অধ্যায় ৬: ভাষা-স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক সভার স্থান

ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ


ইংরেজরা বাংলা দখলের কিছু কাল পরেই তাদের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষক ও কারিগরদের বিদ্রোহ ঘটে। যা ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নামে পরিচিত।২ এটাই ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রথম সশস্ত্র আন্দোলন বলা যেতে পারে। এ আন্দোলন বা বিদ্রোহকে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক সন্ন্যাসীদের আক্রমণ বলে অভিহিত করেছে। উইলিয়াম হান্টারের গ্রন্থে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বলে সনাক্ত করে বিদ্রোহীদের মোগল সাম্রাজ্যের ধ্বংসপ্রাপ্ত সৈন্য বাহিনীর বেকার ও বুভুক্ষ সৈন্য এবং জমিহারা, গৃহহারা বুভুক্ষ কৃষক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, বিদ্রোহী সন্ন্যাসী ও ফকিরেরা যে সব অঞ্চলে যেত সে সব অঞ্চলের জমিহারা, সর্বহারা কৃষক সর্ব শক্তি দিয়ে বিদ্রোহীদের সাহায্য করতেন এবং বিদ্রোহী বাহিনীতে যোগদান করতেন। ১৭৬৩-১৭৮৭ খ্রি.পর্যন্ত বাংলার ফকির সম্প্রদায়ের দলপতি শাহ মস্তান বোরহান উত্তর বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং পূর্ব বাংলার  ময়মনসিং এর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্রিটিশ বিরোধী তৎপ
রতা পরিচালনা করেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৭৬৩ খ্রি. ফকিরেরা রাজশাহীর রামপুর- বোয়ালিয়ার ইংরেজ কুঠি আক্রমণ এবং কুঠির এজেন্ট বেনেটকে বন্দী করে পাটনায় প্রেরণ করা হয় এবং সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল।২৬৮ ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ফকিরেরা আবার রামপুর-বোয়ালিয়া আক্রমণ করে। ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে মজনুর নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা নাটোর অঞ্চলের  জমিদার, অত্যাচারী ধনী ও ব্রিটিশ শাসকদের অনুচরদের ধন সম্পদ লুণ্ঠন এবং ব্রিটিশ সমর্থকদের উপর অত্যাচার করে। ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ২৮ জুন রংপুর কালেক্টরের নিকট লেফটেন্যান্ট ব্রেনানের লিখিত এক পত্রে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নায়ক ভবানী পাঠক বিদ্রোহী নায়িকা দেবী চৌধুরাণীর কথা উল্লেখ আছে। গ্রেজিয়ারের রিপোর্টে মজনু শাহের সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।২
১৭৮৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর বগুড়ায় মজনু শাহ ও তার বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজ বাহিনীর সংঘাত হয়। মজনুর উপস্থিতি জানতে পেরে ইংরেজ বাহিনী তাঁদের ঘিরে ফেলে। এ বাহিনীর বেস্টনী ভেদ করে মজনু শাহ ও তাঁর বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে মজনু শাহসহ তাঁর অনেক অনুচর আহত হন এবং ডিসেম্বরের শেষে মজনু শাহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর এ আন্দোলন চলেছিল আঠারো শতক পর্যন্ত। তাঁর অন্যতম উত্তরাধিকার মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রেখেছিলেন।
এ আন্দোলনে একবার ফকির ও সন্ন্যাসীদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব হয়েছিল। ১৭৭৭ সালে বগুড়ার কাছে সন্ন্যাসীদের অতর্কিত হামলায় ফকির মজনু শাহর অনেক অনুচর নিহত হয়েছিলেন। এ ঘটনার পর তিন বছর মজনু শাহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ফকির ও সন্ন্যাসীদের বিরোধ মিমাংসার চেষ্টা করেছিলেন।২৬৮ 
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd