তিযোদ্ধা আলী মনসুর। মুক্তিযোদ্ধারা রাতে নৌকায় চড়ে রওনা দেন। ভরা নদী উপচে চারিদিকে পানি। অন্ধকারে নৌকা চালাতে চালাতে মাঝিদের দিকভ্রম ঘটে। সঠিক পথে চলার জন্য এক জায়গায় নৌকা থামিয়ে নদী তীর হতে একজন মানুষকে নৌকায় তুলে নেয়া হয়। এ সময় ঐ ব্যক্তির মা আহাজারি শুরু করেন। এ পরিস্থিতিতে  মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ক্রন্দনরত মাকে নিজেদের পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, ইনশাল্লাহ আপনার সন্তানকে ফেরত দিয়ে যাব। নৌকা আবারও চলা শুরু করে। কোথাও কোথাও পানি কম থাকার কারণে ঠেলে পার করতে হয়। শেষ রাতের কাছাকাছি অভয়া ব্রিজের কাছে এসে মুক্তিযোদ্ধারা রাজশাহী-চাঁপাই নবাবগঞ্জ মহাসড়কের উপর নেমে দাঁড়ান। সকাল হলেই শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে সতর্ক করে দেন মেজর গিয়াস। তারপর ১০ জনের একটি দল গঠন করে রণকৌশলী পরামর্শ দেন। এ দশজনে আলী মনসুরও ছিলেন। গুলি ব্যবহার ছাড়াই মেজর গিয়াস ব্রিজ পাহারদারদেরকে কাবু করার নির্দেশ দেন। দলের সদস্যরা তাঁদেরকে একটা এলএমজি দেয়ার আবেদন জানালে মঞ্জুর করা হয়। নির্দেশনা মোতাবেক বিশ গজ যেতেই ব্রিজের দিক থেকে হ্যারিকেনের আলোসহ একটি নৌকা এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ভালোভাবে ব্রিজ পাহারার জন্য আর্মি কমান্ডও কানে আসে। মেজর গিয়াসের নির্দেশ মতো অপেক্ষার সঙে সতর্কতা অবলম্বন। নৌকার সংখ্যা ছিল চার। প্রথম নৌকাটা রাইফেলের আওতায় আসতেই মেজরের চ্যালেঞ্জ, কৌন হ্যায় বে। তার সঙ্গে হাতে থাকা গানের ফায়ার। সাথে সাথে প্রতি উত্তর আসে গুলিতেই। মেজরের নির্দেশে চল্লিশটা রাইফেলের গর্জন এক সাথে শুরু হয়। অপর পক্ষের ফায়ার অবিরত থাকার কারণে মেজর রাস্তা থেকে নেমে যাবার নির্দেশ দিতেই প্রায় সবাই সাঁতার পানিতে নেমে পড়েন। মেজরের হুকুমে মেশিনগান ব্যবহার করা হলে ফায়াররত আগুয়ান চারটা নৌকার মধ্যে তিনটা গুড়িয়ে ডুবতে শুরু করে। পিন পতনের শব্দ ছাড়াই বাকি একটা বাতাসের ধাক্কায় এগিয়ে আসতে থাকে। মনে হয়েছিল কেউ নেই। কিন্তু মেজর সতর্ক। মুক্তিযোদ্ধারা নৌকাটা সার্চের পারমিশন চাইলে তিনি পারমিশন দেন বটে, তবে আড় হিসেবে নিতে বলেছিলেন একটি বড় নৌকা। টর্চ ব্যবহার ও উঠে না দাঁড়াবার নির্দেশও ছিল। তিন জন প্রায় নৌকাটার কাছে গিয়ে ভুলটা করেন রংপুরের ইসলাম। নৌকাটাতে টর্চের আলো ফেলতেই শত্রুর ফায়ারের গুলি তাঁর বুক চিরে বেরিয়ে যায়। বীর ইসলামের শেষ কথাটি ছিল, ‘স্যার আমি মারা যাচ্ছি’। মেজর গিয়াসের পরবর্তী নির্দেশে মেশিনগানের গুলিতে নৌকাটা চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায়। গভীর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের শেফালীপুর  ক্যাম্পে এনে শহীদ বীর ইসলাকে দাফন করেন। পরে জানা যায়, ঐ চার নৌকায় ১০ জন পাক সেনা ছিল। তাঁদের লাশ দুপুরে নিয়ে যায় পাক আর্মিরা। (তথ্য: মুক্তিয়োদ্ধা আলী মনসুরের পাণ্ডুলিপি)
রাজশাহী কেন্দ্রীয় টেলিফোন অফিস ভবন অপারেশনে সাহসিনী দুই ছাত্রী শওকত আরা ও হাসির ভূমিকা: হাড়ুপুরের আজিজ (মাস্টার) এর সঙ্গে যোগাযোগ করে সংবাদ পেয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আলী মনসুর তাঁদেরকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় টেলিফোন অফিস অকেজো করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আলী মনসুর তখন আজিজকে কয়েক ঘণ্টা আশ্রয়ের জন্য হড়গ্রামে একটা বাসা ঠিক করার অনুরোধ করেন। আজিজ জানিয়েছিলেন, প্রফেসর পান্না ও প্রফেসর মমিন মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতে আগ্রহী। প্রফেসর পান্নার বাসায় থাকা যায়। কথা মতো প্রফেসর পান্নার বাসায় রাতে অস্ত্র, গোলা বারুদ ও এক্সপ্লোসিভ পাঠানো হয়। কথা ছিল পরের রাতের প্রথম ভাগে সেগুলো নিয়ে অপারেশন অ্যাকশনে গমন। পরের রাতে আলী মনসুরের দল প্রফেসর পান্নার বাসায় গিয়ে দেখেন অস্ত্রগুলো প্রফেসর পান্না ও প্রফেসর মমিন ভয়ে পাশের পুকুরে ফেলে দিয়েছেন। এ কথা শুনে রাগে মুক্তিযোদ্ধারা এক ঘণ্টার মধ্যে পুকুর থেকে অস্ত্রগুলো তুলে দেয়ার জন্য চাপ দেন। নিরুপায় হয়ে দুই প্রফেসর হাফ প্যান্ট পরে পুকুরে ডুব সাঁতার শুরু করেন। এক সময় তাঁদের থামিয়ে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারাই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করেছিলেন। সেগুলো পানিমুক্ত করার জন্য আরো একদিন ঐ প্রফেসরের বাসায় রাখতে হয়েছিল। পরের দিন মিয়াপাড়া পাবলিক লাইব্রেরির সেক্রেটারির সঙ্গে যোগাযোগ করে বলা হয়, আপনার অফিসের নিরাপদ জায়গায় একটি ট্রাংক রাখা হবে। যাবার সময় ঘরের চাবি দরজার পাশে রাখবেন। একটা ট্রাংকে এক্সপ্লোসিভ, মাইন, এসএমজি ভর্তি করে হাড়ুপুরের কলেজ ছাত্রী শওকত আরা ও হাসির দ্বারা রিক্সায় ঐ লাইব্রেরিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সাহসিনী ছাত্রী দুজন বোরখা পরে অস্ত্র ভর্তি ট্রাংক লাইব্রেরির গেটে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এরপর ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা অপারেশনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে সন্ধ্যার পর ঐ লাইব্রেরির কাছে যান। সেখানে গিয়ে একটি ছেলের মাধ্যমে সেক্রেটারিকে উপস্থিতির কথা জানিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে চাবি রাখার কথা বলা হয়। রাত সাড়ে আটটার সময় লাইব্রেরির নির্দিষ্ট স্থানে দেখা যায় চাবি নাই এবং সেক্রেটারিও ভয়ে পালিয়ে গেছেন। পরিকল্পিত অপারেশন ব্যর্থ হয়। অস্ত্র ভর্তি ট্রাংক ঘরের ভিতর। মুক্তিয়োদ্ধা আলী মনসুরের দল নিয়ে হাড়ুপুর ফিরে আসেন। পরের দিন ঐ দেশপ্রেমিক সাহসিনী ছাত্রী দুটির মাধ্যমেই অস্ত্র ভর্তি ট্রাংকটি ঐ লাইব্রেরি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তনায় ফেরত আনা হয়েছিল। (তথ্য: মুক্তিয়োদ্ধা আলী মনসুরের পাণ্ডুলিপি)
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd