অধ্যায় ১: অবস্থান-আয়তন-জনসংখ্যা-নাম

শ্রীরামপুর শব্দের উৎপত্তি


শ্রী, রাম, পুর এ তিনটি শব্দের সংযোজন শ্রীরামপুর। শ্রী  হিন্দু সংস্কৃতির সম্মানসূচক শব্দ। রাম হিন্দুদের অবতার। পুর অর্থ নগর। ডাচদের রেশম বাণিজ্যের পর বর্তমান শহর এলাকার পদ্মার তীর ক্রমশ প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক এলাকাই পরিণত হয়েছিল। কেউ কেউ মনে করেন, রোয়ালিয়া বা মহাকালগড় এক সময় হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ছিল। হযরত শাহ্ মখদুমের আগমনের পর মুসলমান জন অধ্যুষিত এলাকাই পরিণত হয়। তবে শাহ্ মখদুম মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের নিকট আধ্যাত্মিক মহামানব রূপে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। হিন্দু-মুসলিমের সম্মিলনী পবিত্র জায়গাটি শাহ্ মখদুমের মাজার শরিফ। রামপুর বোয়ালিয়াতে নামের মাধ্যমে ভৌগলিক নামের ক্ষেত্রেও উভয় সংস্কৃতির সংযোজন ঘটেছে। 
রাম হিন্দুদের অবতার। এর প্রাচীন জনপদবাসী হিন্দু হলেও রামভক্ত ছিলেন না। মহাকালগড়ে মহাকাল দেওয়ের উদ্দেশ্যে তান্ত্রিক কার্যক্রম চলতো; রামের পূজা হতো না। রাম কোন দেও নন। দেওতন্ত্র শাস্ত্রীয় বিপরীত কার্যক্রম। এটা কোন অপশক্তির আরাধনা। সুতরাং অবতার রামের নামানুসারে রামপুর বা শ্রীরামপুর  শব্দটি আসেনি। মহাকালগড় বা তার আশেপাশে রামের কোন মূর্তিও ছিল না। প্রাচীনকালে এখানে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বাস করতেন। তাঁরা রামের পূজা করতেন না। তখন রামের পূজা হলে কোথাও না কোথাও রামের মূর্তি পাওয়া যেত। তাই কেউ কেউ মনে করেন, অবতার রামের নামানুসারে শ্রীরামপুর শব্দটি আসেনি। এ অঞ্চলে প্রচুর আমের গাছ ছিল। আম থেকে এখানকার নাম হয়েছে আমপুর এবং আমপুরের পরিবর্তিত নাম রামপুর বা শ্রীরামপুর। আবার এও হতে পারে, পদ্মাতীর বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার পর শ্রীরাম নামের কোন সম্ভ্রান্ত বা প্রভাবশালী ব্যক্তির আবির্ভাব বা উৎপত্তি ঘটে। তাঁর নাম অনুসারে স্থানের নামকরণ হয় শ্রীরামপুর। 
আবার কলকাতার পার্শ্ববর্তী একটি জায়গার নাম শ্রীরামপুর। সপ্তদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতের ত্রাঙ্কুবার ও শ্রীরামপুরে দিনেমার (The Danes ) উপনিবেশ গড়ে ওঠে। রাজনৈতিকভাবে দিনেমারেরা শক্তিশালী ছিল না। ১৮৪৫ সালে ইংরেজ সরকার তাঁদের ফ্যাক্টরীগুলো কিনে নেয়। শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।৬৭১ এখানে বর্তমান সিটি চার্চ স্থাপন করে কলকাতার শ্রীরামপুরের নাম অনুসারে এ জায়গাটির নাম শ্রীরামপুর রাখা হতে পারে। এবনে গোলাম সামাদের তথ্যানুসারে এ চার্চটি স্থাপন করেছিলেন এক নীলকর সাহেব। পরে তিনি চার্চটি ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মিশনারীর নিকট হস্তান্তর করেন।৪ ইংলিশ প্রেসবিটারীয়ান মণ্ডলীর পক্ষ থেকে রেভা. বিহারীলাল সিং ১৮৬২ সালে একটি মিশন কেন্দ্র খোলেন। দু বছরের মধ্যে তিনি অনেকগুলি পাঠশালা, একটি উন্নতমানের স্কুল গৃহ, একটি প্রার্থনা গৃহ ও মিশনারীদের জন্য একটি বাসগৃহ নির্মাণ করেন।১১১ বিহারীলাল সিং কর্তৃক স্থাপিত প্রার্থনা গৃহটি বর্তমান সিটি চার্চ কি না তার তথ্য পাওয়া যায় না। রেভা. প্রিয়কুমার বারুই তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ১৮৬২ সালে যখন রেভা. বিহারীলাল সিং মিশনারী স্থাপন করেন তখন এ শহরের নাম ছিল রামপুর বোয়ালিয়া। হয়তো তার অনেক পূর্বেই এখানে চার্চ স্থাপন করে জায়গাটির নাম দেয়া হয়েছিল শ্রীরামপুর। ১৮৬২ সালে রেভা. বিহারীলাল সিং আগমন করলে তখন বা তার কয়েক বছর পর চার্চটি তাঁকে হস্তান্তর করেছিলেন নীলকর সাহেব। ততদিনে  জায়গাটি শ্রীরামপুর ও শহর রামপুর বোয়ালিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে এ সব ব্যাখ্যা ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সঠিক তথ্য আবিস্কারের জন্য আরো গবেষণা প্রয়োজন।  
 


রাজশাহীর কথা

আনারুল হক আনা

তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল 2018

প্রকাশনা : DesktopIT


www.desktopit.com.bd